Advertisement
E-Paper

চোখ যখন গন্ধ পায়, কানে জাগে স্বাদ! মস্তিষ্কের এমন আশ্চর্য অবস্থাটি কী করে হয়?

ইন্দ্রিয়েরা যেন উল্টেপাল্টে যায়। বা মিলেমিশে যায়। তখন সুরও চোখে দেখা যায়! শোনা যায় রং! স্পর্শ করা যায় স্বাদ!

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৪
Synesthesia, a neurological phenomenon where the Senses Intertwine

শোনা যায় রং, চাখা যায় শব্দ। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

"মালতী, তোমার মন নদীর স্রোতের মত চঞ্চল উদ্দাম ; মালতী, সেখানে আমি আমার স্বাক্ষর রাখিলাম।" তিরিশের দশকের কবি অজিত দত্তের লেখা এই পঙ্‌ক্তিগুলি এক সময় বাঙালি যুবাদের মুখে মুখে ফিরেছে। কবিতা তার নিজের জায়গায় সপ্রযুক্ত উপমাই ব্যবহার করেছে। চঞ্চল মনের সঙ্গে নদীতরঙ্গের উপমা খুব সুদূর নয়। কিন্তু সেখানে 'সাক্ষর' রাখা? বাস্তবে কোথাও সাক্ষর করতে গেলে কালি-কলম লাগে। নদীর উদ্দাম জলস্রোতে তা কি রাখা যায়? কবির কল্পনায় হয়তো যায়। কিন্তু বাস্তবে যদি কেউ জলকে সাদা কাগজের পাতা ভাবেন আর তার উপরে নীল বা কালো রঙের কালি দিয়ে সই করার কথা কল্পনা করেন, তবে তাঁকে কিঞ্চিৎ ছিটগ্রস্ত সাব্যস্ত করতেই পারে সমাজ। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, তেমনটা হতেই পারে। তবে তার জন্য দরকার মস্তিষ্ক তথা স্নায়ুতন্ত্রের বিশেষ অবস্থা।

আবার, রেডিয়োয় শোনা একটা গানের কলি, ঠাকুমার তোরঙ্গের গন্ধ ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে স্বপ্নময় স্মৃতিতে। স্রেফ গন্ধ শুঁকে পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে যাওয়া, নিছক কল্পনা নয়, বরং বিজ্ঞান এ শক্তিকে যথাযথ বলেছে। মিঠে রোদে গা ভাসিয়ে— এ কথা তো অনেকেই বলেন। তা রোদের স্বাদ কি কেউ চেখে দেখেছেন? সুকুমার রায়ের ‘সীতানাথ বন্দ্যো’ মনে হয় চেখেছিলেন। না হলে বললেন কী ভাবে ‘আকাশের গায়ে নাকি টকটক গন্ধ’ বলতে পারেন? বৃষ্টি হলে তা না কিআবার এক্কেবারে মিষ্টি হয়ে যায়! ধরাছোঁয়ার বাইরে যা কিছু, তাকে রং, শব্দ বা আকারে কল্পনা করা এক ধরনের প্রবৃত্তি। তা সকলের থাকে না। কারও কারও থাকে। তাই কবির কল্পনায় স্বপ্নের রং নীল, মেঘের ছায়ার স্বাদ পানসে। কিন্তু বাস্তবেই কারও কারও ইন্দ্রিয়গুলি যেন উল্টেপাল্টে যায়। বা মিলেমিশে যায়। তখন সুরও চোখে দেখা যায়! শোনা যায় রং! ইন্দ্রিয়ের এই অতি-সক্রিয়তার নাম 'সিনেস্থেসিয়া'। তবে তা বিশ্বে ০.২ শতাংশ বা তারও কম জনের হয়।

বহুদূর থেকে ভেসে আসা সুরের কি কোনও রং হয়, শব্দেরও কি স্বাদ হয়?

