এক অতিজনপ্রিয় অভিনেত্রী এক দিন সগৌরবে বলছিলেন, তিনি যে নারীবাদী নন, তা তাঁর সাজ দেখলেই বোঝা যাবে। তিনি মেকআপ করেন, খোলামেলা পোশাক পরেন, এমনকি, এলো চুলে বেরোতে বেশ পছন্দ করেন। নারীবাদী হলে নাকি এমন হত না!
নারীবাদী হওয়া কিংবা না-হাওয়া কারও ব্যক্তিগত বিবেচনার বিষয়। নারীবাদী বা ‘ফেমিনিস্ট’ কথাটি বহু দিনই হল এক প্রকার অপশব্দ হিসাবে ব্যবহার করার চল হয়েছে। ফলে হয়তো কেউ কেউ নিজে যে নারীবাদী নন, সে কথা জোর গলায় বলে দিতে পছন্দ করেন। সে প্রসঙ্গ আলাদা। তা নিয়ে কথা তুললে শেষ হবে না।
কিন্তু তাই বলে সাজ বলে দেবে, কে নারীবাদী আর কে নারীবাদী নন? তা হলে কি কাজের কোনও প্রয়োজনই নেই নারীবাদীদের? সে প্রসঙ্গ উঠতেই পারে। তবে আমাদের আজকের বিষয় থাক বরং সাজ।
মেয়েরা মেয়েদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েও চালু হয় ‘ফ্যাশন শো’। ছবি: ফ্রিপিক।
নারীবাদী মানেই কি সাজহীন এক নারী? অথবা যে নারী লাল লিপস্টিক মেখে কাজে বেরোন, তিনি কি নারীর অধিকারের দাবি তোলার মুখ হতে পারেন না? নাকি তিনি নারীবাদীই হতে পারেন না? এ প্রশ্ন সেই থেকে ঘুরপাক খাচ্ছে।
নারীবাদীর কি ইউনিফর্ম হয়? না কি হওয়া উচিত? নিন্দকেরা বলে থাকেন, নারীবাদী মানেই হাতে সিগারেট, উঁচু করে চুল বাঁধা, ফ্যাকাশে রঙের শাড়ি। কিংবা পশ্চিমি প্যান্ট-শার্ট, তবে জৌলুসহীন। সে জন্য রোজ যে নারী সালোয়ার-কামিজ় পরে অফিস যান, তিনি একদিন জিন্সের সঙ্গে লাল টিপ পরে এলে সহকর্মী নির্দ্বিধায় প্রশ্ন করেন, ‘‘তুই কি নারীবাদী হয়ে গেলি নাকি? একেবারে যাদবপুর যাদবপুর (যেন এই স্থান তথা বিশ্ববিদ্যালয়টিই তথাকথিত নারীবাদের উৎস) দেখাচ্ছে!’’
চলচ্চিত্র ও নাট্যকর্মী সুস্মিতা সিংহের যেমন এ কথা শুনেই আরও অনেক কথা মনে পড়ে। তিনি বলেন, ‘‘কত জনের কাছে যে ‘ফেমিনিস্ট’ কথাটাই কু-কথা, কী যে বলব! কিন্তু নারীবাদীর আবার ইউনিফর্ম হয় নাকি! এক এক জন এক এক জায়গা থেকে আসেন, তাঁরা নিজের মতো সাজেন। সেটাই তো স্বাভাবিক।’’ ভাবনা বা কাজ এক ধরনের মানেই যে সাজ এক প্রকার হতে হবে, তা কি কোথাও বলা আছে? প্রশ্ন তাঁর।
তবে আজ যা স্বাভাবিক, এক সময়ে হয়তো তা স্বাভাবিক ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যেমন বহু ক্ষেত্রে বদল এসেছিল, তেমনই বদলাচ্ছিল মেয়েদের আন্দোলন। পশ্চিমদুনিয়ায় তখন মেয়েদের সেই ঘরোয়া গৃহবধূর যে সাজ, তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে শুরু করেন ফ্রান্স থেকে আমেরিকা, নানা জায়গার মেয়েরা। ‘পোলকা ডট’ দেওয়া বা ফুলেল নকশা করা কাপড় হলে