শারীরচর্চা মানেই যে শুধু ওজন তোলা কিংবা দৌড়ানো, তা নয়। পেশি কী ভাবে সঙ্কুচিত-প্রসারিত হচ্ছে, তা কতটা সচল ও নমনীয়— তা-ও বিচার্য। জিম কিংবা বাড়িতে আমরা নানা ধরনের ব্যায়াম করে থাকি। নতুন নতুন শুরু করার সময়ে কী কী ব্যায়াম করব, তা নিয়েও দ্বিধা থাকে। ফিটনেস প্রশিক্ষক অরিজিৎ ঘোষাল বলছেন, “ব্যায়ামের ধরনগুলো আগে বুঝতে হবে। আইসোমেট্রিক, আইসোটনিক ও আইসোকাইনেটিক— এক্সারসাইজ় মূলত এই তিন ধরনের। সাধারণত জিম কিংবা বাড়িতে এই সব ধরনের ব্যায়াম মিলিয়েই এক একটি সেট তৈরি করা হয়। তবে চাইলে এর মধ্যে যে কোনও এক ধরনের এক্সারসাইজ়ও করা যায়।” গ্রিক শব্দ ‘আইসোস’ থেকে এই ‘আইসো’ শব্দটি এসেছে, যার অর্থ সমান। পেশির দৈর্ঘ্য সমান রেখে এই ব্যায়ামগুলি করা হয় বলেই তার এমন নামকরণ।
আইসোমেট্রিক এক্সারসাইজ় কী?
আইসো শব্দের অর্থ সমান, আর মেট্রিক শব্দের অর্থ দৈর্ঘ্য। এই ধরনের ব্যায়ামে পেশি সঙ্কুচিত হয়, কিন্তু জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধি নড়ে না। পেশির দৈর্ঘ্য অপরিবর্তিত থাকে। আইসোমেট্রিক এক্সারসাইজ়ে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে শরীরকে কিছু সময় ধরে রাখা হয়। এতে পেশিতে চাপ পড়ে, তার জোর বাড়ে। ফলে শরীরের ভারসাম্য রাখতে পেশি সক্ষম হয়। আপার বডি, কোর মাসল, পা... শরীরের সব অংশের জন্যই আইসোমেট্রিক এক্সারসাইজ় হয়। প্ল্যাঙ্ক, ওয়াল সিট এর আওতায় পড়ে।
- প্ল্যাঙ্ক: মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ুন। কনুই ও পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে শরীরকে মাটির সমান্তরালে তুলে ধরুন। এই অবস্থানে চল্লিশ সেকেন্ড থেকে এক মিনিট হোল্ড করুন।
- ওয়াল সিট: দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে হাঁটু ভাঁজ করে চেয়ারের মতো বসার ভঙ্গিতে থাকুন অন্তত তিরিশ সেকেন্ড।
- গ্লুট ব্রিজ হোল্ড: যোগা ম্যাটে চিৎ হয়ে শুয়ে হাঁটু ভাঁজ করুন। পায়ের পাতার উপরে ভর দিয়ে এ বার নিতম্ব তুলে শরীর সোজা ধরে রাখুন প্রায় এক মিনিট। পেলভিক মাসলের জন্য এই ব্যায়াম কার্যকর।
- কাফ রেজ় হোল্ড: সাধারণ কাফ রেজ়ের মতো গোড়ালি তুলে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে শরীরকে ধরে রাখুন কুড়ি-তিরিশ সেকেন্ড।
- হলো বডি হোল্ড: চিৎ হয়ে শুয়ে হাত ও পা সামান্য মাটি থেকে তুলে কোর পেশিকে সক্রিয় করুন।
অরিজিৎ বলছেন, “আপার বডির জন্য পুশ আপ, প্ল্যাঙ্ক শোল্ডার ট্যাপস, বাইসেপ কার্ল, ওভারহেড আর্ম ইত্যাদি। কোর মাসলের জন্য প্ল্যাঙ্ক, হলো বডি হোল্ড, ডেড বাগ হোল্ড ইত্যাদি করতে পারেন। পায়ের জন্য ওয়াল সিট, স্কোয়াট হোল্ড, কাফ রেজ়, গ্লুট ব্রিজ করা যায়।” তবে মনে রাখবেন, কোনও মুভমেন্ট নয়। এই শারীরচর্চায় ব্যায়ামটি করার যে ভঙ্গি, সেই ভঙ্গিতে নির্দিষ্ট সময় পেশিকে হোল্ড করে রাখতে হবে। প্রতিটি ব্যায়াম করতে হবে কিছুক্ষণ হোল্ড করে।” স্ট্যাটিক হোল্ড এবং ম্যাক্সিমাল আইসোমেট্রিক— দু’ধরনের আইসোমেট্রিক এক্সারসাইজ় হয়। প্ল্যাঙ্ক থেকে হলো বডি এক্সারসাইজ়... সবই স্ট্যাটিক এক্সারসাইজ়ের মধ্যে পড়ে। ম্যাক্সিমাল আইসোমেট্রিকে সাধারণত অচল বস্তুর উপরে জোর প্রয়োগ করতে হয়। যেমন— আপনি একটি দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে সেটিকে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করছেন। এ ক্ষেত্রে দেওয়াল নড়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু তার জন্য যে শারীরিক ভঙ্গিমায় পেশিগুলি কনট্র্যাক্ট হচ্ছে, তা অন্তত ২০-৩০ সেকেন্ড ধরে রাখা জরুরি।
আইসোমেট্রিকের সুবিধা
এতে পেশির জোর বাড়ে, কোর মাসল শক্তিশালী হয়, ভবিষ্যতে অস্থিসন্ধির উপরে চাপ কম পড়ে। দেহে কোথাও আঘাত লাগার পরে শারীরচর্চা শুরু করলে বা কোনও নির্দিষ্ট পেশির নমনীয়তা বাড়াতে এই ধরনের ব্যায়াম কার্যকর। মূলত পেশির স্টেবিলিটি ও রিহ্যাবের জন্য এই ব্যায়াম। হাঁটু, কাঁধ, কোমরের সমস্যায় যাঁরা ভুগছেন, তাঁরাও করতে পারেন। বয়স্কদের জন্যও এই শারীরচর্চা নিরাপদ। তবে এখানে ঠিক মতো শ্বাস নেওয়া ও ছাড়া জরুরি। উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকলেও দীর্ঘক্ষণ এই ধরনের শারীরচর্চায় অসুবিধা হতে পারে।
আইসোটনিক ব্যায়াম
আইসোমেট্রিকে যেমন শরীর স্থির রাখা হয়, আইসোটনিক ঠিক এর বিপরীত। ‘টনিক’ অর্থাৎ ‘টান’। এ ক্ষেত্রে পেশি সঙ্কুচিত-প্রসারিত হয়, কিন্তু ওজন বা রেজ়িস্ট্যান্স মোটামুটি একই থাকে। স্কোয়াট, পুশ-আপ, শোল্ডার প্রেস, ক্রাঞ্চেজ় থেকে শুরু করে রোজকার হাঁটা, দৌড়ানো, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা, সাইক্লিং, সুইমিং... সবই এর আওতায় পড়ে। ইসেন্ট্রিক, কনসেন্ট্রিক— দু’ধরনের আইসোটনিক এক্সারসাইজ় হয়। টান কমিয়ে পেশি যখন সঙ্কুচিত হয় তখন কনসেন্ট্রিক, যখন পেশি প্রসারিত হয়, টান বাড়ে তখন ইসেন্ট্রিক এক্সাসাইজ়। সহজ কথায়, বাইসেপ কার্ল করার সময়ে ডাম্বেল যখন নীচের দিকে নামানো হয়, তখন ইসেন্ট্রিক এবং যখন উপরের দিকে তোলা হয় তখন তাকে কনসেন্ট্রিক বলা হয়। এতে পেশি শক্তিশালী হয়, ফ্যাট কমে, সচলতা বাড়ে।
আইসোকাইনেটিক এক্সারসাইজ়
মূলত রিহ্যাব সেন্টারগুলিতে এ ধরনের শারীরচর্চা করানো হয়। এ ক্ষেত্রে মেশিনের সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত গতিতে পেশির মুভমেন্ট করানো হয়। সাধারণ জিম বা এক্সারসাইজ় সেন্টারে এ ধরনের মেশিন থাকে না। ফিজ়িক্যাল থেরাপি বা রিহ্যাব সেন্টারগুলিতে ট্রেনারের উপস্থিতিতে করানো হয়। এতে বেকায়দায় আঘাত লাগার সম্ভাবনা কম। কাঁধ, কনুই হাঁটু, গোড়ালি... শরীরের সব অংশের জন্যই এ ক্ষেত্রে আলাদা ব্যায়াম হয়। কোনও হাড় ভাঙলে বা অ্যাঙ্কেল স্প্রেন, টেনিস এলবো, হাঁটু প্রতিস্থাপনের পরে পেশিকে ফের সচল করতে কিংবা তার কার্যক্ষমতা বাড়াতে এই ব্যায়াম করা হয়। অ্যাথলিট কিংবা ফিজ়িয়োথেরাপির রোগীদের জন্য কার্যকর। সিঙ্গল জয়েন্ট ও মাল্টি-জয়েন্ট, দু’ধরনের যন্ত্র হয়। তিন ধরনের আইসোকাইনেটিক এক্সারসাইজ় হয়—
- থেরাপিউটিক: কোনও অস্ত্রোপচারের পরে রিহ্যাবিলিটেশনের জন্য এই ধরনের ব্যায়াম করা হয়।
- ট্রেনিং: মূলত খেলোয়াড়দের জন্য। অ্যাথলিটদের পারফরম্যান্স বাড়াতে এই শারীরচর্চা।
- অ্যাসেসমেন্ট: পেশির শক্তি মাপতে এই ব্যায়াম।
আইসোটনিক, আইসোমেট্রিক ও আইসোকাইনেটিক —এই তিন ধরনের ব্যায়াম একে অন্যের পরিপূরক। ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী এই তিন ধরনের ব্যায়ামের ঠিক সমন্বয় করলে শরীর সুস্থ, শক্তিশালী ও কর্মক্ষম রাখা সম্ভব।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)