‘রামে জারিত, পাপী, জিনে-রসে পরিপূর্ণ, রামে ভেজা (মহিলা এবং) পুরুষ’! দিল্লি জিমখানার সদস্যদের নিয়ে একদা লিখেছিলেন খুশবন্ত সিংহ। তিনি নিজেও আজন্ম সদস্য ছিলেন অভিজাত এই ক্লাবের। এ বার লুটিয়েন্সের ওই ক্লাবের কর্তৃপক্ষকে জমি ছাড়ার নির্দেশ দিল কেন্দ্রীয় সরকার। আগামী ৫ জুনের মধ্যে। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত পরিকাঠামো মজবুত এবং সুরক্ষিত করার জন্য ২৭.৩ একর (প্রায় ৮৭৩ কাঠা) জমিটির প্রয়োজন।
লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কাছেই বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে দিল্লির ওই অভিজাত ক্লাব। চার পাশে রয়েছে সরকারি এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন দফতর, ভবন। আবাসন এবং নগরোন্নয়ন সংক্রান্ত মন্ত্রকের অধীনে জমি এবং উন্নয়ন দফতর (এল অ্যান্ড ডিও)-এর তরফে জিমখানা ক্লাবকে নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। সেই নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে, দেশের রাজধানীর সংবেদনশীল এবং কৌশলগত এলাকার মধ্যে ওই ক্লাবটি রয়েছে। জনগণের নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে ওই জমির প্রয়োজন রয়েছে।
নির্দেশিকাটি পাঠানো হয়েছিল ২২ মে। তাতে জানানো হয়, ২, সফদরজঙ রোডের ওই জমি আদতে ইজারা দেওয়া হয়েছিল ইম্পেরিয়াল দিল্লি জিমখানা ক্লাব লিমিটেডকে। এখন তা হয়েছে দিল্লি জিমখানা ক্লাব। সামাজিক মেলামেশা, খেলাধুলার জন্যই সেই জমি দেওয়া হয়েছিল। এখন জনস্বার্থ এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত প্রকল্পের কারণে সেই জমির প্রয়োজন হয়েছে। ইজারার চুক্তির চার নম্বর ধারা অনুসারে এখন ভারতের রাষ্ট্রপতি জমি এবং উন্নয়ন দফতরের মাধ্যমে সেই চুক্তিতে ইতি টানছেন। ২৭.৩ একর জমিতে যে ভবন, পরিকাঠামো, বাগান রয়েছে, তার সবেরই আইনি মালিকানা এ বার দফতরের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির হাতে অর্পিত হবে। আগামী ৫ জুন সেই মালিকানা গ্রহণ করবে জমি এবং উন্নয়ন দফতর। ওই দিন শান্তিপূর্ণ ভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে মালিকানা হস্তান্তর করতে বলা হয়েছে ক্লাব কর্তৃপক্ষকে। তা না হলে আইনি পদক্ষেপ করা হবে বলেও জানানো হয়েছে নির্দেশিকায়।
ব্রিটিশ আমলে তৈরি হয়েছিল এই জিমখানা ক্লাব। ১৯১১ সালে কলকাতা থেকে ভারতে নিজেদের রাজধানী দিল্লিতে সরানোর কথা ঘোষণা করেন ইংল্যান্ডের রাজা পঞ্চম জর্জ। নতুন রাজধানীতে ব্রিটিশ কর্তাদের আমোদ-প্রমোদের জন্য তাই প্রয়োজন হয়েছিল একটি ক্লাবের। ১৯১৩ সালে চালু হয় জিমখানা ক্লাব। তখন নাম ছিল ইম্পেরিয়াল দিল্লি জিমখানা ক্লাব। স্বাধীনতার পরে তার নাম হয় জিমখানা ক্লাব। ১৯৩০-এর দশকে ক্লাবের ভবনের নির্মাণ শেষ হয়। নকশা করেছিলেন ব্রিটিশ স্থপতি রবার্ট টি রাসেল। কনট প্লেসের নকশাও করেছিলেন তিনি। সেই সঙ্গে কমান্ডার ইন-চিফ’স রেসিডেন্সের নকশা তাঁর হাতেই। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সরকারি বাসভবন ছিল সেটি। জিমখানা ক্লাবের নকশায় আজও কোনও বদল ঘটানো হয়নি। সেখানে সুইমিং পুল তৈরির জন্য ১৯৩০-এর দশকে ২১ হাজার টাকা দিয়েছিলেন খোদ ভাইসরয়ের স্ত্রী লেডি উইলিংটন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় এই ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়েই সুরাপাত্রে চুমুক দিয়ে একে অন্যকে বিদায় জানিয়েছিলেন শিখ, হিন্দু, মুসলিম বাহিনীর অফিসারেরা। ৫ জুনের পরে লুটিয়েন্সের সেই ঠিকানায় আর থাকবে না ঐতিহ্যবাহী দিল্লি জিমখানা ক্লাব। থাকবেন না ‘রামে-জারিত’ সেই সদস্যেরাও!