বহুদূর থেকে ভেসে আসা সুরের কি কোনও রং হয়, শব্দেরও কি স্বাদ হয়? ফাইল চিত্র।

ইন্দ্রিয়ের জগাখিচুড়ি

Advertisement

মানুষের তো পাঁচটি ইন্দ্রিয়। চোখ দিয়ে দেখা, কান দিয়ে শোনা, জিভ দিয়ে স্বাদ গ্রহণ, নাক দিয়ে ঘ্রাণ নেওয়া আর ত্বক দিয়ে স্পর্শ অনুভব করা। এই তো কাজ। প্রতি ইন্দ্রিয় যে যার নির্দিষ্ট পথে চলে। এখন ভাবুন তো, বৃষ্টির শব্দ শুনলে মনে নানা রং খেলা করে কি না? কখনও গান শুনতে শুনতে চোখের সামনে নানা অবয়ব-রং কল্পনা করেন কি? অনেকে বলবেন, তা মাঝেমধ্যে হয়। যাঁদের প্রতি ক্ষণে হয়, তাঁরাই 'সিনেস্থেট'। সিনেস্থেসিয়া কোনও রোগ নয়। সিনড্রোমও নয়। এক অতি বিরল স্নায়বিক অবস্থা, যেখানে এক ইন্দ্রিয় সাড়া দিলে, অন্যটিও স্বয়ংক্রিয় ভাবে জেগে ওঠে। সিনেস্থেটরা (এই ক্ষমতা যাঁদের আছে) তাঁরা বেশ কল্পনাপ্রবণ। হয়তো ধ্বনি শুনলে রং দেখতে পান, অথবা শব্দ শুনে তার স্বাদ বুঝতে পারেন। অক্ষর বা সংখ্যার নির্দিষ্ট রং অনুভব করতে পারেন, অথবা স্বাদ পেলে কোনও জ্যামিতিক আকার দেখতে পান।

আমির খসরু গেয়েছিলেন, ‘‘আপনি সি রং দিনি রে মোসে নয়না মিলাইকে?’’ এক পলক তাকিয়েই কী ভাবে তুমি তোমার রঙে রাঙিয়ে তুলতে পারো আমায়— নয়নে নয়ন মিললেই যেন লজ্জার লাল রং লাগে গালে। অনুভূতিরও রং হয়। তা সিনেস্থেট দেখতে পান। গন্ধকে পাকড়াও করে ফিরে যেতে পারেন স্মৃতিতে। খুব মলিন হয়ে যাওয়া স্মৃতিও স্রেফ গন্ধের জোরে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠতে পারে তাঁদের সামনে। সবই স্নায়ুর কারসাজি। গবেষকেরা একে ব্যাখ্যা করেন ‘ক্রস-অ্যাক্টিভেশন থিয়োরি’ দিয়ে। যখন ইন্দ্রিয়ের অনুভূতিগুলি একে অপরের উপর চেপে বসে বা বলা ভাল ইন্দ্রিয়ের সমাপতন হয়। কান যখন শব্দ শোনে, তখন চোখ তার রং কল্পনা করে, আবার চোখ যখন কোনও দৃশ্য দেখে জিভ তার স্বাদ অনুসপ্ক

সপ্ত সুরের প্রতি স্বরেও রং খুঁজে পান সিনেস্থেটরা।

সপ্ত সুরের প্রতি স্বরেও রং খুঁজে পান সিনেস্থেটরা। ফাইল চিত্র।

হয়ে গেল ‘হাঁসজারু’, কেমনে তা জনি না

ছিল হাঁস, ছিল সজারুও। ব্যাকরণ না মেনেই তারা মিলে গিয়ে হল ‘হাঁসজারু’। কবির কল্পনায় হাঁসের সঙ্গে সজারুর মিলে যেতে পারে, আবার বকের সঙ্গে কচ্ছপ মিলে বকচ্ছপও হতে পারে। তবে সবটাই মজার ছলে। কিন্তু বাস্তবের সিনেস্থেটরা স্বতঃস্ফূর্থ ভাবে কল্পনাতেই এমন নির্মাণ করে চলে চলেন। সিনেস্থেসিয়া অসংখ্য রকমের হতে পারে। তবে কয়েকটি পরিচিত বিষয় কিছু মানুষের আছে। তাই সেগুলিই আলোচনায় উঠে এসেছে বারে বারে। গ্রাফিম-কালার সিনেস্থেসিয়ার এক ধরন। এতে অক্ষর বা সংখ্যা দেখলেই মনে মনে নির্দিষ্ট কোনও রং দেখা যায়। সিনেস্থেটরা ইংরেজি বর্ণমালার ‘এ’ অক্ষরটিতে অনেক সময়েই লাল রং হিসাবে কল্পনা করে নেন। তেমনই সুরের প্রতি স্বরকে আলাদা আলাদা রঙে চেনেন কেউ কেউ। এই রং-কল্পনা একেক জনের কাছে একেক রকম হতে পারে। নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফিনম্যান তাঁর প্রতিটি গাণিতিক সমীকরণকে নানা রঙে কল্পনা করতেন। প্রতি সংখ্যা, অক্ষরকে আলাদা আলাদা রঙে চিনতেন। জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় 'উটের গ্রীবার মতো নিস্তব্ধতা' বা 'চিনেবাদামের মতো বিশুষ্ক বাতাস'-এর কথা লিখেছেন। তাঁর সিনেস্থেসিয়া ছিল কি না জানা যায় না। তবে এমন অদ্ভুত উপমা যদি কেউ বাস্তবে বোধ করেন, তিনি অবশ্যই সিনেস্থেট।

ক্রোমেস্থেসিয়ায় গান বা শব্দ শুনলে চোখের সামনে কোনও আকার বা জ্যামিতিক নকশা ভেসে ওঠে। বলা হয়, চিত্রশিল্পী ভিনসেন্স ভ্যান গঘের ক্রোমেস্থেসিয়া ছিল। তিনি পিয়ানোর সুরকে রঙের সঙ্গে মেলাতেন। ইন্দ্রিয়ের একই রকম অতিসক্রিয়তা রয়েছে পপ গায়িকা লেডি গাগারও। তাঁর সুরে রঙের প্রভাব বড় বেশি। গাগা নিজেই নানা সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, সুর ভাবার সময়ে তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে নানা রং। তাঁর ‘ক্রোমাটিকা’ অ্যালবামটি সুর ও রঙের মিলমিশের জন্যই জনপ্রিয়। গায়িকা বিলি আইলিশের নিজের তো বটেই, তাঁর পরিবারের অনেকেরও সিনেস্থেসিয়া আছে। বিলি তাঁর গানের প্রতি সুরকে নির্দিষ্ট রং ও দৃশ্যের সঙ্গে কল্পনা করেন।

লেক্সিক্যাল গাস্টেস্টোরি সিনেস্থেসিয়ার আরও একটি ধরন। এখানে শব্দের সঙ্গে স্বাদের মিলমিশ ঘটে। কোনও শব্দ শুনলে তার স্বাদ অনুভব করা যায়। ব্রিটিশ লেখক জেমস ওয়ানারটন সিনেস্থেসিয়ার এই ধরনের জন্যই পরিচিত। তাঁকে নিয়ে এক সময়ে লেখালেখিও হয়েছে বিস্তর। জেমস জানিয়েছেন, তিনি শব্দের স্বাদ অনুভব করতে পারেন।

স্পেশাল সিকোয়েন্স সিনেস্থেসিয়া যাঁদের থাকে, তাঁরা দিন-মাস বা বছরগুলিকে একটি নির্দিষ্ট আকারে ক্রিমাত্রিক অবস্থানে কল্পনা করেন। সপ্তাহের কোনও দিন বা কোনও তারিখ চোখের সামনে একটি মানচিত্রের মতো ভেসে ওঠে। তাঁরা মনে করেন, তাঁদের চারদিকে এমন এক অদৃশ্য বলয় আছে, যেখানে ঘড়ির কাঁটা, ক্যালেন্ডারের দিন বা নানা সংখ্যার ক্রমগুলি পর পর সাজানো আছে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থানে। কেউ তা স্বচক্ষে দেখতে পান, আবার কেউ শুধু অনুভব করেন।

প্রিয়জনকে ব্যথা পেতে দেখলে নিজের শরীরেও কি সে ব্যথা অনুভব করেন? সিনেস্থেটরা একটু বেশিমাত্রাতেই করেন। মিরর-টাচ সিনেস্থেসিয়া ইন্দ্রিয়ের এমন এক অনুভূতি, যেখানে কাউকে স্পর্শ করতে দেখলে বা আঘাত দিতে দেখলে, নিজের শরীরেও তা টের পাওয়া যায়। যেমন, চোখের সামনে কাউকে বাঁ গালে স্পর্শ করতে দেখলে ঠিক আয়নার মতো বিপরীতে অর্থাৎ, নিজের ডান গালে সেই স্পর্শের অনুভূতি পাবেন সিনেস্থেটরা। এমন অনুভূতি আনন্দদায়ক বা বেদনাদায়ক, দুই-ই হতে পারে।

মস্তিষ্কের এক কুঠুরির অনুভূতি মিলেমিশে যায় অন্য কুঠুরির সঙ্গে।

মস্তিষ্কের এক কুঠুরির অনুভূতি মিলেমিশে যায় অন্য কুঠুরির সঙ্গে। ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

কখনও মনে হয়েছে মার্চ মাস খুব রাগী কোনও পুরুষ, আবার নভেম্বর শান্ত শীতল অনুভূতির কোনও নারী! অর্ডিনাল লিঙ্গুইস্টিক পারসনিফিকেশন (ওএলপি) হলে এমনটা মনে হতে পারে। সিনেস্থেসিয়ার এই রূপে বর্ণমালা, সংখ্যা, সপ্তাহ বা মাসকে অজান্তেই কোনও ব্যক্তি বা লিঙ্গের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। গবেষকেরা দেখেছেন, ওএলপি থাকলে সেই মানুষজন বেশ আবেগপ্রবণ হন। তাঁদের কল্পনায়, ‘৭’ হয়তো কোনও বৃদ্ধ, আবার ইংরেজি বর্ণমালার ‘জে’ অক্ষরটি লাজুক কোনও মেয়ে।

গন্ধ-বিচার

গন্ধও ছবি আঁকে। অতীতের ছবি। হারানো স্মৃতির ছবি। পুরনো বইয়ের গন্ধ শুঁকে এক লহমায় ‘টাইম-ট্রাভেল’ করে ছেলেবেলায় ফিরে যাওয়া কোনও ব্যাপারই নয়। শৈশবে মায়ের গায়ের গন্ধ, অষ্টমীতে অঞ্জলি দেওয়ার সময়ে পাটভাঙা পাঞ্জাবির গন্ধ, অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে হাতের উষ্ণ স্পর্শ বা বার্ধক্যের রোমন্থন— সবেরই বর্ণ ও গন্ধ আছে যা মস্তিষ্ক মনে রাখে। সিনেস্থেটদের এই ক্ষমতা খানিক বেশি। কেবল গন্ধ শুঁকে ধূসর অতীতের কোনও স্মৃতি ফিরিয়ে আনা এঁদের কাছে সহজ।

গন্ধের অনুভূতি বহনকারী রিসেপ্টরগুলি কেমন করে বিশেষ ঘ্রাণকোষ থেকে নাক হয়ে মস্তিষ্কে সঙ্কেত পাঠায়, আণবিক স্তরে তার গবেষণা হয়েছে। গন্ধ শনাক্তকারী ‘অডোরান্ট রিসেপ্টর’ আবিষ্কার করে ২০০৪ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন দুই আমেরিকান বিজ্ঞানী, রিচার্চ অ্যাক্সেল ও লিন্ডা বি বাক। কোনও কিছু শনাক্ত করতে গেলে যে ইন্দ্রিয় বা অনুভূতি কাজে লাগে, তার মধ্যে ঘ্রাণশক্তির জোর খুব বেশি। পূর্বস্মৃতি মনে পড়ার ক্ষেত্রেও গন্ধই উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। নাকের ভিতরের দেওয়ালে থাকে লক্ষ লক্ষ স্নায়ুকোষ। বিজ্ঞান বলে, মানুষ স্বাভাবিক অবস্থায় হাজার দশেক গন্ধের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। কারও ক্ষেত্রে হয়তো সংখ্যাটা আর একটু বেশি। গন্ধ আসলে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অণু যা নাসারন্ধ্র দিয়ে ঢুকে মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা ও হিপ্পোক্যাম্পাস গিয়ে ধাক্কা দেয়। হিপ্পোক্যাম্পাস আবার স্মৃতির কুঠুরি। এখানকার স্নায়ুরা গন্ধ-অনুভূতির সঙ্কেত বাক্সবন্দি করে রেখে দেয় পদীপিসির বর্মিবাক্সের মতো। ফের সেই চেনা গন্ধ পেলে স্মৃতির বাক্স খুলে দেয়।

