Advertisement
E-Paper

বাংলার মেয়ে তাঁরাও! বাংলা কি আপন তাঁদের? কলকাতায় এসে প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন কিরণ-ঝুম্পার

সম্প্রতি কলকাতায় দেখা গিয়েছে বাঙালি বংশোদ্ভূত দুই লেখিকা কিরণ দেসাই ও ঝুম্পা লাহিড়ীকে। আনন্দবাজার ডট কমের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় কী বললেন তাঁরা?

সুচন্দ্রা ঘটক

শেষ আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:২৬
(বাঁ দিকে) কিরণ দেসাই  ও ঝুম্পা লাহিড়ী (ডান দিকে) কলকাতায়।

(বাঁ দিকে) কিরণ দেসাই ও ঝুম্পা লাহিড়ী (ডান দিকে) কলকাতায়। — নিজস্ব চিত্র।

বাড়ি না হলেও, বাংলা তাঁদের ঘর তো বটেই!

সে কথা অনেকেই জানেন না। নিজেরা আবার খেয়ালই করেন না যে, দুনিয়া কাঁপানো আর এক পরিচিত লেখিকাও নামের দিক দিয়ে বাঙালি। এখন আলোচনায় তাঁর লেখা নিজের মায়ের কাহিনি।

বলা ভাল, লেখিকার নাম মনে রাখেন। তিনি যে আলোড়ন ফেলেছেন মায়ের গল্প বলে, তা-ও মনে রাখেন। কিন্তু সেই তিনি যে বাঙালি বংশোদ্ভূতও বটে, তা আলাদা ভাবে খেয়াল রাখেন না। তার প্রয়োজনও পড়েনি আগে। কারণ, বাঙালি বংশোদ্ভূত এই তিন লেখিকার কেউ যে বাংলায় লেখেন না, বাংলার মাটিতে বসবাসও নয় তাঁদের। এবং সাহিত্যের মধ্যে ভাষার সীমানা টানতেও বিশেষ উৎসাহী নন। তবু এই তিন কন্যা কোনও না কোনও সূত্রে বাঙালি। যদিও পাঠক তাঁদের বিশ্বজোড়া।

Advertisement

আপামর দুনিয়া চেনে তাঁদের শক্তিশালী কলমের জোরে। আর তাই কলকাতায় সাংবাদিকের সঙ্গে লেখালিখি নিয়ে আলোচনায় বসে ২০০৬ সালের বুকারজয়ী এবং এ বছরের বুকার মনোনীত কিরণ দেসাই বলেন, ‘‘ও হো! অরুন্ধতী রায়ের নাম তো বাঙালি, খেয়ালই ছিল না দেখুন!’’ তাঁর কাছে ভাষার গণ্ডিকে মুছে দিয়েছে তাঁর কাজ।

অরুন্ধতী যেমন ‘মাদার মেরি কামস্‌ টু মি’ লিখেছেন নিজের মায়ের কথা বলতে, কিরণেরও কি কখনও নিজের মাকে নিয়ে লেখার ইচ্ছা হয়েছে?

অরুন্ধতী রায়ের ‘মাদার মেরি কামস্‌ টু মি’।

অরুন্ধতী রায়ের ‘মাদার মেরি কামস্‌ টু মি’। ছবি: সংগৃহীত

নিজের জীবনে সাহিত্যিক মা অনীতা দেসাইয়ের প্রভাবের কথা কি পাঠকদের জন্য লিপিবদ্ধ করতে চান না তিনি? কিরণ আবার মায়ের সন্তান হওয়ার সূত্রে বাঙালি। বিয়ের আগে মা অনীতার পদবি ছিল মজুমদার। কিরণ মায়ের গল্প লেখার পথে হাঁটছেন না। তিনি বলেন, ‘‘মা তো নিজেই লেখিকা। আমি আর তাঁকে নিয়ে কী লিখব! নিজের কথা নিজেই আরও লিখবেন ভেবেছেন। হয়তো একটা স্মৃতিকথা লিখবেন।’’ তবে মায়ের কাছে শোনা দাদুর দেশ, পূর্ব বাংলার কথা লিখেছেন তিনি। সে-ও তো মায়ের কথাই লেখা, মনে করিয়ে দেন কিরণ। সঙ্গে তা আবার কিরণের বাংলা-যোগের কথাও বটে। তিনি বলেন, ‘‘মায়ের কাছে রবীন্দ্রনাথ পড়া শিখেছি। বিভূতিভূষণের লেখা ‘পথের পাঁচালী’ খুব প্রিয় আমার। সে সব যখন আমার লেখায় ছাপ রেখে যায়, তখন আমি মায়ের কথাই বলি।’’

মা অনীতা দেসাইয়ের (ডান দিকে) সঙ্গে কিরণ দেসাই (বাঁ দিকে)।

মা অনীতা দেসাইয়ের (ডান দিকে) সঙ্গে কিরণ দেসাই (বাঁ দিকে)। ছবি: সংগৃহীত

একই সময়ে আর এক বাঙালিনী কলকাতায় এসে জানিয়েই দিয়েছেন, তাঁর নিজস্ব কোনও ভাষা নেই। ভাষার গণ্ডি ছাপিয়ে ভাবনার জগৎকে উজ্জীবিত রাখছেন ইংরেজি ও ইটালীয় ভাষায় লেখায় মগ্ন থাকা বাঙালি পিতা-মাতার পুলিৎজ়ার সম্মান পাওয়া লেখিকা-কন্যা ঝুম্পা লাহিড়ী। ফলে মায়ের ভাষা, তাঁর ভাষা— সবই মিশে আছে গোটা বিশ্বের ভাষার সঙ্গে। সবই তাঁর আপন। আর সে আপন জগৎ নিয়ে লেখা সাহিত্যে নানা ভাবে মিশে আছেন তাঁর মা-ও।

সে অর্থে সরাসরি মাকে নিয়ে কিছু লেখার ভাবনা এখন নেই ঝুম্পার। তবে তিনি বলেন, ‘‘আমার ‘নেমসেক’ উপন্যাসের যে প্রধান নারী চরিত্র অসীমা, তিনি তো আসলে আমার মা-ই। মায়ের জীবনের কত অভিজ্ঞতা যে সে চরিত্রের মাধ্যমে উঠে এসেছে। বহু ক্ষেত্রেই আমার গল্পে যে সমস্ত মায়ের চরিত্র আসে, তার মধ্যে কোনও না কোনও ভাবে আমার মায়ের কথা থাকে। ‘ইন্টারপ্রেটর্স অফ ম্যালাডিজ়’-এও ছিল। এ ছাড়া, নন-ফিকশনও লিখেছি মাকে নিয়ে।’’

ঝুম্পা লাহিড়ীর উপন্যাস ‘নেমসেক’ নিয়ে তৈরি ছবিতে অসীমার ভূমিকায় তব্বু।

ঝুম্পা লাহিড়ীর উপন্যাস ‘নেমসেক’ নিয়ে তৈরি ছবিতে অসীমার ভূমিকায় তব্বু। ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি কলকাতায় এসে আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় বসে আরও নানা কথা মনে পড়তে থাকে ঝুম্পার। তিনি বলেন, ‘‘আমি দু’-একটি প্রবন্ধও লিখেছি মাকে নিয়ে। তবে অরুন্ধতীর মতো অত বড়সড় একটি বই লেখার পরিকল্পনা আপাতত নেই।’’ বরং আরও নতুন কোনও দিগন্ত খুলতে চলেছে তাঁর আগামী কাজের মাধ্যমে, তেমনই ইঙ্গিত দেন লেখিকা।

ঝুম্পা এর আগে নানা কথায় বুঝিয়েছেন, নিজের লেখক-জীবনের দু’টি চক্র শেষ করে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন আরও নতুন এক অভিজ্ঞতা তৈরির দিকে। প্রথম ধাপ ছিল প্রবাসে ভারতীয়, বিশেষত বাঙালিদের জীবন নিয়ে। তার পর হল ইটালীয় ভাষায় লেখা। গদ্য তো রইলই, সঙ্গে পদ্যও জুড়ল। মনে করিয়ে দিলেন, বারো বছর আগে যখন শেষ বার কলকাতায় কাজের কথা বলেছেন মঞ্চে উঠে, সে সময়টা ছিল তাঁর লেখিকা-জীবনের প্রথম ধাপের শেষ অধ্যায়। তার পর শুরু হয় ইটালীয় জীবনের চক্র। এ বার সেই অধ্যায়ও শেষের দিকে, শীতের কলকাতায় মুখোমুখি আড্ডায় জানালেন ঝুম্পা।

তবে কি সম্পূর্ণ ইটালীয় এখন তিনি?

উত্তর দেওয়ার ভঙ্গি আলাদা। ঝুম্পা যে কোনও গণ্ডিতেই বাঁধতে চান না নিজেকে! প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে সাংবাদিকের শাড়ির তারিফ করেন। লেখিকা বলেন, ‘‘মাঝেমাঝে শাড়িও পরি।’’ বোঝাতে চাইলেন কি, তিনি আসলে বাঙালিও?

