দুধের মাঠা তুলে, ঘরে জ্বাল দিয়ে বানানো দেশি ঘিয়ের সঙ্গে আমাদের হাজার বছরের সম্পর্ক৷ সেই সম্পর্কে প্রথম ছেদ পড়ে ৭০–এর দশকের গোড়ায়, স্যাচুরেটেড ফ্যাটের ছুতোয়৷ কারণ বিজ্ঞানীদের ধারণা হয়েছিল হাই কোলেস্টেরল, ইসকিমিক হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের অন্যতম কারণ হল স্যাচুরেটেড ফ্যাট৷ এক চামচ ঘিয়ে থাকে ১৫ গ্রামের মতো ফ্যাট। তার মধ্যে ৯ গ্রামই স্যাচুরেটেড ফ্যাট। তার উপর এতে আছে ৪৫ মিলিগ্রামের মতো কোলেস্টেরল। তাই  এক সময় বিজ্ঞানীরা ধরে নিয়েছিলেন, হৃদরোগ ঠেকাতে চাইলে একে বর্জন করতেই হবে৷

কিন্তু বর্জন বললেই তো আর বর্জন করা যায় না৷ অভ্যাসের প্রশ্ন আছে৷ ভাবতে হবে স্বাদ–গন্ধের বিষয়টাও৷ ফলে হাজার টানাপড়েনের পরেও অনেকেই তাকে ছাড়তে পারলেন না৷ কিন্তু মনে বিঁধে রইল প্রবল অশান্তি৷ এই বুঝি কোলেস্টেরল বাড়ে, এই বুঝি হৃদরোগ হয়!

গবেষণা ও পরিসংখ্যানের হাত ধরে ঘি তথা স্যাচুরেটেড ফ্যাটের ভিলেনত্ব অবশেষে ঘুচল৷ বিজ্ঞানীরা দেখলেন সবচেয়ে বেশি স্যাচুরেটেড ফ্যাট খান ফ্রান্সের মানুষ৷ তা হলে তাঁদেরই দলে দলে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা৷ কিন্তু তা তো হচ্ছে না বরং দেখা যাচ্ছে হৃদরোগে মৃত্যুর হার সবচেয়ে কম ফ্রান্সেই৷ তা হলে?

আরও পড়ুন: হঠাৎ নাক থেকে রক্ত? কী ভাবে মোকাবিলা করবেন জেনে নিন

এমন জায়গা থেকে কিনুন যেখানে দুধের মাঠা তুলে বা মাখন জ্বাল দিয়ে ঘি বানানো হয়৷

ভিলেন নয়, বন্ধু

‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল’–এর বিজ্ঞানীদের মতে সারা দিনে যত ক্যালোরি খাওয়ার কথা, তার ২০–৩৫ শতাংশ আসা উচিত চর্বি থেকে৷ তার মধ্যে ১০ শতাংশের কম স্যাচুরেটেড ফ্যাট থেকে এলে, ক্ষতি নেই৷ বরং উপকার৷ এক চামচ ঘিয়ে থাকে ৯ গ্রাম স্যাচুরেটেড ফ্যাট, তা সারা দিনে যতটা খাওয়ার উর্দ্ধসীমা, তার ৪৫ শতাংশ৷ কাজেই দিনে দু’চামচ ঘি খাওয়া যেতেই পারে৷ আবার এক চামচ ঘিয়ে যে ৪৫ মিলিগ্রা কোলেস্টেরল থাকে, তা দৈনিক চাহিদার ১৫ শতাংশ৷

তা ছাড়া জানা গিয়েছে যে হাই কোলেস্টেরলের ধাত না থাকলে খাবার থেকে অল্পবিস্তর কোলেস্টেরল এলে কোনও ক্ষতি হয় না৷ ক্ষতি হয় পার্শিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল বা বনস্পতি খেলে৷ কারণ এতে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের সঙ্গে থাকে প্রায় ৪০ শতাংশ ট্রান্স ফ্যাট৷ অনেক সময় স্বাদ–গন্ধ মিশিয়ে এদেরই ‘দেশি ঘি’ বলে চালানো হয়৷ কাজেই ঘি খেতে ইচ্ছে হলে হয় ঘরে বানিয়ে নিন, নয়তো এমন জায়গা থেকে কিনুন যেখানে দুধের মাঠা তুলে বা মাখন জ্বাল দিয়ে ঘি বানানো হয়৷ উপকার পাবেন৷

ঘিএর উপকার

  • ঘি খেলে ওজন কমে, শুনেছেন কখনও? বাস্তব কিন্তু বলছে কমে৷ সুষম খাবারের পাশাপাশি দিনে দু’চামচের কম দেশি ঘি খেলে ওজন কমে৷ কারণ ঘিয়ে আছে কনজুগেটেড লিনোলেইক অ্যাসিড, ডায়াবেটিস ঠেকানোর পাশাপাশি ওজন কম রাখতেও তার ভূমিকা আছে৷ ভূমিকা আছে ক্যানসার ও ইসকিমিক হৃদরোগ প্রতিরোধেও৷
  • দিনে দু’চামচ ঘি খেলে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমে, বাড়ে উপকারি কোলেস্টেরল৷ হার্টের ধমনিতে চর্বি জমার প্রবণতা কমে৷ সবে মিলে হৃদরোগের আশঙ্কা কমে যায় প্রায় ২৩ শতাংশ৷ বিশেষ করে যদি খাবারের অন্য ফ্যাটের উৎস হয় সবজি ও উদ্ভিজ্জ তেল৷
  • ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে–তে ভরপুর ঘি৷ সঙ্গে আছে কোলিন৷ যকৃত ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভাল রাখতে যার ভাল ভূমিকা আছে৷
  • ঘি দিয়ে রান্না করলে ফ্যাটে দ্রবীভূত হয়ে ভিটামিন এ, ডি, ই, কে শরীরের উপযোগী হয়ে সব্জিতে মিশে যায়৷ ভিটামিনের গুণে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে খাবার৷
  • ঘিয়ের স্মোক পয়েন্ট ৪৮৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট৷ অর্থাৎ রান্না করার সময় চট করে ভেঙে গিয়ে ক্ষতিকর রাসায়নিক তৈরি হয় না৷ 
  • ঘিয়ে আছে বিউটিরেট৷ কোলনকে সুস্থ রাখতে, প্রদাহ কমাতে, ক্রনিক অসুখের আশঙ্কা কমাতে এর ভূমিকা বিরাট৷
  • দুধে অ্যালার্জি থাকলেও ঘিয়ে সমস্যা হয় না৷ কারণ ঘি বানানোর সময় অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উপাদান বাদ পড়ে যায়৷ 

আরও পড়ুন: ওজন কমাতে আলু বাদ, কিন্তু এ সব সব্জি খাচ্ছেন এখনও? রাশ টানুন আজই

বনস্পতি নয়, রান্নায় ব্যবহার করুন খাঁটি ঘি।

সতর্কতা

এমনিতে সুষম খাবারের সঙ্গে মাঝেমধ্যে এক চামচ দেশি ঘি খান৷ পুষ্টি হবে৷ হার্টও ভাল থাকবে৷ বশে থাকবে ওজন, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল৷ তবে এক চামচ ঘি–এ আছে ১৩৫ ক্যালেরি৷ কাজেই বাড়াবাড়ি করবেন না৷ এতে ওজন বেড়ে যাবে৷ লো–ফ্যাট খাবার খাওয়ার তাগিদে প্রক্রিয়াজাত খাবারের দিকে ঝুঁকবেন না৷ ফ্যাটের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি হবে এতে। ঘি খাওয়ার আগে কোথা থেকে ঘি কিনছেন, সে বিষয়ে সতর্ক হোন। এড়িয়ে চলুন বনস্পতি ও ভেজাল ঘি।

(শুরু হয়েছে আমাদের নতুন বিভাগ 'HELLO DOCTOR'। এ বারের বিষয় ‘ব্রণর সমস্যা’। এ বিষয়ে আপনার প্রশ্ন পাঠান  query@abpdigital.in এই মেল আইডি তে। উত্তর দেবেন ত্বক বিশেষজ্ঞ সঞ্জয় ঘোষ।)