স্পর্শ-গন্ধ-শব্দেরা ‘ওভারল্যাপ’ করে যায় সিনেস্থেটদের চেতনায়।

স্পর্শ-গন্ধ-শব্দেরা ‘ওভারল্যাপ’ করে যায় সিনেস্থেটদের চেতনায়। ছবি: ফ্রিপিক।

সিনেস্থেসিয়া: এক জৈব রাসায়নিক রচনা

মস্তিষ্কের মধ্যে কয়েক লক্ষ কোটি স্নায়ুকোষের মধ্যে আদানপ্রদান চলে। তার প্রধান অংশ সেরিব্রামের চারটি লোব বা খণ্ড রয়েছে। ফ্রন্টাল লোব চিন্তাভাবনা, আবেগ দেখে, প্যারাইটাল লোব বোঝে স্পর্শ, কানে দু’পাশে থাকা টেম্পোরাল লোব শব্দ শোনে এবং অক্সিপিটাল লোব দেখে দৃশ্য। প্রতিটি খণ্ড আলাদা থাকে ও তাদের কাজ নির্দিষ্ট। অসংখ্য স্নায়ুতন্ত্র দিয়ে তাদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় থাকে। সিনেস্থেসিয়া হলে এই যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ হয়। প্রতিটি খণ্ডের মধ্যে এতবেশি স্নায়ু তারের মতো জুড়ে যায় যে, একটি সক্রিয় হলে, অন্যটিও সাড়া দেয়। এক অচ্ছেদ্য জৈব-রাসায়নিক বন্ধন তৈরি হয়।

ভারতে এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছেন তামিলনাড়ুর এক চিকিৎসক ভি এস রামচন্দ্রন। তাঁর গবেষণাপত্রও রয়েছে এই বিষয়ে। রামাচন্দ্রনের কাজ মূলত গ্রাফিম-কালার সিনেস্থেসিয়া নিয়ে, যেখানে অক্ষর বা সংখ্যার অনুষঙ্গে রং কল্পনা করা হয়। তিনি দেখিয়েছেন, মস্তিষ্কের বর্ণ চেনার এলাকা এবং অক্ষর চেনার এলাকা পাশাপাশি থাকে। সিনেস্থেটদের ক্ষেত্রে এই দুই এলাকার মধ্যে স্নায়বিক সংযোগ অনেক বেশি। একটি এলাকা সক্রিয় হলে পাশেরটিও উদ্দীপিত হয়ে পড়ে। ফলে দুই অনুভূতি ‘ওভারল্যাপ’ করে যায়।

সিনেস্থেসিয়া অবস্থাটি মস্তিষ্কের গঠনগত এক বৈশিষ্ট্য। এটি আবার জিনগতও বটে। পরিবারে কারও থাকলে, অন্য জনেরও হতে পারে। জন্মানোর পরে প্রতি শিশুরই মস্তিষ্কে স্নায়ুর তারের সংখ্যা বেশি থাকে। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মগজ তার অপ্রোজনীয় তারগুলি নিজে থেকেই কেটে দেয়। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলে ‘সিন্যাপটিক প্রুনিং’। সিনেস্থেটদের ক্ষেত্রে কোনও এক অজানা কারণে এই প্রুনিং প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হয় না। ফলে স্নায়ুগুলি আজীবন জুড়েই থাকে।

ইউনিভার্সিটি অফ সাসেক্স, টেক্সাস ইউনিভার্সিটি, হাইডেলবার্গ ইউনিভর্সিটির গবেষকরা আরও একটি মতামত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, কেবল মস্তিষ্কের গঠনগত বা জিনগত কারণ নয়, সিনেস্থেসিয়ার একটি কারণ হতে পারে ‘ডিসইনহিবিশন ফিডব্যাক’। মস্তিষ্কের যে এলাকাগুলি ইন্দ্রিয়ের তথ্য সরবরাহ করে ও যেগুলি সেই তথ্য গ্রহণ করে, তাদের মধ্যে যোগাযোগের গোলমাল ঘটে। ফলে এক ইন্দ্রিয় থেকে নেওয়া তথ্য ঠিকানা ভুল করে অন্য ইন্দ্রিয়ে চলে যায়। তখনই পাঁচমিশালি অনুভূতি তৈরি হয়।

সিনেস্থেটরা ধরাবাঁধা বা চেনা ছকে চারপাশটা দেখেন না। তাঁদের দেখার ও শোনার ক্ষমতা অনেক বেশি ভিন্ন, বৈচিত্রময়। সিনেস্থেসিয়ার অনুভূতি জন্ম দেয় অনেক নতুন সৃষ্টি, সৃজনশীলতার। কবির কবিতায়, লেখকের সাহিত্যে, গায়কের সুরে তার প্রতিফলন বার বার ঘটেছে। আগামীতেও ঘটবে।

brain fog neurological problem Nerve trouble
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy