জাতির উদ্দেশে ভাষণের নামে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিরোধীদের রাজনৈতিক আক্রমণ করে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন বলে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জমা পড়ল। সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, সিপিআই-এর সাংসদ পি সন্দোশ কুমার মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি লিখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছেন। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গেও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদর্শ আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে আধ ঘন্টার বক্তৃতায় ৫৯ বার কংগ্রেসের নাম করেছেন। বিভিন্ন রাজ্যের কংগ্রেস নেতারা কমিশনকে চিঠি পাঠিয়েছেন।
বিরোধীদের নালিশ— প্রধানমন্ত্রী দূরদর্শন, সংসদ টিভি থেকে সমস্ত সরকারি যন্ত্র কাজে লাগিয়ে শনিবার রাতে জাতির উদ্দেশে বক্তৃতা করেছেন। কিন্তু সেখানে তিনি সংবিধান সংশোধনী বিল আটকে দেওয়ার জন্য বিরোধীদের দোষারোপ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ুর বিধানসভা ভোটের জন্য নির্বাচনী আদর্শ আচরণবিধি জারি রয়েছে। এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী সরকারি ব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে বিরোধীদের রাজনৈতিক আক্রমণ করতে পারেন না। কারণ বিরোধী নেতাদের কাছে সেই সুযোগ নেই।
প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ ছিল, তাঁর সরকার ২০২৯-এর লোকসভার নির্বাচন থেকে লোকসভার আসন ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮১৬ করে তার তিন ভাগের এক ভাগ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত করতে চাইছিল। বিরোধীদের জন্য তা হয়নি। আধ ঘন্টার ভাষণের পুরো সময়টাই তিনি কংগ্রেস, তৃণমূল, সমাজবাদী পার্টি, ডিএমকে-কে মহিলা সংরক্ষণের বিরোধী বলে দোষারোপ করেন। কংগ্রেস সভাপতি খড়্গের অভিযোগ, ‘‘মোদীজি কংগ্রেসের নাম ৫৯ বার করেছেন। জাতির উদ্দেশে সরকারি ভাষণ রাজনৈতিক বক্তৃতা হয়ে গিয়েছে। নির্বাচনী আদর্শ আচরণবিধি বলবৎ রয়েছে। এটা স্পষ্ট যে প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদের আক্রমণ করতে সরকারি যন্ত্রের অপব্যবহার করেছেন। এটা দেশের গণতন্ত্র, সংবিধানেরসঙ্গে প্রতারণা।’’
নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে সিপিআই সাংসদ সন্দোশ কুমারের অভিযোগ, সরকারি খরচে চলা দূরদর্শন, সংসদ টিভি-কে কাজে লাগিয়ে প্রধানমন্ত্রী ভোটের সময় রাজনৈতিক বক্তৃতা করেছেন। বিরোধীদের সেই সুযোগ নেই। ফলে মোদী বাড়তি সুবিধা নিয়েছেন। সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক বেবিরও অভিযোগ, মোদী সরকারি খরচে রাজনৈতিক প্রচার করেছেন। জাতির উদ্দেশে ভাষণের নামে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ুর ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন।
এর আগে ২০১৯-এ লোকসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে পুলওয়ামার শহিদ জওয়ানদের নামে ভোট চাওয়ার জন্য আদর্শ আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছিল। নির্বাচন কমিশন কোনও পদক্ষেপ করেনি। তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যেই মতভেদ তৈরি হয়। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে মোদী বলেছিলেন, দেশের সম্পদকে কংগ্রেস যাঁদের অনেকগুলো সন্তান তাঁদের এবং অনুপ্রবেশকারীদের হাতে তুলে দিতে চায়। এই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের জন্যও নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু কমিশন মোদীকে নোটিস না পাঠিয়ে তৎকালীন বিজেপি সভাপতি জে পি নড্ডাকে নোটিস পাঠিয়েছিল। আইনজীবী তথা রাজ্যসভার সাংসদ কপিল সিব্বলের অভিযোগ, ‘‘জাতির উদ্দেশে ভাষণের সময় প্রধানমন্ত্রীর পিছনে জাতীয় পতাকা ছিল। কিন্তু তিনি বিজেপি নেতার মতো কথা বলছিলেন। তবে আমি জানি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বা অন্য কোনও প্রতিষ্ঠান কিছুই করবে না।’’
কংগ্রেস-সহ বিরোধীদের বক্তব্য, মোদী সরকার লোকসভার বর্তমান ৫৪৩টি আসনের মধ্যেই তিন ভাগের এক ভাগ বা ১৮১টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত করে দিক। প্রয়োজনে তার জন্য সংবিধান সংশোধনী বিল আসুক। ৫৪৩ আসনের মধ্যেই মহিলা সংরক্ষণের দাবি নিয়ে মহিলা কংগ্রেস রবিবার দিল্লিতে বিজেপি সদর দফতর অভিযানও করেছে। ডিএমকেসাংসদ পি উইলসন ইতিমধ্যেই রাজ্যসভায় এ বিষয়ে বেসরকারি বিল জমা দিয়েছেন।
বিরোধীদের বক্তব্য, মহিলা সংরক্ষণ আইন ২০২৩ সালেই পাশ হয়ে গিয়েছিল। সে সময় মোদী সরকারই ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে তা রূপায়ণ করতে চায়নি। এখন অমিত শাহ বলছেন, ৫৪৩টি আসনের মধ্যে তিনি মহিলাদের সংরক্ষণ দেবেন না। আগে লোকসভার আসন সংখ্যা ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ৫৪৩ থেকে ৮১৬ হবে। সেই বাড়তি ২৭৩টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত হবে। লোকসভায় কংগ্রেসের মুখ্য সচেতক মাণিকম টেগোর বলেন, ‘‘আমি আমার তামিলনাড়ুর বিরুদ্ধনগর আসন বোনেদের জন্য ছেড়ে দিতে রাজি আছি। মোদী-শাহ কেন নিজেদের বারাণসী, গান্ধীনগর আসন মহিলাদের জন্য ছাড়বেন না? আগে নতুন আসন তৈরি করে তার পরে মহিলাদের দেওয়ার কথা বলছেন। সামাজিক পরিবর্তন এড়িয়ে যাচ্ছেন।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)