উঠল বাই তো কটক যাই। বহুল ব্যবহৃত প্রবাদটাকে অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়েই প্ল্যানটা হয়ে গেল। কাশ্মীর যাব। সব কিছু ঠিকঠাক চললে ১৫ অগস্টের সকালটা কাটাব কার্গিলে।

শ্রীনগর থেকে কার্গিলের উদ্দেশে রওনা হলাম ১৪ অগস্ট, অর্থাৎ পড়শির স্বাধীনতার দিন। এক নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে প্রায় দেড়শো কিলোমিটার। এই রাস্তাই শ্রীনগরের সঙ্গে লেহ্-কে যুক্ত করে। কার্গিল যুদ্ধের সময় এর উপরেই নজর ছিল পাকিস্তানের, তখন অবশ্য এর নাম ছিল ন্যাশনাল হাইওয়ে ওয়ান ডি। পাহাড়ের গা বেয়ে অত্যন্ত দুর্গম পথ। এই রাস্তার দখল মানে ভারত ভূখণ্ডের থেকে লেহকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। পাহাড়ি রাস্তায় দেড়শো কিলোমিটারটাই সমতলের আড়াইশো কিলোমিটারের সমান। তাই আমরা সোনমার্গে রাত কাটাব। পরের দিন ভোরে রওনা।

কাশ্মীর সফরে আমাদের আস্তানা ছিল শ্রীনগরের বাদামি বাগ আর্মি ক্যান্টনমেন্ট। শ্রীনগরের সব থেকে বড় সেনা ঘাঁটি। আমরা এই বাদামি বাগেরই এক কর্নেলের অতিথি। গোটা সফরে কড়া চেকিং জ়োনে যেখানেই নিজেদের পরিচয় দিয়েছি, সবার প্রথমে ‘হম কর্নেলকে গেস্ট হ্যায়’ বলাটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

আরও পড়ুন: স্বাধীনতা, তুমি একটা সুদীর্ঘ মিছিলের স্বপ্ন

বজরঙ্গি ভাইজানের নদী আর এলডোরাডো

শ্রীনগর থেকে ঘণ্টা তিনেকের সফর শেষে পৌঁছলাম সোনমার্গ। সেনাবাহিনীর ট্রানজিট ক্যাম্পে আমাদের স্টপ ওভার। আমাদের বরাদ্দ ঘর, থুড়ি টেন্টের সাইজ বেশ বড়। আরামসে জনা ছয়েকের জায়গা হয়। সেনা ছাউনির মেসে খেতে ঢুকব, মুখেই এক বাঙালি জওয়ানের সঙ্গে দেখা। বাড়ি থেকে এত দূর এসে স্বজাতির খোঁজ পেয়ে বিগলিত উভয়েই। খানিক আলাপচারিতার পর তিনি বললেন, অতিথিদের খাওয়ার জায়গা পাশের অফিসার্স মেস। আমাদেরকেও সেখানেই যেতে হবে। হৃতিক রোশনের ‘লক্ষ’ ছবিটি যাঁরা দেখেছেন, তাঁদের এই অফিসার্স মেস দেখে সিনেমার সেই দৃশ্য মনে পড়বে। যেখানে অমিতাভ বচ্চন হৃতিকের লেফ্টেন্যান্ট করণ শেরগিল চরিত্রটিকে বাকি সেনা অফিসারদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। এই অফিসার্স মেসেই আলাপ হয়ে গেল মেজর চোপড়ার সঙ্গে। দেহরাদূন মিলিটারি অ্যাকাডেমির স্নাতক মেজর বেশ প্রাণখোলা মানুষ। সিনেমা নিয়ে গল্প হল। আমাদের কাছে এক্সটারনাল হার্ড ডিস্কে নতুন সিনেমা আছে শুনে মেজর বললেন, ‘‘ভাল কী কী মুভি আছে? আমাকে দিয়ে যেও।’’ সোনমার্গে ঢোকার মুখেই একটা গ্লেসিয়ার দেখেছি, তখন থেকেই ওখানটায় পৌঁছনোর ইচ্ছে। মেজর চোপড়া বললেন, ওইটা থাজিভাস গ্লেসিয়ার, ঘণ্টা দুয়েক ট্রেক করলেই যাওয়া যায়। তত ক্ষণে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, আমাদের কাছে বর্ষাতি ছিল না। মেজর নিজের বর্ষাতি তো দিলেনই, আরও দুটো জোগাড় করে দিলেন। সেনার ক্যামোফ্লাজ পঞ্চু গায়ে চাপিয়ে চললাম থাজিভাস। গেটের মুখে পাহারারত কম্যান্ডোরাই বললেন, ওই গ্লেসিয়ার থেকে যে নদীটা বয়ে আসছে, তার ধারেই ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ সিনেমার শুটিং হয়েছে।

থুজাভাস গ্লেসিয়ার থেকে বয়ে আসা নদী। এখানেই শুটিং হয় ‘বজরঙ্গি ভাইজান’-এর। 

কখনও ট্রেক করিনি। থাজিভাস আর মেজর আকস্মিক ভাবে সেই সুযোগ করে দিলেন। ঘণ্টা তিনেক ট্রেক করে যখন ফিরলাম তখন মেঘ কেটে রোদ ফুটছে। পাহাড়চূড়ায় সোনা রোদ যেন পাহাড়ের গায়ে গলন্ত সোনা ঢেলে দিয়েছে। সোনায় মোড়া সেই পাহাড় কারও কাছে এলডোরাডো, কারও কাছে সোনমার্গ।

আরও পড়ুন: ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র জমি অনেক দিন আগেই বলিউড তৈরি রেখেছিল

শেষমেশ কার্গিল পৌঁছতে পারব তো

সোনমার্গ থেকে অমরনাথের উদ্দেশে যাওয়া যায়। তাই হিন্দু হোটেলের ছড়াছড়ি। বিকেলে সেখান থেকে জমিয়ে চা আর পকোড়া খেয়েছি। রাস্তার স্টল থেকে মোষের মাংসের কাবাবও চেখে দেখলাম। ডিনারে খেলাম ওয়াজ়ওয়ান, খাসির মাংসের তৈরি পদটি স্থানীয় ভাবে বেশ জনপ্রিয়। স্যাঁতসেতে ঠান্ডা হাওয়ায় ট্রেক করে রাতে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এল। এ দিকে ভোর সাড়ে ৫টার ভিতর রওনা দিতেই হবে। না হলে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের আগে কার্গিলের ওয়ার মেমোরিয়ালে পৌঁছনো অসম্ভব। কিন্তু ক্লান্তি আর জ্বরে শরীর ভীষণ কাবু। তিন ঘণ্টার পথ পেরিয়ে কার্গিল যাব কী করে! শুধু গেলেই তো হল না, সেনাবাহিনীর কড়া নির্দেশ সন্ধে ৬টার ভিতর শ্রীনগরের সেনা ছাউনিতে ফিরতেই হবে। মনে হল, এ যাত্রায় আর কার্গিল যাওয়া হল না।

মেঘের নদী

সোনমার্গ থানার কাছে যেখানটায় গণ্ডগোল বেধেছিল, তার থেকে একটু এগিয়েই বাঁ-দিকে সেনার আরও একটা ছাউনি। ২০১৭ সালের শুরুর দিকে বরফ চাপা পড়ে সেখানেই এক বাঙালি সেনা অফিসারের মৃত্যু হয়। টেরিটোরিয়াল আর্মির সদস্য ছিলেন তিনি। মনের জোরকে সম্বল করে ১৫ অগস্টের সকালে বেরিয়েই পড়লাম কার্গিলের উদ্দেশে। রাস্তায় পড়ল সেই সেনা ছাউনিটি। হাজার হাজার ফুট উচ্চতায় প্রতি পদে প্রাণের ঝুঁকি। তারই মধ্যে নিঃশব্দে কাজ করে চলেন আমাদের জওয়ানরা। তাঁদের এই লড়াইয়ের কথা ভাবলেও মনে জোর আসে।

কার্গিলের পথে, পাশেই দশ হাজার ফুটের গভীর খাদ।

অমরনাথ যাত্রার বালতাল বেসক্যাম্প পেরোতেই রাস্তা আরও সরু এবং খারাপ হতে শুরু করেছে। উচ্চতা দশ হাজার ফুট। গাড়়ির জানলা দিয়ে নীচে তাকাতেও সাহস লাগে। পাহাড় বেয়ে উঠতে উঠতে ঢুকে পড়লাম মেঘের রাজ্যে। দশ হাজার ফুটের গভীর খাদ দিয়ে তুলোর মতো মেঘ বয়ে চলেছে। যেন স্রোতস্বিনী নদী। দূরে যে পাহাড়চূড়াগুলি দেখা যাচ্ছে, সবই বরফে ঢাকা। একটা বাঁক ঘুরতেই সেই বরফ ঢাকা পাহাড়ে সূর্যের প্রথম কিরণ পড়তে দেখলাম। সেই দৃশ্য ভোলার নয়। ভয়, উচ্ছ্বাস, উৎকণ্ঠা, উদ্দীপনা মিলে এক জটিল অনুভূতি।

আরও পড়ুন: ফেলে আসা গ্রাম টানল আমায় ৪৮ বছর পরে

রোজ উড়ে আসত হেলিকপ্টার, নিয়ে আসত কফিন

আঁকাবাঁকা যে পথ দিয়ে আমাদের গা়ড়ি এগিয়ে চলেছে, সেই রাস্তা ভীষণ চেনা। কার্গিল যুদ্ধ বা অপারেশন বিজয় নিয়ে তথ্যচিত্র বা সিনেমায় বহু বার দেখেছি রুক্ষ পাহাড়ের গায়ে পেঁচানো সর্পিল এই রাস্তাগুলো। এই রাস্তা দিয়ে ট্রাকে করে হাজার হাজার জওয়ান রোজ লড়তে যেতেন, ট্রাকগুলি ফিরত কফিন ভর্তি করে। যে সময়টা কাশ্মীরে গিয়েছিলাম সে সময় উপত্যকার পরিস্থতি বেশ শান্ত, অন্তত আগের থেকে তো অনেকটাই ভাল। কিন্তু ভাল সময় যে দুর্মূল্য সে কথা জানান দিত পাহাড়ের পিছন থেকে উড়ে আসা হেলিকপ্টারগুলো। শ্রীনগর ক্যান্টনমেন্টের গেস্ট হাউজে বসে রোজ টের পেতাম, হেলিকপ্টার উড়ে যাচ্ছে। আমাদের রোজকার ভালমন্দের যিনি খবর রাখতেন সেই ল্যান্সনায়েক সালারিয়া বহুচর্চিত সার্জিকাল স্ট্রাইকের সাপোর্ট টিমে ছিলেন। পাহাড়ের পিছন থেকে হেলিকপ্টার উদয় হলেই সালারিয়া বলতেন, বর্ডারে আজ কেউ শহিদ হয়েছে, তারই দেহ নিয়ে কফিন আসছে ওই চপারে করে। এক দিন সাঙ্ঘাতিক ভাবে জখম এক জওয়ানকে সীমান্ত থেকে উড়িয়ে আনা হল ক্যান্টনমেন্টের হাসপাতালে। দু’-দিন কোমায় থাকার পর হার মানল বেঁচে থাকার চেষ্টা।

সফেদ শয়তানদের পাহাড়

কার্গিল আর লেহ, এই দুই জেলা নিয়ে জম্মু-কাশ্মীরের লাদাখ সাব ডিভিশন। সোনমার্গ থেকে লাদাখে ঢুকতে লেগে গেল পাক্কা দু’ঘণ্টা। কার্গিলে ঢোকার মুখেই সেনার চেকপোস্ট। বাধ্যতামূলক চেকিংয়ে গাড়ি দাঁড় করাতে হল। কর্তব্যরত সেনা জওয়ানদের থেকে জানলাম, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শুষ্ক আবহাওয়ার মধ্যে বল্গাহীন বইতে থাকা হাওয়ায় সেই ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসটা ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বলে অনুভব হয়। কাশ্মীর উপত্যকাকে ঘেরা পাহাড়গুলো সবুজ রংয়ের, সোনমার্গ পেরোতেই পাহাড়ের রং বদলে যায় ধূসর কিংবা খয়েরিতে। উদ্ভিদহীন এই সব পাহাড়েই বিভিন্ন সামরিক বাহিনী প্রশিক্ষণ নিতে আসে, যখন যে দল আসে, পাহা়ড়ের গায়ে চিহ্ন এঁকে যায়। এ রকমই কোনও একটা পাহাড়ের গায়ে লেখা ছিল ‘হোয়াইট ডেভিলস হিল’। কার্গিলে ঢোকার কিছু পরেই দেখলাম কার্গিল ব্যাটল স্কুল। এমনিতে পাঁচ-ছয় কিলোমিটার অন্তর অন্তরই সেনার ক্যাম্প আছে। কিন্তু এই ব্যাটল স্কুলে বিশেষত্ব হল, এখানে পার্বত্য যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রতিকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতির জন্য কার্গিল যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। সেখান থেকেই এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভাবনা। পার্বত্য যুদ্ধবিদ্যার ঘোরপ্যাঁচ আর কৌশলের পাঠ দেওয়া হয় কার্গিলের এই ব্যাটল স্কুলে।