তবেই তা হবে মেয়েলি, না হলে নয়, এই ধারণা প্রকট ভাবে ভাঙতে শুরু করে ষাট-সত্তরের দশকের পশ্চিমি বিশ্বে। কেউ কেউ বলবেন, শুধু পশ্চিমের কথা উঠছে কেন, ভারতীয় নারীরা কি নিজের মতো করে সাজকে যুগের উপযোগী করে তোলেননি? অবশ্যই তুলেছেন। তবে নারী আন্দোলনের রাজনৈতিক ইতিহাসে সে সময়ের পশ্চিম দুনিয়ার সাজগোজ একটি বড় জায়গা করে নিয়েছিল। সে সময়ে বেশি করে ভাঙতে থাকে পুরুষ ও নারীর পোশাকের মধ্যে ভেদ-বিভেদের ধারণা। সেকেন্ড ওয়েভ ফেমিনিজ়মের সময়টা উল্লেখ করলে বঝতে সুবিধা হতে পারে, যখন শরীরের খাঁজ ও ভাঁজ না দেখানো পোশাকও মেয়েদের বিপ্লবের ভাষা হয়ে ওঠে। কেউ পরেন ঢিলে জিন্স আর শার্ট, কেউ বা অন্য কিছু। ধীরে ধীরে গোটা বিশ্বে ছড়ায় ‘পাওয়ার ড্রেসিং’-এর ভাবনাও। এক নারী যখন নিজের ব্যক্তিত্ব সুস্পষ্ট করে তুলতে কোট-প্যান্টের মতো তথাকথিত পুরুষালি ক্ষমতার দ্যোতক পোশাক পরেন, কারণ ক্ষমতা মানে শুধু পুরুষদেহ যে নয়, সমাজকে তা বোঝানোর একটি অস্ত্রও হয়ে ওঠে পোশাক। তবে তারই সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়তে থাকে ফ্যাশন দুনিয়া। ভাবনা ও কাজের দিক থেকে শক্তিশালী নারীরা এগিয়ে আসেন ‘মিনি স্কার্ট’ কিংবা ‘মিনি ড্রেস’ পরে। মেয়েরা মেয়েদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েও চালু হয় ‘ফ্যাশন শো’।
আরও পড়ুন:
আন্দোলনের ধাপে ধাপে সে সব সাজের কোনওটা বর্জন করেছেন অধিকাংশে। কোনওটা বা বয়ে নিয়ে এসেছেন নিজেদের আন্দোলনের অঙ্গ হিসাবে। তার কিছু কিছু আবার নিন্দিত হয়েছে নারীবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলার ছলে। কেউ বলেছেন, খোলামেলা পোশাক পরে মেয়েরা আসলে নিজের অঙ্গ প্রদর্শন করার রাজনীতি করেছেন। তার মধ্যে থেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছেন নিজেদের। আসলে সে-ও নাকি হল পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সুখ দেওয়ার ছল! ইদানীং কালে তা আরও বেশি বেশি করে আলোচিত হতে শুরু করেছে সে সব কথা। জেন জ়ি-র ‘সাহসিকতা’-কে নিন্দা করে যেমন কেউ কেউ বলেছেন, খোলামেলা পোশাক পরে বিপ্লব হয় না। তাতে আসলে নিজেকেই ‘অবজেক্টিফাই’ করার (এ ক্ষেত্রে অন্যের বাসনাকে সুখ দেওয়ার) উদ্দেশ্য প্রকাশিত হয়। তবে সে ভাবে বিষয়টি দেখতে নারাজ জাতীয় পুরস্কারজয়ী স্বাধীন চলচ্চিত্রকার ফারহা খাতুন। তিনি বলেন, ‘‘অবজেক্টিফাই করা মানে কী? নিজেকে কেউ অব্জেক্টিফাই করে নাকি? যার যা ইচ্ছা, সে তা পরে। যে সেই সাজ দেখছে, সে তাকে অব্জেক্টিফাই করছে বা করছে না।’’ এর সঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন তোলেন ফারহা। তাঁর বক্তব্য, ‘‘নারীবাদীরা কি অন্য গ্রহের মানুষ, যে তাঁদের সাজ অন্য রকম হবে? তাঁর যেমন সাজতে ইচ্ছা করবে, তেমন সাজবেন। আর পাঁচজনের মতোই তো মানুষ তাঁরা।’’ গলা মেলান সুস্মিতাও। সমাজের নানা স্তরের মেয়েদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। সুস্মিতা বলেন, ‘‘নারীরা এক এক জায়গায় এক এক রকম। তাঁদের সাজও সেই ভাবে বদলায়।’’ ঠিক যেমন অধিকারের লড়াইও এক এক জায়গায় এক এক রকম। এবং সে কারণেই নারী আন্দোলন বদলেছে সময়ের সঙ্গে তাল রেখেই।
এক দেশে যখন মেয়েদের ভোটাধিকার নিয়ে লড়াই হচ্ছে, তখন হয়তো অন্য আর এক দেশে আন্দোলন হচ্ছে সমান কাজের জন্য সম-বেতনের। যিনি সেই লড়াই করছেন, তাঁর সাজ এক প্রকার। আর যিনি মেয়েদের লেখাপড়ার অধিকারের জন্য লড়াই করছেন আর এক দেশে বসে, তাঁর বেশভূষা একেবারে অন্য রকম।
মালালা ইউসুফজ়াই। ছবি: ফ্রিপিক।
নাম প্রকাশ না করেই এক কলেজ শিক্ষক প্রশ্ন তোলেন, ‘‘মালালা ইউসুফজ়াই যখন আফগানিস্তানে লড়াই করছিলেন, তখন কিন্তু নিজেও সে দেশের অন্য মেয়েদের মতো সাজপোশাক বেছে নিয়েছেন। তবে কি তিনি কম নারীবাদী? নারীবাদী কথাটি বরং থাক। তিনি কি মেয়েদের অধিকারের জন্য কথা বলছিলেন না তখন?’’ এক কলেজছাত্রী রুমেলা রায় সে প্রসঙ্গ টেনেই আবার প্রশ্ন করেন, ‘‘তা হলে এক জন কর্পোরেট অফিসে কাজ করা নারী যদি সমান বেতনের প্রসঙ্গ তোলেন, তবে তাঁর ঠোঁটে লাল লিপস্টিক থাকতে পারবে না কেন? কেন তাঁকে কম বিপ্লবী ভাবা হবে? শুধু তিনি রঙিন সাজগোজ করেছেন বলে?’’
নারী আন্দোলনের পাশে থাকতে গ্লোরিয়া স্টাইনমকে নিয়েই হয়েছিল ফ্রান্সের নামী এক ফ্যাশন ম্যাগাজ়িনের কভার স্টোরি। ছবি: ফ্রিপিক।
লাল লিপস্টিকের প্রসঙ্গও না হয় তোলা থাক। তার আগে এক খ্যাতনামী নারীবাদীর কথা হোক। গ্লোরিয়া স্টাইনম। আমেরিকার সাংবাদিক ও সমাজকর্মী। সত্তরের দশকে নারী আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁকে নিয়েই হয়েছিল ফ্রান্সের নামী এক ফ্যাশন ম্যাগাজ়িনের কভার স্টোরি। তাঁকে নিয়ে বলা ভুল। তাঁর সাজ নিয়ে। তিনিও হয়ে উঠেছিলেন এক সময়ের ফ্যাশন বিগ্রহ। তাতে কি তাঁর কাজ কম হয়েছে, নাকি কাজের গুরুত্ব কমেছে? তবে সেই থেকে তাঁর মতোই যে সেজে চলেছেন সমস্ত নারীবাদী, এমনও নয়।
বরং ষাটের দশক থেকে শুরু করে ‘বাস্ট’, ‘বিচ’-এর মতো একের পর এক ম্যাগাজ়িন চালু হয়েছে নারীবাদী আন্দোলনের অঙ্গ হিসাবেই। সেখানে নানা বর্ণ, নানা রঙের সাজ হয়ে উঠেছে নারীর পরিচয়। ‘সম কাজে সম সাজ’ তার সারমর্ম মোটেও ছিল না।