• সুজাতা মুখোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

করোনাভাইরাস: প্রশ্নোত্তরে কী জানি কী জানি না

coronavirus
এই অতিমারির সূত্রপাত হয় চিনের উহানে। ছবি: এএফপি।

সম্প্রতি ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ প্রকাশিত নিবন্ধের ভিত্তিতে করোনাভাইরাস সম্পর্কিত কিছু প্রশ্নোত্তর পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হল।

 

কী করে এই ভাইরাস অতিমারি ঘটালো?

সার্স-কোভ-২ ভাইরাস নিরীহ জ্বর-সর্দি-কাশি সৃষ্টিকারী করোনা পরিবার থেকে এলেও তাকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা নেই আমাদের৷ কারণ, সে এসেছে অন্য প্রজাতি থেকে৷ পশুপাখির মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে আমাদের অবিমৃশ্যকারিতার হাত ধরে সে এসে হাজির হয়েছে আমাদের দুয়ারে৷ এইচআইভি, সার্স, ইবোলা— সবার ক্ষেত্রেই ঘটেছিল একই ব্যাপার৷ বিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন৷ কিন্তু মানুষ সে কথা শুনলে তো!

এই ভাইরাসের সঙ্গে বাদুর ও প্যাঙ্গোলিনের শরীরে থাকা করোনাভাইরাসের ব্যাপক মিল। সম্ভবত তাদের শরীরের ভাইরাসরাই মিলেমিশে এর জন্ম দিয়েছে৷ হয়তো এই মিলমিশ হয়েছে বাদুরের শরীরে, নয়তো প্যাঙ্গোলিনের শরীরে, নয়তো বা অন্য কোনও শরীরে, যা এখনও সঠিক ভাবে জানা নেই৷

এই অতিমারির সূত্রপাত হয় চিনের উহানে, আমরা সবাই জানি, ২০১৯-এর ডিসেম্বরে৷ বিভিন্ন গবেষণার পর বিজ্ঞানীদের সন্দেহ দৃঢ় হয় যে লাগোয়া সি-ফুড হোলসেল মার্কেট, যেখানে জ্যান্ত সাপ-ব্যাঙ, জানা-অজানা পশুপাখি বিক্রি হয় অকাতরে, তার সঙ্গে এই রোগের জীবাণুর সম্পর্ক আছে৷

আরও পড়ুন: করোনা: কী খাবেন, আর কী খাবেন না

সংক্রামিত মানুষ কখন অন্যের মধ্যে রোগ ছড়ান?

উপসর্গ শুরু হওয়ার আগে থেকেই তিনি রোগ ছড়াতে পারেন৷ ছড়াতে পারেন রোগ সেরে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর পর্যন্ত৷

 

কতটা ছোঁয়াচে?

সাধারণ ভাবে এক জন হামে আক্রান্ত মানুষ ১২-১৮ জনকে সংক্রামিত করেন৷ এক জন পোলিও, গুটিবসন্ত বা রুবেলার রোগী ৬ জন সুস্থ মানুষের মধ্যে রোগ ছড়াতে পারেন৷ সেখানে কোভিড-১৯ রোগীরা মোটামুটি তিন জনকে সংক্রামিত করেন৷

আরও পড়ুন: লকডাউনেও যেতে হচ্ছে বাজার, কী ভাবে আটকাবেন সংক্রমণ?

কী করে রোগ ছড়ায়?

করোনাভাইরাস সংক্রমণ হলে মানুষটি হাঁচলে, কাশলে বা কথা বললে যে সামান্য শ্লেষ্মা বা থুতুর কণা বা ড্রপলেট বেরয় তা অন্য কেউ শ্বাসের মধ্যে দিয়ে টেনে নিলে তার মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে৷ ধরুন, ধারেকাছে কেউ নেই, কিন্তু টেবিল, ডেস্ক ইত্যাদি আছে, ড্রপলেট সেখানে পড়ে। পড়ে ভাইরাস। সে কিছু ক্ষণ জীবিতও থাকে৷ সেই সময় সেখানে হাত দিলে, হাতে ভাইরাস লেগে যায়৷ সেই হাত এ বার নাকে-মুখে-চোখে লাগালে সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

 

খাবারের মাধ্যমে কি ছড়ায়?

এখনও তার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি৷

 

এই ভাইরাস কতটা মারাত্মক?

নেচার মেডিসিন নামের বিজ্ঞান পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, গত ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উহানে যত মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে মারা গিয়েছিলেন ১.৪ শতাংশ মানুষ৷ সংখ্যাটা অনেককে বিস্মিত করেছে৷ কারণ সবারই ধারণা ছিল, আসল সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হওয়ার কথা৷ তবে মৃত্যুর হিসাব কী ভাবে করা হয়েছে তার উপর নির্ভর করে সংখ্যাটা কম হবে না বেশি৷ যদি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মানুষদের মধ্যে কত জন মারা গিয়েছেন তার হিসাব হয়, যে সংখ্যা হবে, আর সংক্রামিত মানুষের মধ্যে কত জন মারা গিয়েছেন, তার হিসাব হয়, দুটো তো আলাদা হবেই৷

 

কোভিড ১৯-এর রোগীরা কী ভাবে মারা যান?

বেশির ভাগ মানুষ কিছু দিনের মধ্যেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যান৷ কিছু মানুষের নিউমোনিয়া হয়৷ ওষুধপত্র, কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র ইত্যাদির সাহায্যে তাঁদের অনেকেই সুস্থ হন৷ কিন্তু কারও যদি এআরডিএস বা অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম হয়, সারা শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে সেপটিক শক দেখা দেয়, শরীরের গুরুত্বপূর্ণ সব প্রত্যঙ্গ একে একে কাজ করা বন্ধ হয়ে দেখা দেয় মাল্টি অরগ্যান ফেলিওর, তাঁকে আর বাঁচানো যায় না৷

 

কাদের বিপদের আশঙ্কা বেশি?

বয়স্কদের৷ কিন্তু ইউএস সেন্টার ফর ডিজিজ কনট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের মত অনুযায়ী, আক্রান্ত মানুষদের মধ্যে অন্তত ২০ শতাংশ মানুষ ২০-৪৪ বছর বয়সের মধ্যে হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা এত অসুস্থ হন যে তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়৷ তাঁদের মধ্যে ২-৪ শতাংশকে ভর্তি করতে হয় ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে৷

 

এই ভাইরাস কি ঘন ঘন নিজেকে পাল্টায়?

হ্যাঁ৷ কারণ এই ভাইরাস হল আরএনএ ভাইরাস৷ অর্থাৎ, এর জিন গঠিত হয় আরএনএ দিয়ে৷ তবে মানুষ বা ব্যাক্টেরিয়ার জিন যেমন ডিএনএ দিয়ে গঠিত হয়, তেমন নয়৷ আরএনএ ভাইরাসের ধর্ম হল ঘন ঘন পাল্টে যাওয়া৷ এই পাল্টে যাওয়াই তাদের বাঁচার হাতিয়ার৷ যার শরীরকে আঁকড়ে ধরেছে সে, তার প্রতিরোধ ক্ষমতা যাতে তাকে চিনে মেরে ফেলার রাস্তা বের করে ফেলতে না পারে, সে জন্যই এত সব কাণ্ডকারখানা করে সে৷

 

এই ভাইরাস কত ক্ষণ থাকতে পারে আশপাশে?

সেটাই তো চিন্তার বিষয়৷ আক্রান্ত মানুষের ড্রপলেটের মাধ্যমে এক বার পরিবেশে আসার পর, বাতাসে বা কোনও কিছুর উপরে, কোথায় পড়েছে তার উপর নির্ভর করে কয়েক মিনিট, কয়েক ঘণ্টা থেকে শুরু করে কয়েক দিন পর্যন্ত সে থেকে যেতে পারে৷ তাকে ছুঁয়ে নাক-চোখ-মুখে হাত দিলে বা শ্বাসের সঙ্গে তাকে টেনে নিলে রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে৷ স্টাডি থেকে জানা গিয়েছে, বাতাসে সে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত থেকে যেতে পারে, তামার উপর ঘণ্টা চারেক, কার্ডবোর্ডে প্রায় গোটা দিন, প্লাস্টিক ও স্টেনলেস স্টিলে ২-৩ দিন পর্যন্ত হতে পারে তার আয়ুষ্কাল৷

 

খাওয়ার জল, সুইমিং পুল বা গরম টাবের মাধ্যমে কি ছড়ায়?

খাওয়ার জলে ভাইরাসের উপস্থিতি দেখা যায়নি৷ ভাল সুইমিং পুল থেকেও সে ছড়ায় না বলেই জানা গিয়েছে৷

 

সাধারণ সাবান জলে পরিষ্কার করলে কি করোনা দূর হবে?

ব্লিচ মেশানো ডিটারজেন্ট ব্যবহার করুন৷

 

অতিমারি দূর হবে কী ভাবে? কোভিড-১৯ সারানোর ও ঠেকানোর রাস্তা কী?

গ্লোবান সায়েন্টিফিক কমিউনিটি তিনটি প্রাথমিক পথের কথা বলেছেন৷

·        প্রথম হল ওষুধ৷ করোনাভাইরাসের বিভিন্ন এনজাইম বেরনোর রাস্তা বন্ধ করে ভাইরাসকে অকার্যকর করে দিতে পারে৷ যেমন, রেমডিসিভির৷ এ এমন এক এনজাইমের গতি রুদ্ধ করে যার সাহায্য ছাড়া ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি অসম্ভব৷ অথবা যে প্রোটিনের কাঁটার সাহায্যে মানবকোষে ঢোকে ভাইরাস, তাকেই অকেজো করে দেয় কিছু ওষুধ৷

·        এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর যাঁরা সেরে গিয়েছেন, তাঁদের রক্তে এই ভাইরাসকে অকেজো করার উপাদান, অ্যান্টিবডি থাকে প্রচুর পরিমাণে৷ এই অ্যান্টিবডি বিভিন্ন ভাবে প্রসেস করে অসুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করালে, ভাইরাসের বিরুদ্ধে জোরদার প্রতিরোধ গড়ে ওঠে অসুস্থ মানুষের মধ্যে৷

·        তৃতীয় রাস্তা ভ্যাকসিন৷ এ ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় ভাইরাসের কিছু অংশ বা পুরো ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করানো হয়, যাতে শরীরের প্রতিরোধী ব্যবস্থা একে চিনে রাখে ও ভবিষ্যতে এই ভাইরাস শরীরে ঢুকলে তার সঙ্গে সমানে সমানে লড়ে যেতে পারে৷ ভ্যাকসিনের ক্লিনিকাল ট্রায়াল কিন্তু শুরু হয়ে গিয়েছে৷

 

আপাতত যে সমস্ত ওষুধ আছে তা দিয়ে কি চিকিৎসা সম্ভব?

নিশ্চয়ই সম্ভব৷ এ ব্যাপারে ব্যাপক তল্লাসি চালিয়েছে একত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা ও ২২টি গবেষণাগার, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়াতে৷ তাতে জানা গিয়েছে নানান তথ্য৷ যেমন—

·        ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রক্সিক্লোরাকুইন বা ক্লোরোকুইনের সঙ্গে ভাইরাস মারার ওষুধ, যেমন, রেমডেসিভির, ফ্যাভিলাভির বা রিবাভেরিন দিলে আরএনএ ভাইরাস মারা সম্ভব, এর মধ্যে করোনাভাইরাসও আছে৷

·        চিনে ন্যাশনাল মেডিক্যাল প্রডাক্টস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ফ্যাভিলাভিরকে স্বীকৃতি দিয়েছে৷ এবং ৩০টি এই জাতীয় ওষুধকে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে তারাও একই ভাবে কার্যকর হতে পারে কি না৷

·        অত্যাধুনিক কম্পিউটার হার্ডওয়্যারকে কাজে লাগানো হয়েছে আট হাজারটি ওষুধের উপাদানের মধ্যে কোন কোনটি ভাইরাসের প্রোটিনের কাঁটাকে অকার্যকর করতে পারে তা খোঁজার জন্য৷ এ কাজে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছেন বিজ্ঞানীরা৷ মাত্র দু’দিনের মধ্যে আট হাজারের মধ্যে মাত্র ৭৭টিকে শর্টলিস্ট করে ফেলা গিয়েছে৷

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন