Advertisement
E-Paper

পথশিশুদের মনের রং নকশা হয়ে ফুটছে পোশাকে, আনকোরা হাতেও আকার পাচ্ছে আধুনিক ফ্যাশন!

ফ্যাশন মানে শুধুই জামাকাপড়, কাট, ফিট, স্টাইল নয়। ফ্যাশনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে যাঁরা পোশাক বানান এবং যারা পোশাক পরেন তাঁদের গল্প। তাঁদের পছন্দ, বেড়ে ওঠা, প্রতিভা, প্যাশন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নৈতিক বোধ, অর্থনৈতিক দায়! সব মিলেমিশে মানুষের গল্পই উঠে আসে ফ্যাশনের হাত ধরে।

শর্মিলা বসুঠাকুর

শর্মিলা বসুঠাকুর

শেষ আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৬
আদিবাসী ছেলেমেয়েদের নিস্তেজ, নিষ্প্রভ জীবনে ঢুকে পড়ল রং।

আদিবাসী ছেলেমেয়েদের নিস্তেজ, নিষ্প্রভ জীবনে ঢুকে পড়ল রং। ছবি : মিত্রবিন্দা ঘোষ।

ফ্যাশনের কলাম লিখতে বসে মনে পড়ে যায় ফেলে আসা সেই সময়ের কথা, যখন দিল্লি, মুম্বই শহরে ফ্যাশন উইক এর ধুন্ধুমার কাণ্ড। প্রথম যে বার মুম্বইতে ফ্যাশন উইক নিয়ে লেখার জন্য গেলাম, সে আজ থেকে বেশ অনেক বছর আগে, মনে হল এ এক সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎ। পাঁচ তারা হোটেলের ঘেরাটোপে সাত তারা জীবনের হাতছানি। রঙিন, ঝলমলে, কাল্পনিক জগৎ যেন। বাস্তবের মাটিতে এর পা নেই। রামধনুর মতোই রঙিন আর অনেক দূরের। আমি যে সময়ের কথা বলছি, তা এখনকার চেয়ে অনেকটাই আলাদা ছিল। বিশেষ করে কলকাতা শহরে সেই সময়ে আজকের মতো মাল্টি ডিজ়াইনার স্টোরের রমরমা ছিল না, ছিল না ফ্যাশন শো-এর ঘনঘটা। দৈনিক সংবাদ পত্র, পত্রিকাতেও ফ্যাশন সংক্রান্ত খবরাখবর, পোশাকশিল্পীদের সাক্ষাৎকার ছিল বিরল। তাই সাধারণ মানুষের উৎসাহ আর এক্তিয়ারের কিছুটা বাইরেই ছিল ফ্যাশন সাম্রাজ্য। তখন ফ্যাশন ডিজ়াইনার এবং মডেল দুই গোত্রই সাধারণ জনজীবনের বাইরে, অনেক দূরের মানুষ। খানিকটা আগেকার ফিল্ম স্টারদের মতো। কল্পলোকের উচ্চাসনে তাঁদের অধিষ্ঠান। এই লার্জার দ্যান লাইফ ভাবনাতেই ছিল যাবতীয় আকর্ষণ, কৌতূহল, কল্পনা আর মায়াবী নেশা।

এ হেন সময়ের প্রেক্ষিতে মুম্বই শহরে সপ্তাহ জুড়ে ফ্যাশন শো দেখার অভিজ্ঞতা রূপকথার রাজ্যে ঘুরে বেড়ানোর মতোই। ফ্যাশন জগতের বাঘা বাঘা পোশাকশিল্পীদের শো দেখার জন্য সে কি উন্মাদনা! আর তাঁদের উপস্থাপনাও তেমনই শৌখীন, সম্পন্ন ও সঙ্গত। ফ্যাশন শো মানে যে শুধুই পোশাক পরে র‍্যাম্পে হাঁটা নয়, তার নেপথ্যে যে থাকে অনেক পরিশ্রম, মুন্সিয়ানা, মেধা ও মনন তা বুঝতে শিখেছিলাম ডিজাইনার সব্যসাচী, মনীশ অরোরা, রোহিত বাল, মনীশ মলহোত্র, তরুণ তাহিলিয়ানির শো দেখে। সব্যসাচীর পেলব, কোমল নান্দনিক বোধ, আলোর যাদু, মনীশ অরোরার নাটকীয়তা, রোহিত বালের আড়ম্বর, তরুণ তাহিলিয়ানির গ্ল্যামার তাঁদের উপস্থাপনাকে একটা বিশেষ পর্যায়ে নিয়ে যেত। কোরিওগ্রাফি, মিউজিক, আলো, বিষয় ভাবনা, এমন সব নানা উপাদানে গড়ে উঠত একটা শো। পোশাক পরিকল্পনার সঙ্গে হাত মেলাত উপস্থাপনার উদ্ভাবনী চিন্তা। ফ্যাশন শো পরিণত হত পারফর্মিং আর্টে। প্রতিটি শো মনে হত দরদী মনের প্রকাশের ব্যাকুলতা। কেবলই মনে হত দু চোখ ভরে দেখে নিই, যতটা পারি শিখে নিই।

আর একটা বিষয়ও লক্ষ্য করতাম সেই সময়ে হোটেলের লবিতে বসে বসে। অডিটোরিয়ামের র‍্যাম্পের শো যতটা আকর্ষণীয়, ততটাই মনকাড়া হলের বাইরের বাতাবরণ। কত মানুষ, কত ধরন, কত রকম সাজপোশাক! দর্শক, ক্রেতা, ফটোগ্রাফার, সাংবাদিক, আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথিবর্গ আর অবশ্যই বলিউডের তারকারা। হরেক রকম মানুষের ভিড়। তাদের চলন, বলন, কেতা, কায়দা, পোশাক সবই ভিন্ন মানের, ভিন্ন মাপের। আসলে ফ্যাশন তো মানুষকে ঘিরেই। মানুষের মনকে ঘিরেই। মানুষকে আশ্রয় করেই তো পরিধানের গল্প গড়ে ওঠে। মানুষই তার আধার। এই আধারকে আঁকড়ে যে যত নিটোল গল্প গড়ে তুলতে পারবে তার তত নাম, ডাক, ব্যবসা, সাফল্য, মুন্সিয়ানা। মানুষের মনের সঙ্গে মিতালি গড়তে যে যত পটু, সে তত সফল ডিজাইনার। ফ্যাশন উইকে বহু বছরের যাতায়াত এই শিক্ষাই দিয়েছে আমাকে।

ফ্যাশন মানে তাই শুধুই জামাকাপড়, কাট, ফিট, স্টাইল নয়। ফ্যাশনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে যাঁরা পোশাক বানান এবং যাঁরা পোশাক পরেন তাঁদের গল্প। তাঁদের পছন্দ, বেড়ে ওঠা, প্রতিভা, প্যাশন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নৈতিক বোধ, অর্থনৈতিক দায়! সব মিলেমিশে মানুষের গল্পই উঠে আসে ফ্যাশনের হাত ধরে।

মনের ভিতরে আলিবাবার গুহায় ঘুমিয়ে থাকা রঙিন জগৎ যেন নড়েচড়ে উঠল!

মনের ভিতরে আলিবাবার গুহায় ঘুমিয়ে থাকা রঙিন জগৎ যেন নড়েচড়ে উঠল! ছবি : মিত্রবিন্দা ঘোষ।

এতক্ষণ যে গল্প বলছিলাম, এ বারে তার থেকে কিছুটা সরে এসে শোনাই আর এক গল্প। মানুষেরই গল্প। পথশিশুদের গল্প। মিত্রবিন্দা ঘোষের যাত্রা শুরু হয়েছিল দুটি শিশু নিয়ে। প্রথমে তাদের খাওয়াদাওয়ার ভার, তারপর তাদের লেখাপড়ার দায়িত্ব। ফুটের ধারেই চলত তার এই কার্যকলাপ। ধীরে ধীরে শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকল, ‘‘রামধনু’’ তার সাত রঙ ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্কল্পে ব্রতী হল। জন্ম নিল ‘‘রামধনু বাড়ি’’। না, মিত্রবিন্দার এই প্রকল্প একদিনের আবু হোসেনীর গল্প নয়। একদিনের সমাজসেবা করে সারা বছরের মতো প্রাণ জুড়িয়ে গেল, বিবেক শীতল হল, তারপর উৎসাহ উবে গেল। এমন ভাবনায় রামধনু বিশ্বাসী নয়।

বাচ্ছাদের স্কুলে ভর্তি করানো, পাশ করাটাই তো শেষ কথা নয়। তাদের আশ্রয়, নিয়মিত রোজগার, নিশ্চিন্ত জীবনের পথ দেখানোই তো সবচেয়ে জরুরি। স্বাবলম্বী করে তোলাটাই বড় কথা। তারও আগে জরুরি হল এই শিশু ভোলানাথদের মনের কথা পড়ে ফেলা। কিসে তাদের আগ্রহ, কি করলে তাদের মনটা ঝলমলিয়ে ওঠে, কিসে তারা মন-প্রাণ এক করে কাজে নেমে পড়ে, একবার তার সন্ধান করতে পারলে, সিঁড়ি ভাঙা অঙ্কেও আর ততটা মুখ ব্যাজার হবে না এই শিশুদের। সেই সন্ধান করতে গিয়েই কলকাতা ছাড়িয়ে বীরভূমের লাল মাটির গ্রামে আদিবাসী ছেলেমেয়েদের নিস্তেজ, নিষ্প্রভ জীবনে ঢুকে পড়ল রঙ, তুলি, সূচ, সুতো, কাঁচি, কাপড়, চট, পাট।

খুশি ভরা তাদের সাতরঙা জীবনে, তাদের অজান্তেই তৈরি হল  ফ্যাশনের বুনিয়াদ।

খুশি ভরা তাদের সাতরঙা জীবনে, তাদের অজান্তেই তৈরি হল ফ্যাশনের বুনিয়াদ। ছবি : মিত্রবিন্দা ঘোষ।

এইসব বাচ্চাদের মধ্যেই আলিবাবার গুহায় ঘুমিয়ে থাকা রঙিন জগৎ যেন নড়েচড়ে উঠল। চিচিং ফাঁকের মতো তাদের সামনে খুলে গেল এক নতুন দেশের ঠিকানা। সে দেশে ছেলেপুলেরা ছবি আঁকে, কাপড় কাটে, ফোঁড় তুলে ফুল লতা পাতায় ভরাট করে জামার পকেট, ব্যাগের হাতলে ঝুলিয়ে দেয় পছন্দের পুতুল। কেউ আবার উলের বুননে বানিয়ে ফেলে আস্ত এক মাফলার, যা শীতের দুপুরে শহুরে কন্যার গলায় স্টাইল স্টেটমেন্ট হয়ে শোভা পায়।

এই নতুন দেশে বাচ্চারা খুব মজা পেল। সাত-রাজার-ধন মানিকের আশা তো তাদের ছিল না, কেবল একটু স্বস্তি আর খুশির জীবন খুঁজে বেড়াত তারা। তাই নতুন স্বাদের জীবনে বেজায় আনন্দ তাদের। রাজা, রানি, বাদশার মতো তাদের হাব ভাব। আর কি চাই! হাতে কলমে কাজ শেখা আর তার ফলে গড়ে ওঠা আত্মবিশ্বাস, যে কোনও কাজের সেরা মূলধন। সোনা ঝরা, খুশি ভরা তাদের এই সাতরঙা জীবনে, অজান্তেই তৈরি হল ফ্যাশনের বনিয়াদ। তৈরি হল বৃহত্তর পৃথিবীর সঙ্গে এক নতুন সম্পর্ক। এ বড় কম কথা নয়!

নতুন স্বাদের জীবনে বেজায় আনন্দ তাদের।

নতুন স্বাদের জীবনে বেজায় আনন্দ তাদের। ছবি : মিত্রবিন্দা ঘোষ।

কাটিং, এম্ব্রয়ডারি, প্যাচওয়ার্ক, ক্রোশের কাজ ও আরও বিভিন্ন হাতের কাজে আজ তারা পারদর্শী। তাদের বানানো টপ, টি-শার্ট, জ্যাকেট, ড্রেস, মাফলার, ব্যাগ হইহই করে মানুষ কিনছে, আদর করে পরছে। তাদের এক আকাশ দৃষ্টিতে আজ রামধনুর সাত রঙের ঝিলিমিলি। রঙিন মন।

ফ্যাশন সেই মনের কারবারি।

Street Children homeless kid Fashion
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy