আমেরিকা এবং ইরানের যুদ্ধবিরতি কত দিন চলে, রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে বিশ্ব। ভারতও সতর্ক হয়ে, আশাবাদ ধরে রেখে, এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির মুখাপেক্ষী। তবে কূটনৈতিক শিবিরের বক্তব্য, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাকি জমানায় কূটনৈতিক ও রণনৈতিক অস্থিরতার শিকার হয়েই চলতে হবে, মোটের উপর এমনটা ধরেই অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে শক্তি এবং বাণিজ্য নীতি সাজানোর কথা ভাবছে নয়াদিল্লি। আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা যেমন চলছে, তাতে কোনও বিরতি না এনেই অন্যান্য দরজা কিছুটা আগ্রাসী ভাবে খোলার চেষ্টা করা হবে।
পাশাপাশি এটাও মনে করা হচ্ছে, এই যুদ্ধ সম্পূর্ণ নিস্ফলা। এর ফলে আমেরিকা, ইজ়রায়েল বা ইরান কারওই কোনও স্থায়ী জয়-পরাজয় নেই। বরং ক্ষয়ক্ষতি রয়েছে বিপুল। আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভান্স নিজেই এই যুদ্ধবিরতিকে ‘ভঙ্গুর সমঝোতা’ বলে বর্ণনা করেছেন। দু’পক্ষই একই সঙ্গে নিজেদের বিজয় দাবি করছে, যা বাস্তবসম্মত নয়। ইসলামাবাদে আয়োজিত আমেরিকা-ইরান আলোচনায় কোনও স্থায়ী চুক্তি হওয়া সম্পূর্ণ অনিশ্চিত বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে কূটনৈতিক শিবিরের বক্তব্য, এই যুদ্ধ ও তার প্রভাব পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিকে নতুন ভাবে বদলে দিচ্ছে।
এটা ঘটনা যে, ইরানের উপরে হামলার নির্দেশ দেওয়ার সময়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, দু’জনেই বলেছিলেন যে, ইরানে শাসন-পরিবর্তন আসছে। কিন্তু তা বাস্তবে ঘটেনি। কূটনৈতিক শিবিরের মতে, গোড়াতেই ট্রাম্প প্রশাসনের ইরানকে বুঝতে ভুল হয়েছিল। নিকোলাস মাদুরোর নেতৃত্বাধীন ভেনেজ়ুয়েলা, সাদ্দাম হুসেনের ইরাক, মুয়াম্মর গদ্দাফির লিবিয়া আর আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের অধীনস্থ ইরান যে এক নয়, সে কথা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বোঝেননি। প্রাচীনকাল থেকেই ইরানের নিজস্ব পরিচয়চিহ্ন রয়েছে— পোক্ত জাতীয়তাবাদ, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং শিয়া ঐক্য-সহ। কারবালার সময় থেকেই শিয়াদের আত্মত্যাগ, শহিদ হওয়া পর্যন্ত কঠোর লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঐতিহ্য রয়েছে। কোনও স্বৈরাচারী শাসকের অধীনে নয়, বরং কট্টর রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় অনুশাসনে বাঁধা এই রাষ্ট্র। সে দেশের ভিতরে বর্তমান ইসলামি শাসন নিয়ে বিপুল ক্ষোভ থাকলেও, তা কখনওই বাইরের আক্রমণকে মদত করে না।
এই যুদ্ধে ইজ়রায়েলের সঙ্গে আমেরিকার লক্ষ্যেও কিছুটা পার্থক্য দেখা যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় ইজ়রায়েল সরাসরি অংশ নেয়নি। নেতানিয়াহু ইরানকে আরও বড় ক্ষতির মুখে ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই মুহূর্তে ইজ়রায়েলে নির্বাচনের বছরে, সে দেশের বিরোধী দলনেতা ইয়ার লাপিদ-সহ নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষেরা তাঁকে দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার জন্য অভিযুক্ত করতে শুরু করেছেন। দেশেও ব্যাপক ভাবে নিন্দিত হচ্ছেন তিনি। যুদ্ধবিরতির প্রস্তুতি-পর্বে চিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মনে করা হচ্ছে, ইসলামাবাদের আলোচনাতেও বেজিংয়ের একটি শক্তিশালী প্রভাব থাকবে। এতে পশ্চিম এশিয়ায় চিনের প্রভাব আরও বাড়বে এবং ট্রাম্প চিনের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে পারেন। এর কোনওটাই ভারতের পক্ষেসুখকর নয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)