যুদ্ধ প্রশিক্ষণে আসা সামরিক বাহিনী এ ভাবেই পাহাড়ের গায়ে নিজেদের নাম লিখে যায়। 

 

অবশেষে কার্গিল

আগেই বলেছি, এই রাস্তা দিয়ে লেহ্ যাওয়া যায়। তাই বছরভর এখানে বাইকারদের আনাগোনা লেগেই থাকে। আমাদের গাড়ির চালক গুলজার বললেন, স্বাধীনতা দিবস বলে এই ভিড়টা খানিকটা বেশি। কার্গিল ওয়ার মেমোরিয়ালের পথেই ছোট্ট টাউন দ্রাস। ছোট হলেও বেশ প্রাণচঞ্চল। জমজমাট বাজার রয়েছে, কোথাও সক্কাল সক্কাল গরম গরম খাবারের পসরা নিয়ে ব্যস্ত দোকানি। জিলিপি, পরোটা, কী নেই। বাইকারদের একটা বড় দল সেখানে জলখাবার খাচ্ছে। লোভ লাগছিল, কিন্তু আমাদের সেই বিলাসিতার সময় নেই, পাছে অনুষ্ঠানটা মিস হয়ে যায়। দ্রাসের ওই বাজার এলাকাটা পেরোতেই বাঁ দিকে চলে গেছে মুশকো উপত্যকা। এই সেই উপত্যকা যেখানে শত্রুপক্ষের থেকে পিক ৪৮৭৫ উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন অনুজ নায়ার,  ক্যাপ্টেন বিক্রম বাতরা। রাইনো হর্ন, টাইগার হিলও এই পথেই। মুশকো উপত্যকায় প্রবেশের ওই মোড় থেকেই কিছুটা দূরের একটা পাহাড়ে ইংরেজি হরফে কিছু একটা লেখা। আরও একটু এগোতেই লেখাটা স্পষ্ট হল – ‘তোলোলিং’।

দূরে দেখা যাচ্ছে তোলোলি‌ং পাহাড়।

এই পাহাড়ের পাদদেশেই কার্গিল ওয়ার মেমোরিয়াল। অপারেশন বিজয়ের সব থেকে কঠিন ল়ড়াইটা এখানেই হয়েছিল। ওয়ার মেমোরিয়াল থেকে উপর দিকে তাকালে যে পাহাড়চূড়াটা দেখা যায় সেটা পয়েন্ট ৫১৪০, প্রায় ১৬ হাজার ৯০০ ফুট উঁচু। তোলোলিং পর্বতের সবচেয়ে উঁচু শিখর। সবুজের চিহ্ন নেই বললেই চলে। খাড়া উঠে গেছে পাহাড়টা। এই পাহাড়ের গায়ে সেনাবাহিনীর ২৬ জন অফিসার ও জওয়ান শহিদ হন, প্রায় এক মাসের লড়াই শেষে সাফল্য পায় ভারতীয় সেনা।

ওয়ার মেমোরিয়ালে তখন সাজ সাজ রব। বিছানো লাল কার্পেট। পর্যটকদের ভিড়। কিছু ক্ষণের মধ্যেই সেনাকর্তারা এলেন। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সকাল নটায় শুরু হল শ্রদ্ধাজ্ঞাপন অনুষ্ঠান। এর পর এক সেনা জওয়ান মাত্র সাত মিনিটে কার্গিল যুদ্ধের যে গল্প বললেন তা শুনে শিহরিত হতে হয়।

আরও পড়ুন: স্বাধীনতার মানে...কী বলছেন সেলেবরা?

মাইনাস ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর ৪০০ পাহাড়চূড়া

“যে জায়গায় আমরা দাঁড়িয়ে, জানুয়ারি মাসে সেখানেই তাপমাত্রা থাকে মাইনাস ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রায় দেড়শো বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তোলোলিং পাহাড়ের মতো ৪০০টা পাহাড় চূড়ার দখল নিয়েছিল পাকিস্তানি সেনা ও তাদের মদতে পুষ্ট অনুপ্রবেশকারীরা। দু’ মাসের কার্গিল যুদ্ধে সরকারি হিসেবে ৫৫৯ জন ভারতীয় সেনার মৃত্যু হয়, জখম হন ১৫৩৬ জন।” বলছিলেন ওই সেনা জওয়ান।

কার্গিল ওয়ার মেমোরিয়ালে শহিদদের বীরভূমি।

অনুষ্ঠান শেষে ঘুরে দেখলাম ওয়ার মিউজিয়াম। ছোট মিউজিয়ামটা যেন কার্গিল যুদ্ধের জলজ্যান্ত দলিল। বীর সেনানিদের নাম, যুদ্ধের নানা মানচিত্র, পাকিস্তানি সেনার ব্যবহৃত অস্ত্র, কার্গিল যুদ্ধের কৌশলগত নকশা মজুত মিউজিয়ামের সংগ্রহে। মিউজিয়ামের পাশে ঠাঁই পাওয়া আইকনিক বোফর্স কামান, মিগ-২১ বিমান, পাক সেনার ফেলে যাওয়া তাঁবু দর্শকদের যেন টাইম মেশিনে চড়িয়ে নিয়ে যায় ১৯৯৯ সালের অশান্ত সময়টায়। প্রায় দু’দশক আগে এই ভূমিতেই কত রক্ত ঝরেছিল, আজ সেখানেই আমি দাঁড়িয়ে, এ কথা ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়েছে। ১৯৪৭ থেকে ’৯৯ পর্যন্ত কার্গিল রক্ষায় শহিদদের বীরভূমি ওয়ার মেমোরিয়ালের বাঁ দিকে। সারিবদ্ধ সেই ফলক দেখতে দেখতে বাকরুদ্ধ হতে হয়।

আরও পড়ুন: ইন্ডিয়ারেই কইলকেতা কয়

লেফ্টেন্যান্ট কণাদ ভট্টাচার্যকে চেনেন?

কার্গিল ওয়ার মেমোরিয়ালে গিয়ে আগে এই মানুষটার খোঁজ করেছি। লেফ্টেন্যান্ট কণাদ ভট্টাচার্য কার্গিল যুদ্ধে শহিদ এক কলকাতাবাসী। আমার বাড়ির কাছেই ওঁদের বাড়ি। টাইগার হিল পুনরুদ্ধারে গিয়ে আর ফেরেননি আট শিখ রেজিমেন্টের এই সাহসী অফিসার। প্রায় দু’মাস পর উদ্ধার হয় তাঁর বরফে ঢাকা দেহ। মরণোত্তর সেনা মেডেল পেয়েছিলেন কণাদ। ওয়ার মেমোরিয়ালে স্বর্ণাক্ষরে লেখা শহিদদের তালিকায় ডান দিক থেকে চতুর্থ কলামের প্রথম লাইনেই পেলাম ওঁর নামটা। মিউজিয়ামেও একটা তালিকায় প্রথম সারিতে ওঁর নাম।

কার্গিল যুদ্ধের শহিদদের তালিকায় ডান দিক থেকে চতুর্থ কলামের প্রথম সারিতেই শহিদ লেফ্টেন্যান্ট কণাদ ভট্টাচার্যের নাম।

আরও পড়ুন: স্বাধীনতার সে দিন, কেমন ছিল আনন্দবাজারের পাতা

আজ কার্গিল শান্ত। জম্মু-কাশ্মীরের বাকি অংশে বিচ্ছিন্ন ভাবে সন্ত্রাস চললেও কার্গিলে সে সব নেই। পয়েন্ট ৪৮৭৫-এর নাম এখন শহিদ ক্যাপ্টেন বিক্রম বাতরার স্মরণে বাতরা টপ নামে খ্যাত। স্বাধীনতা দিবসের সকালে কার্গিলের সেনা ক্যাম্পগুলোতে হাসি-ঠাট্টা, খেলাধুলোর ফুরসত পান জওয়ানরা, শরিক হতে পারেন স্বাধীনতা দিবসের আনন্দে। রুক্ষ-শুষ্ক তোলোলিংয়ের পাদদেশে শহিদদের বীরভূমিকে আগলে এখন সবুজ জন্মেছে। আজ সেখানে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে পর্যটকদের ভিড়, সেলফি তোলার হিড়িক।

কোনওটাই আজ সত্যি হত না যদি ১৯৯৯ সালের সেই সঙ্কটপূর্ণ সময়ে হাজার হাজার বীর যোদ্ধা দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় ঝাঁপিয়ে না পড়তেন। মনে পড়ে যায়, কার্গিল ওয়ার মেমোরিয়ালে ঢোকার মুখে লেখাটা: “অল গেভ সাম, সাম গেভ অল। গন বাট নেভার ফরগটন।”

ছবি: ঋত্বিক দাস ও অর্চিস্মান সাহা।