প্রশ্ন: আগে ভাবা হত, ডায়াবিটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগ শুধু অবস্থাপন্নদেরই হয়। নিম্নবিত্তেরা এর থেকে মুক্ত। কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে তাঁদের মধ্যেও এই সব রোগের প্রকোপ বাড়ছে। এমনকি, স্থূলতাও। এটা কেন?

উত্তর: নিম্নবিত্তের মধ্যে এই ধরনের রোগ যে বাড়ছে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এর সঙ্গে যে বিষয়টির সরাসরি যোগ রয়েছে, তা হল খাদ্যাভ্যাস। সস্তায় পেট ভরাতে গিয়ে অস্বাস্থ্যকর খাবার বা চলতি কথায় জাঙ্ক ফুডের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছি আমরা। যা যা খেলে শরীরের ক্ষতি হয়, মেদ বাড়ে, পুষ্টির অভাব থেকে যায়, সেটাই খাচ্ছি আমরা। এক শ্রেণির মানুষ এখন অনেকটাই সচেতন হয়েছেন। কিন্তু, সস্তা এবং সহজলভ্য বলে খেটে খাওয়া মানুষেরা জাঙ্ক ফুডের উপরে অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। বিজ্ঞাপন দেখেও তাঁরা প্রলুব্ধ হচ্ছেন। আমেরিকায় দেখা যাচ্ছে, নিম্নবিত্তদের মধ্যে স্থূলতা এবং ডায়াবিটিসের প্রকোপ অবস্থাপন্নদের তুলনায় বেশি। তার কারণ, স্বাস্থ্যকর খাবারের দামও সেখানে বেশি। 

 

প্রশ্ন: জাঙ্ক ফুড ছাড়া আর কী কী কারণ আছে ডায়াবিটিসের?

উত্তর: সব চেয়ে চিন্তার বিষয় হল, মানুষের ‘এনার্জি এক্সপেন্ডিচার’ বা কায়িক শ্রমের পরিমাণ কমে যাচ্ছে দিন দিন। ভেবে  দেখুন, আদিম যুগে খাবার জোগাড় করতে মানুষকে কী পরিমাণ পরিশ্রম করতে হত। সে যখন চাষাবাদ শেখেনি, তখন ফলমূল পাড়তে হলেও তাকে গাছে চড়তে হত। শিকার করে খেতে হলে বন্য জন্তুকে তাড়া করতে হত। কিন্তু উন্নতি ও বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার পরিশ্রমের পরিমাণ কমতে লাগল। যানবাহন আবিষ্কারের পরে তার হাঁটাচলার প্রয়োজনও কমে গেল। এর পরে সুষম স্বাস্থ্যের কফিনে শেষ পেরেকটি সম্ভবত পুঁতে দিল রেফ্রিজারেশন। মানুষ খাবার জমিয়ে রাখতে শিখল। যার ফলে তার কাছে সাত দিন ২৪ ঘণ্টাই খাবার হাজির। আদিম যুগে কায়িক শ্রম করতে হত অনেক বেশি। কিন্তু খাবারের পরিমাণ ছিল সীমিত। এখন বিষয়টা উল্টে গিয়েছে। মানুষ পরিশ্রম করুক বা না করুক, খাওয়ায় কিন্তু কোনও বিরাম নেই। ফল যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। জঙ্গলের বাঘ-সিংহকে দেখুন। ওরা কিন্তু মোটা হয় না। কারণ, শিকার ধরতে ওদের প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। সব সময়ে ছুটেও শিকার ধরতে পারে না। সেই কারণে খাবারের জোগান থাকে সীমিত।

 

প্রশ্ন: পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কী খাচ্ছি, সেটাও তো জরুরি?

উত্তর: আমাদের দেশে সর্বত্রই কার্বোহাইড্রেট খাওয়ার চলটা খুব বেশি। বিদেশে এক জন সারা দিনে যা খান, তার হয়তো ৪৫ শতাংশ কার্বোহাইড্রেট। কিন্তু এখানে সেটাই প্রায় ৬০-৬৫ শতাংশ। পাশাপাশি ভাজাভুজি খাওয়ার প্রবণতা থাকায় ভারতীয়দের শরীরে ফ্যাটও যথেষ্ট পরিমাণে ঢোকে। মার খায় শুধু প্রোটিন। যার ফলে ভাল ভাবে পেশি তৈরি হয় না। এ জন্য সাহেবরা রসিকতা করে বলে, ‘থিন, ফ্যাট ইন্ডিয়ান’। অর্থাৎ, ভারতীয়দের দেহ ভুঁড়িপ্রধান, কিন্তু পেশিবহুল নয়। 

 

আরও পড়ুন: সন্তান কোনও নিয়মই মানতে চায় না? শাসন না করেই সমাধান করুন এ ভাবে

ফিট থাকতে ভরসা রাখুন দুই পায়ে।

প্রশ্ন: তা হলে জাঙ্ক ফুড এড়ানোটাই একমাত্র সমাধান নয়?

উত্তর: শুধু জাঙ্ক ফুড বন্ধ করলেই চলবে না। সুষম খাওয়াদাওয়াটা খুব দরকার। আমরা কার্বোহাইড্রেটের উপরে বড় বেশি নির্ভরশীল। ভাতই হোক বা রুটি, সেটাই আমাদের মূল খাবার। সঙ্গে হয়তো তরি-তরকারি বা মাছ-মাংস থাকে। কিন্তু সেটা পরিমাণে অনেক কম। অনেকে এসে জিজ্ঞেস করেন, ‘ডায়াবিটিক ডায়েট’ কেমন হওয়া উচিত? আমি বলি, ডায়াবিটিক ডায়েট বলে কিছু হয় না। যা স্বাস্থ্যকর, যা খেলে শরীরের উপকার হবে, সেটাই ডায়াবিটিক ডায়েট। আপনি হয়তো বড় এক থালা ভাত আর ছোট এক বাটি তরকারি এবং এক পিস মাছ খান। এ বার যদি ভাত আর তরকারির অনুপাতটা ঠিক উল্টে দেন এবং মাছের পরিমাণটাও বাড়ান, তা হলেই ওটা ডায়াবিটিক ডায়েট হয়ে যাবে। ভাতটা কম করে ডাল-তরকারি   আর প্রোটিনটা বেশি খান। কোনও কিছুই বাদ দিতে বলি না আমরা। বলি, সব কম করে খেতে।

 

প্রশ্ন: ডায়াবিটিক ডায়েট তো সে ক্ষেত্রে সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য?

উত্তর: সেটাই তো বলছি। দেখুন, ফুলকপি, পাকা পেঁপে যে শরীরের পক্ষে উপকারি, এ তো আমরা সবাই জানি। কিন্তু টিভিতে কখনও পাকা পেঁপে বা ফুলকপির বিজ্ঞাপন দেখেছেন? দেখেননি। কিন্তু চকলেট, চিপস এবং আরও বিবিধ রকম জাঙ্ক ফুডের বিজ্ঞাপন তো হামেশাই দেখছেন। মনে রাখতে হবে, বিজ্ঞাপন দিয়ে আসলে ক্ষতিকারক জিনিসগুলোই খাওয়ানোর চেষ্টা চলছে। সেই হাতছানি এড়াতে না পারলে মুশকিল।

 

প্রশ্ন: ফ্যাটি লিভার থেকেও কি ডায়াবিটিস হতে পারে?

উত্তর: পারেই তো। আজকাল শহরাঞ্চলে ফ্যাটি লিভারের সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছে। শুধু জাঙ্ক ফুড নয়, অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট থেকেও কিন্তু ফ্যাটি লিভারের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। গ্রামাঞ্চলের চাষি বা কায়িক শ্রম করা মানুষেরও ফ্যাটি লিভার হচ্ছে। তাঁরা কিন্তু তথাকথিক জাঙ্ক ফুড খান না। তা সত্ত্বেও। এর কারণ, অনেক সময়েই দেখা যায়, ওই চাষির খাওয়াদাওয়াটা খুব বেশি রকম কার্বোহাইড্রেট-নির্ভর। জলখাবারে হয়তো এক ধামা মুড়ি আর দুপুরে এক থালা ভাত। সেই খাবারে না আছে ফ্যাট, না আছে প্রোটিন। পুরোটাই নিখাদ কার্বোহাইড্রেট। সেই কার্বোহাইড্রেটও কিন্তু লিভারে পৌঁছে ফ্যাটে পরিণত হচ্ছে। তাই দেখা যায়, ছিপছিপে চেহারার এক জন পরিশ্রমী মানুষেরও ফ্যাটি লিভার হচ্ছে।

 

আরও পড়ুন: একটানা কম্পিউটার বা মোবাইলে চোখ? দৃষ্টিশক্তি বাঁচাতে রপ্ত করুন এ সব কৌশল

প্রশ্ন: ফ্যাটি লিভার তো আরও অনেক সমস্যা ডেকে আনে?

উত্তর: চর্বি জমে যাওয়ায় লিভার যদি নিজের কাজ ঠিকমতো করতে না পারে, তা হলে সিরোসিস অব লিভার হতে পারে। আগে আমাদের ধারণা ছিল, মদ্যপান বা হেপাটাইটিস থেকেই ওই রোগ হয়। আধুনিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সিরোসিস অব লিভারের প্রধান কারণই হল লিভারে জমে যাওয়া অতিরিক্ত চর্বি।       

 

প্রশ্ন: আজকাল তো শিশুদের মধ্যেও ডায়াবিটিস আকছার দেখা যাচ্ছে?

উত্তর: বড়দের যে কারণে হচ্ছে, ছোটদের ক্ষেত্রেও কারণটা একই। বেশি খাওয়া এবং তার সঙ্গে পরিশ্রমবিমুখ জীবন। ছোটদের ক্ষেত্রে স্কুলের ভূমিকাটা খুব জরুরি। এখানে তো দেখি, নামী-দামি অনেক স্কুলেই খেলার মাঠের কোনও বালাই নেই। অথচ, সেই সব স্কুলে হয়তো রেকর্ড সংখ্যক ছেলেমেয়ে পড়ে। পৃথিবীর অধিকাংশ সভ্য দেশে কিন্তু খেলার মাঠ না থাকলে স্কুল চালু করার অনুমোদনই পাওয়া যাবে না।

 

প্রশ্ন: আজকাল তো মাঠ থাকলেও বাচ্চারা খেলতে চায় না। কার্টুন আর ভিডিয়ো গেম নিয়ে মজে থাকে।

উত্তর: এ সব ক্ষেত্রে মা-বাবার পাশাপাশি স্কুলের ভূমিকাটাও কিন্তু জরুরি। মা-বাবাকে মনে রাখতে হবে, তাঁদের ডায়াবিটিস থাকলে দু’বছরে অন্তত এক বার করে সন্তানের সুগার পরীক্ষা করাতে হবে। আর বাচ্চারা যাতে যথেষ্ট পরিমাণ খেলাধুলো ও পরিশ্রম করে, সেটা স্কুলকে নিশ্চিত করতে হবে। সিঙ্গাপুরে দেখেছি, স্থূলতার সমস্যা থাকলে সেই সব পড়ুয়াকে অন্তত আধ ঘণ্টা আগে স্কুলে পৌঁছতে বলা হয়, যাতে ওই বাড়তি সময়ে সে ব্যায়াম করতে পারে। জাপানে যেতে হয় ৪৫ মিনিট আগে। স্কটল্যান্ডে শুনেছি ‘স্কুল ফ্রুট প্রোগ্রাম’ বলে একটা ব্যবস্থা চালু আছে। একটি শিশু হয়তো বার্গার নিয়ে স্কুলে ঢুকল। শিক্ষক বা শিক্ষিকা সেই বার্গারটা নিয়ে তার হাতে একটা আপেল ধরিয়ে দিলেন। সেই আপেল স্কুলই কিনে দিচ্ছে। 

 

প্রশ্ন: ‘প্রি-ডায়াবিটিস’ এবং ‘ডায়াবিটিস প্রিভেনশন’ নিয়ে তো সারা বিশ্বেই এখন খুব চর্চা। বিষয়টি ঠিক কী?

উত্তর: ডায়াবিটিস হওয়ার আগে সাধারণত শরীরে ‘ইনসুলিন রেসিস্ট্যান্স’ তৈরি হয়। অর্থাৎ, ইনসুলিন শরীরে ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। যা ধীরে ধীরে ডায়াবিটিসের দিকে এগিয়ে দেয়। এই অবস্থাটাই ‘প্রি-ডায়াবিটিস’। বিভিন্ন উন্নত দেশ এবং ভারতের উন্নত রাজ্যগুলিতে কিন্তু দেখা গিয়েছে, নিয়মিত শারীরচর্চা এবং খাওয়াদাওয়ায় পরিবর্তন এনে ‘প্রি-ডায়াবিটিস’ অবস্থা থেকে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়া যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়াকেই বলে ‘ডায়াবিটিস প্রিভেনশন’। অনেক দেশেই সরকার ডায়াবিটিস রুখতে বিশেষ প্রকল্প চালু করেছে। উন্নত দেশগুলিতে দেখা গিয়েছে, ‘প্রি-ডায়াবিটিস’ থেকে যাঁদের ডায়াবিটিস হচ্ছে, তাঁদের সংখ্যা দুই থেকে পাঁচ শতাংশের মতো। চিনে তা ১১ শতাংশ। আর ভারতে ১৭-১৮ শতাংশ, যেটা বেশ উদ্বেগজনক।

 

প্রশ্ন: স্ট্রেস থেকেও ডায়াবিটিস হয়?

উত্তর: দেখুন, স্ট্রেস থেকে যে ডায়াবিটিস হতে পারে, এটা কমবেশি সকলেই মানেন। কিন্তু সমস্যা হল, স্ট্রেস এখনও সে ভাবে পরিমাপ করা যায় না। মনোবিদেরা হয়তো নিজেদের মতো করে বুঝতে পারেন, কার কতটা স্ট্রেস। আবার উল্টো দিকে, স্ট্রেস কমলে ডায়াবিটিস কমে কি না, সে বিষয়ে এখনও উল্লেখযোগ্য গবেষণা হয়নি।

 

প্রশ্ন: ডায়াবিটিস আছে, অথচ তার উপসর্গ নেই, এমনও তো হয়?

উত্তর: টাইপ ওয়ান ডায়াবিটিসের ক্ষেত্রে উপসর্গ থাকবেই। তবে টাইপ টু-তে অনেক সময়ে কোনও উপসর্গ থাকে না। কারও হয়তো রেটিনার সমস্যা দেখা দিল। সেই সূত্রে জানা গেল, ডায়াবিটিসই তা ঘটিয়েছে। অথচ রোগী জানতেনই না, তাঁর ডায়াবিটিস রয়েছে। সেই কারণে আমরা বলি, পরিবারে যদি ডায়াবিটিসের ইতিহাস থাকে, তা হলে বয়স কুড়ি পেরোলেই বছরে এক বার করে সুগার পরীক্ষা করান।