এত বছরের যাতায়াত, বসবাসে কতটা ইটালীয় হয়ে উঠেছেন তিনি? পাস্তা রান্না করলে তা কি কোনও বিশেষ ধরনের হয়ে ওঠে?

লেখিকার মনে হয়, ইটালিতে থাকা মানেই ভাল পাস্তা বানানো নয়, যেমন ভাল পাস্তা বানানো মানেই ইটালীয় হয়ে যাওয়া নয়। ঝুম্পা বলেন, ‘‘ভাল পাস্তা বানানো শিখতে হলে কি আর ইটালিতে থাকতে হয়? দুনিয়ার যে কোনও প্রান্তেই বসে পাস্তা বানানো শেখা যায়।’’ তবে তিনি আমেরিকা ছেড়ে ইটালিতে গিয়ে জীবনধারায় বেশ কিছু বদল এনেছেন। তিনি বলেন, ‘‘এখন বহু বন্ধু ইটালির। ফলে তাঁদের সঙ্গে গল্প-আড্ডার মাধ্যমে ইউরোপের বহু অভ্যাস ঢুকে গিয়েছে আমার রোজনামচাতেও। তা কখনও কখনও লেখাতেও প্রকাশ পায়।’’

ইটালির পর্ব এ বার এক অর্থে পূর্ণ হয়েছে, তাই তো? পরবর্তী পর্ব কি তবে বাংলায় লেখা? সে ভাষা নিয়েই তো বড় হয়েছেন তিনি। মায়ের কাছে বহু বাংলা বই ছিল। তিনিও পড়ে শুনিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও মাতৃভাষায় লেখার কথা ভাবছেন না ‘দ্য লোল্যান্ড’-এর ঔপন্যাসিক। ঝুম্পা বলেন, ‘‘আমি বাংলা সাহিত্য নিয়ে অল্প কাজ করেছি। আশাপূর্ণা দেবীর ছ’টি গল্প অনুবাদ করেছি আমি। তবে বাংলা ভাষাটি আমি যথেষ্ট জানি না। বাংলায় লেখার জন্য সে ভাষা ও সংস্কৃতিকে ঠিক যতখানি জানা উচিত, ততটা দক্ষতা আমার নেই। ইটালীয়তে যখন লিখতে শুরু করেছি, তার অনেক আগে থেকে ইটালীয় ভাষা আমি শিখেছি। এমনকি, ইংরেজিতে যে কাজ পারিনি, সে কাজও ইটালীয়তে পেরেছি। পদ্য লিখেছি।’’ কোনও একটি ভাষায় লেখা মানে সেটি নিয়ে অনেকটা পথ চলতে হয় বলে মনে করেন ঝুম্পা। বাংলার ক্ষেত্রে ততটাও করা হয়নি বলে জানান তিনি।

আর এক বাঙালি মায়ের কন্যা কিরণও সে কথা বলেন। বাংলা সাহিত্য যে খুব পড়েছেন, এমন বলতে চান না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখার সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল ছোটবেলাতেই, মায়ের হাত ধরে। তিনি একটু একটু করে পড়ে শুনিয়েছেন। ‘টেগোর’ বুঝতে শিখেছেন সেখান থেকে। ‘‘তবে আমি বাংলা পড়তে পারি না। ভাল করে বলতেও পারি না। অনেক জায়গায় থাকার ফলে কলকাতার আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গেও ইংরেজিতেই কথা হয়,’’ বলেন ‘দি ইনহেরিটেন্স অফ লস’-এর লেখিকা। কিন্তু কলকাতায় আসতে এখনও ভালবাসেন কিরণ। সাত বছর পরে কলকাতায় এসে তাই ‘কলকাতা লিটেরারি মিট’-এর কাজের বাইরে দুটো দিন হাতে রাখেন শুধু পরিবারের সকলের সঙ্গে কাটাবেন বলে।

বাঙালি হওয়া মানে কী, সে আলোচনায় খুব একটা নেই তাঁরা। কথায় কথায় দুই বাংলা মায়ের কন্যা বুঝিয়ে দেন, সাহিত্যের জগতে ভাগাভাগি যত কম থাকে, ততই শ্রেয়। তবে আগামী দিনে বাংলায় লেখা না হোক, বাংলা ও কলকাতা যে আবার ঢুকে পড়বে না তাঁদের কাজে, এমন কিন্তু একেবারেই ভাবছেন না কিরণ কিংবা ঝুম্পা। বরং সবই তাঁদের বড় হওয়ার সঙ্গে জুড়ে আছে। তার প্রকাশ তো নানা ভাবে ঘটবেই নিজেদের কাজে, এমনই মনে করেন দুই লেখিকা।

Jhumpa Lahiri Kiran Desai
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy