Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

৩০ জুন ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

শাক থেকে শজারু, সবই কব্জি ডুবিয়ে খেত বাঙালি

ভারতচন্দ্রের আগে মোগলাই খাবারের উল্লেখ বিশেষ নেই। ‘অন্নদামঙ্গল’-এ কালিয়া-কোফতা-শিক কাবাবের কথা আছে। তবে আধুনিক বাঙালিকে পুরোদস্তুর মোগলাইপ্র

ঊর্মি নাথ
কলকাতা ১৫ এপ্রিল ২০১৯ ১৬:৫৫
Save
Something isn't right! Please refresh.
ছবি: ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য

ছবি: ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য

Popup Close

চাঁদ সওদাগরের ছেলের বিয়ে। পুত্রবধূ বেহুলা এসেছেন শ্বশুরালয়ে। অতিথি সমাবেশে গমগম চাঁদের বাড়ি। বিয়ের ভোজের এলাহি আয়োজন। রান্না হচ্ছে নিরামিষ, আমিষ ও হরেক রকমের মিষ্টি। বেসন দিয়ে চিতল মাছের কোল ভাজা, বড় বড় কই মাছ ভাজা জিরে লবঙ্গ মাখিয়ে, লঙ্কা দিয়ে মাগুর মাছের ঝোল, আম দিয়ে কাতলা মাছ, মহাশোলের অম্বল, চিংড়ি মাছের রসলাস, রুই মাছের মাথা দিয়ে মাষকলাইয়ের ডাল, পাবদা মাছ ও আদা দিয়ে শুকতুনি, শোল পোনা ভাজা, তেঁতুল লঙ্কা-সহ বোয়াল মাছের ঝাঁটি, পুঁটি মাছ ভাজা— প্রায় আঠারো ধরনের মাছের পদ।

এখানেই ইতি নয়। মাংস না খাওয়ালে গৃহকর্তার মান থাকে না। তার উপর তিনি যখন চাঁদ সওদাগর। সে দিন ছিল হরিণ, পাঁঠা, ভেড়া, পায়রা ও কচ্ছপের মাংসের ঝাল-ঝোল-অম্বল। নারকোল ভাজা দিয়ে খাসির চর্বি আজ কল্পনাতীত। কচি পাঁঠা বা খাসির জমানার আগে মাছে-ভাতে বাঙালির প্রিয় ছিল হরিণের মাংস। তবে শজারু, শুয়োর, গোসাপ, হাঁস, মুরগি কিছুই বাদ দিত না। ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে কবি বিজয় গুপ্ত লিখেছেন, এমন অনেক ব্যঞ্জনের কথা, যা আজ লুপ্ত তো বটেই, সে সবের নাম শুনলে অনেকেই চমকাবেন। মাছে ভাতে বাঙালি যে যথেষ্ট মাংসাশী ছিল তার আরও প্রমাণ মেলে ষোড়শ শতকে কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের ‘চণ্ডীমঙ্গল’-এ। সেখানে তো মাংসের ছড়াছড়ি। নিদয়ার শখ, সাধভক্ষণে তিনি খাবেন নকুল গোধিকা আর শজারু পোড়া! ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’-এ ভবানন্দ মজুমদারের স্ত্রী পদ্মমুখী ব্রাহ্মণ ভোজনের জন্য তরিবত করে রাঁধছেন— আম দিয়ে শোল মাছ, বাচা মাছের ঝোল, ভেটকি, কই, খয়রা মাছ ভাজা। তেতো রাঁধছেন পচা মাছ দিয়ে, তিতকুটে স্বাদ কাটানোর জন্য দিচ্ছেন গুড়। মাছের এত পদের সঙ্গে ছিল কাছিমের ডিম সেদ্ধ ও ডিমের বড়া।

উনিশ শতকে প্রকাশিত হয় বাঙালির প্রথম রান্নার বই। ১৮৩১ সালে, বিশ্বেশ্বর তর্কালঙ্কার ভট্টাচার্যের ‘পাক রাজেশ্বর’। এর পর ১৮৫৮ সালে গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশের ‘ব্যঞ্জন রত্নাকর’। বিশ্বেশ্বর তর্কালঙ্কারের মতে, বাঙালির জীবনে বিপ্লব যদি কোথাও ঘটে থাকে তবে তা রান্নাঘরে। তিনি নিজেই নব্যন্যায়ের চর্চা ছেড়ে ডুব দিয়েছিলেন রন্ধন শিল্পে। এই দুই সংস্কৃতজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের লেখাতেই মাংসের এক মহাকাব্য। ‘পাক রাজেশ্বর’-এ ‘প্রলেহ’ অর্থাৎ কোর্মা তৈরির প্রণালী উল্লেখ করেছেন। আছে ভেড়া, কচ্ছপ, হরিণ, খরগোশ রান্নার বিভিন্ন পদও। তিলের তেল দিয়ে ছাগলের মাথা ও নাড়ি রান্নার পদ্ধতি দিয়েছেন বিশ্বেশ্বর। গৌরীশঙ্করের ‘ব্যঞ্জন রত্নাকর’-এ আছে মাংস পরিষ্কারের কথা— ‘লোমসহ চর্ম্ম দূর করণের পর উদরসহ মূত্র পুরীষ ও পিত্তস্থলী এবং নাড়ি ইত্যাদি ত্যাগ করিবে, পরে ওষ্ঠ দন্ড চক্ষূ কর্ণ ক্ষুর ও চরণ আদি ত্যাগ করিবে।’ গরমমশলা, আদা, পেঁয়াজ ও ঘি সহযোগে নাড়ি রান্নার পদ্ধতিও এই বইতে আছে। আছে মাংস দিয়ে করলা বা বেগুনের শুক্ত প্রলেহ, মাংস দিয়ে লাউ অথবা ঝিঙে, কাঁচা আম, আনারস বা কলার পোলাও, শসা বা কাঁকুড়ের শাঁস বার করে তাতে মাংসের পুর ভরে কাবাব ইত্যাদি।

Advertisement

আরও পড়ুন: বাঙালি রেস্তরাঁ নয়, তবু নববর্ষে চমক থাকছে এদেরও! কত দাম আর মেনুই বা কী?

বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের ‘পাক-প্রণালী’তেও ঠাঁই পেয়েছে লাউয়ের ‘শুষ্ক প্রলেহ’, ‘নাড়ী রন্ধন’, মাংস চাল ও সোনামুগের ডাল দিয়ে মোকশ্বর খেচরান্ন, চাল ঘি মাংস দিয়ে খয়বরী জেরবিরিয়ান, ঝলসানো হরিণ বা ভেড়ার মাংস, রুটির ছিলকা ও দুধ দিয়ে মাংসের এসক্যালাপ— আজকের বাঙালির কাছে এ সবই হিব্রু। ইতিহাসবিদ তপন রায়চৌধুরী লিখছেন, আকবর আর জাহাঙ্গিরের আমলে বাংলায় খাসি, বাছুর, বনমোরগ, বুনো শুয়োর, খরগোশ, হরেক রকম পাখি দিব্যি চলত, ছুঁতমার্গ ছিল শুধু মোরগ, হাঁস-মুরগির ডিম, পোষা শুয়োর, আর গৃহপালিত পশুপাখি নিয়ে। অতএব শিকারি মনোবৃত্তি বাঙালির মজ্জাগত।

মুর্শিদাবাদের নবাবদের প্রিয় ছিল মুর্গ ইয়াখনি। যা আজ বললে কাল রাঁধা যেত না। সময় লাগত বেশ ক’টা দিন। আটার মধ্যে বিষ মিশিয়ে খাওয়ানো হত সদ্য যুবক হওয়া একটি মোরগকে। মোরগটি মারা গেলে সেটির শরীর থেকে সামান্য মাংস কেটে নিয়ে আবার আটায় মিশিয়ে খাওয়ানো হত আর একটি মোরগকে। তার মৃত্যু হলে একই ভাবে মাংস কেটে খাওয়ানো হত আর একটি মোরগকে। শেষে এই বিষ খেয়ে যে মোরগের শুধু পালক খসে পড়ত, তাকেই বাছা হত ইয়াখনির জন্য! এই নির্মম প্রণালীর পরে প্রস্তুত হত সুস্বাদু খাবার।

ভারতচন্দ্রের আগে মোগলাই খাবারের উল্লেখ বিশেষ নেই। ‘অন্নদামঙ্গল’-এ কালিয়া-কোফতা-শিক কাবাবের কথা আছে। তবে আধুনিক বাঙালিকে পুরোদস্তুর মোগলাইপ্রিয় করার দায় যাবে ওয়াজিদ আলি শাহের উপর। কলকাতায় নির্বাসিত হয়ে আসার সময় সঙ্গে এসেছিলেন তাঁর প্রিয় বাবুর্চিরাও। ক্রমে লখনউয়ের বিরিয়ানি আচ্ছন্ন করে ফেলে বাঙালিকে। সে অবশ্য ১৮৫৭ সালে, সিপাহি বিদ্রোহের পরের ঘটনা। বাঙালির রসগোল্লা, লেডিকেনি সবই ইংরেজ আমলের তৈরি। স্বামী বিবেকানন্দের ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত লিখে গিয়েছেন, চা নামক পানীয়টি তাঁদের ছেলেবেলায় জনপ্রিয় হয়। অর্থাৎ ঘুম থেকে উঠে চা-বিস্কুটও প্রকৃত ‘বাঙালি’ খাবার নয়। কিছু খাওয়া লুপ্ত ঠিকই, পাশাপাশি ঢুকে পড়েছে এই রকম নতুনতর অনেক কিছু।

আরও পড়ুন: নববর্ষের বাঙালিয়ানায় কোন রেস্তরাঁয় কী কী পদ আর দামই বা কত?

বাঙালির পাত থেকে হারিয়ে যাওয়া ব্যঞ্জন নিয়ে স্মৃতিরোমন্থন করছিলেন শোভাবাজার রাজবাড়ির (ছোট তরফের) বৌ নন্দিনী দেব। প্রথমেই তার মনে পড়ল ডুমুর দিয়ে কুচো চিংড়ির ঘণ্ট। ‘‘ডুমুর কাটার একটা পদ্ধতি আছে। ভিতরের বীজ কাঠি দিয়ে বার করতে হয়।’’ ডুমুর কাটার সেই তরিবত আজ লুপ্ত। লুপ্ত অনেক কিছুই। শোভাবাজার রাজবাড়িতেই ১১২ বছর আগে রামেন্দ্রকৃষ্ণদেবের বড় ছেলের বিয়ের ভোজে বাংলা ও ফরাসি ভাষায় মেনু কার্ড ছাপানো হয়েছিল। তাতে ছিল ৩৬টি পদ। যার মধ্যে পদ্ম লুচি, হোসনি কাবাব, চন্দ্রকলা, খিরের খড়ুই, সন্ধানিকা, ফুলকপির রায়তা, বিপ্রভোগ-এর মতো পদ— আজ শুধুই ইতিহাস।

‘বিজয়া দশমীতে মিছরির ঘন সরবতে গোলাপ জল ও সিদ্ধি বাটা এক কুশী করে বামুন দিদিরা খাইয়ে দিতেন’— ‘থোড় বড়ি খাড়া’য় লিখছেন কল্যাণী দত্ত। প্রতিবার বিজয়া দশমীতে একই মেনু— লুচি আর বাঁধাকপি দিয়ে মশলাদার ভেটকি মাছ। মাছের কথায় তাঁর স্মৃতিতে জীবন্ত চিতল মাছের গরম বড়া আর বড়ার ঝাল। ইলিশ মাছের মতো চিতল মাছ নিয়ে বাঙালির প্রেম বিস্তর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই মাছ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘মিঠার গজার ছোট ভাই।’

বাঙালির পাত থেকে বহু ব্যঞ্জন এক সময় হারিয়ে যাবে অনুমান করেই হয়তো বিশ শতকের গোড়া থেকে রান্নার বই লিখতে শুরু করেন রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী, রাজশাহী জেলার দিঘাপতিয়ার জমিদারগিন্নি কিরণলেখা রায়, ময়মনসিংহের জমিদারগিন্নি রেণুকা দেবী চৌধুরাণী। তিরিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশের দশকের রন্ধনপ্রণালীগুলি পাওয়া যায় তাঁদের বইয়ে। রেণুকা দেবী লিখছেন, তাঁর শ্বশুরবাড়িতে হাঁসের মাংসকে নরম ও সুস্বাদু করার জন্য হাঁসকে পনেরো-কুড়ি দিন অন্ধকার ঘরে শুধু দই-ভাত খাইয়ে রাখার কথা। তাঁর বই থেকেই জানা যায়, বেশ কিছু হিন্দু জমিদার বাড়িতে গিন্নিরা রান্না শিখতেন মুসলমান বাবুর্চির কাছে। পাকশালায় ঢোকার আগে বাবুর্চিদের হিন্দু নামকরণ হত। প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর ‘কমলালেবুর ঠান্ডা জেলী’র উপকরণে আছে ভেড়ার মাংস। মাংসের সুরুয়া তৈরি করে তার সঙ্গে কমলালেবুর রস, ডিমের সাদা অংশ ইত্যাদি মিশিয়ে ঠান্ডা করে তৈরি হত জেলি। রান্নায় দক্ষ ছিলেন রবীন্দ্রপত্নী মৃণালিনী দেবী। মানকচুর জিলিপি, দইয়ের মালপোয়া বা নারকেল চিঁড়ের মতো রবীন্দ্রনাথের মস্তিষ্কপ্রসূত রান্নাগুলোর বাস্তবায়নের ভারও ছিল তাঁর উপর। নববর্ষে ঠাকুরবাড়ির দালানে বসে কলাপাতায় খাওয়া হত চালতা দিয়ে মুগডাল, আম শোল-সহ আরও অনেক কিছু।

আরও পড়ুন: দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

কিন্তু এত কিছুর পরেও ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’ অনুযায়ী মাছে ভাতে মাংসাশী বাঙালির বরাবরের প্রিয় ‘ওগ্গারা ভত্তা গাইক ঘিত্তা’— কলাপাতায় ফেনা ভাত গাওয়া ঘি দিয়ে। তার সঙ্গে অবশ্য আলুভাতের উল্লেখ নেই। আছে নালতে শাক, ময়না বা মৌরলা মাছ ভাজা। মধ্যযুগে বাঙালির ভাতের থালা নিরালু। পর্তুগিজরা এ দেশে প্রথম আলু নিয়ে আসে। কলকাতা-ঢাকা-মুর্শিদাবাদে আলু পৌঁছলেও বাংলার গ্রামাঞ্চলে তা পৌঁছেছিল অনেক পরে।

এই নববর্ষে বাঙালির আর একটি কৃতিত্ব কেউ খেয়াল রাখেনি। ভাত পচিয়ে মদ তৈরির প্রথম কৃতিত্ব বাঙালির। নীহাররঞ্জন রায় তাঁর ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’-এ জানিয়েছেন, তার সঙ্গে চাট ছিল নাপাকেলা। মানে, কাঁকুড়। কাঁকুড়ের চাট সহযোগে মদ্যপানও বাঙালির লুপ্ত রসনা-সংস্কৃতি।

ঋণ: মৎস্যভুক বাঙালি মাংসাশী হয়ে উঠল কবে থেকে?: জয়ন্ত সেনগুপ্ত; থোড় বড়ি খাড়া: কল্যাণী দত্ত

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement