চোখে চোখে কথা কি কেবল মানুষই বলে? অন্য স্তন্যপায়ীরা নয়? বিজ্ঞানীদের একদল বলছেন, ওই ক্ষমতা রয়েছে কেবল মানুষেরই। আর তা তারা পারে চোখের সাদা অংশের জন্য।
শিম্পাঞ্জির চোখের দিকে তাকালে বোঝা যায় না, সে কোন দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কারণ, শিম্পাঞ্জির চোখের মণিকে ঘিরে যে অংশ রয়েছে, তার রং গাঢ় বাদামি বা কালো। কিন্তু মানুষের তা নয়। চোখের মণিকে ঘিরে রাখে সাদা অংশ (স্ক্লেরা)। সে কারণে, মানুষ কোন দিকে তাকাচ্ছে, তা স্পষ্ট ধরা পড়ে যায়। তবে কোনও কোনও বিজ্ঞানী মনে করেন, এই গুণ শুধু মানুষের নয়, অন্য কয়েক প্রজাতির স্তন্যপায়ীরও রয়েছে।
জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের একদল বিজ্ঞানী বলছেন, চোখের মণিকে ঘিরে থাকা সাদা অংশ একমাত্র মানুষেরই রয়েছে। আর ওই অংশই তাকে অন্য মানুষের সঙ্গে মনের ভাব আদানপ্রদান করতে সাহায্য করে। কিন্তু কেন কেবল মানুষেরই রয়েছে? সেই নিয়েও হয়েছে নানা গবেষণা।
মাইকেল টোমাসেলোর নেতৃত্বাধীন বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার করা ওই তত্ত্ব ‘কোঅপারেটিভ আই হাইপোথেসিস’ নামে পরিচিত। তাঁরা মনে করেন, মানুষের দৃষ্টি কোন দিকে, কোন দিকে সে ইশারা করছে, তা যাতে অন্য জন বুঝতে পারেন, সে কারণেই তার চোখের মণির চারপাশে সাদা রঙের অংশ থাকে। এটা বিবর্তনের ফল। চোখের এই সাদা অংশ পরস্পরের সঙ্গে ভাব আদানপ্রদান করার পাশাপাশি শিশুদের শাসন করতেও সাহায্য করে।
মাইকেল এবং তাঁর সহযোগীরা একটি শিশু এবং একটি এপকে নিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন। দু’জনের মাথার উপর ঘুরছিল একটি পাখা। সেটিকে তারা কী ভাবে দেখছিল, তা পর্যবেক্ষণ করেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা দেখেন, এপ মাথা ঘুরিয়ে পাখার প্রদক্ষিণ দেখছে। সেখানে শিশুর শুধু চোখ ঘুরছে। তার পরেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, মানুষের তাকানো অনেক সংবেদনশীল বিষয়, অনেক সূক্ষ্ম। আর তা সম্ভব করেছে চোখের মণির চারদিকে থাকা সাদা অংশ। সেই সাদা অংশের উপরে কালো মণি থাকার কারণেই দৃষ্টি হয় কম্পাসের সূচের মতো। সাদা-কালো বা গাঢ় রঙের বৈপরীত্য সেটাকে সম্ভব করেছে।
এর পরে প্রায় ১০৮ ধরনের স্তন্যপায়ীর উপর পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা দেখেছেন, যে প্রাণীদের চোখের মণিকে গাঢ় রঙের অংশ ঘিরে রাখে, তাদের মধ্যে সহযোগিতার অভাব রয়েছে। নিজেদের প্রজাতির জীবের সঙ্গে প্রায়ই লড়াই করে তারা। কিন্তু যাদের চোখের মণির চারপাশের অংশ সাদা, উজ্জ্বল, তাদের প্রজাতির মধ্যে কলহের ঘটনা তুলনায় কম। মানুষের মতো না হলেও কয়েক ধরনের শিম্পাঞ্জি, বোনোবোর চোখের মণির চারপাশের অংশ তুলনামূলক উজ্জ্বল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের তুলনায় তাদের প্রজাতিতে ঝগড়-বিবাদ তুলনায় কম। তাঁদের মতে, এ ক্ষেত্রে মানুষের চোখের ইশারা, ভাষা বুঝতে পারাটাই বড় ফারাক গড়ে দেয়। চোখের ইশারাই উল্টো দিকের জনকে বুঝিয়ে দেয় যে, সে শত্রু না কি বন্ধু। তাই মানুষে মানুষে কলহ অন্যান্য প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীদের তুলনায় কম। আর চোখের সেই ভাষা বুঝতে সাহায্য করে তার মণিকে ঘিরে থাকা সাদা অংশ।
আরও পড়ুন:
২০২৫ সালে ‘বায়োলজিকাল রিভিউস’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, শিম্পাঞ্জিদের চোখের মণির চারপাশের অংশও কিছুটা সাদা। আগে তাকে যতটা গাঢ় রঙের মনে করা হত, ততটাও তা নয়। তার চোখের মধ্যেও রয়েছে সাদা-কালোর বৈপরীত্য। চোখের মণির চারপাশে ওই অংশ কতটা সাদা হবে, তা নির্ভর করে সেই প্রাণীর সুস্থতা, সঙ্গী বাছাইয়ের উপরে। তা ছাড়া স্ক্লেরা গাঢ় বা কালো রঙের হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে এক ধরনের কোষ। তা নির্ধারণ করে মেলানিন উৎপাদন। ওই বিজ্ঞানীদের মতে, স্ক্লেরার রঙের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা বা কলহের কোনও সম্পর্ক নেই।
আরও পড়ুন:
জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মানুষ যে সামাজিক জীব, তার নেপথ্যে রয়েছে তাঁর চোখ! বিবর্তনের ফলেই তাঁর চোখের দুই অংশের রঙে ওই বৈপরীত্য রয়েছে। আর সেই বৈপরীত্য তাঁকে পরস্পরের প্রতি সহযোগী করে তুলেছে। মানুষের মনে কী রয়েছে, তা প্রকাশ করতে সাহায্য করেছে। আর সে কারণেই সে সভ্যতা গড়ে তুলতে পেরেছে। অন্য স্তন্যপায়ীদের তা নেই বলেই তাঁরা সভ্যতা গড়ে তুলতে পারেনি।