Advertisement
E-Paper

আদর্শ ধোনি হলেও একটি ব্যাপারে মুকুল অনুসরণ করেন কোহলিকে! পন্থের পরামর্শে চাপমুক্ত একুশের তরুণের লক্ষ্য ম্যাচ শেষ করে ফেরা

ফিটনেস নিয়ে খুঁতখুঁতে মুকুল চৌধরি। অত্যন্ত দ্রুত খুচরো রান নিতে পারেন। সুবিধাজনক জায়গায় ভাল বল পেলে মাঠের বাইরে পাঠানোর চেষ্টা করেন। তবে তাড়াহুড়ো করে ম্যাচ হারতে চান না।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:১৯
picture of cricket

মুকুল চৌধরি। ছবি: রয়টার্স।

লখনউ সুপার জায়ান্টকে প্রায় হারা ম্যাচ জিতিয়ে ইডেন গার্ডেন্সে নজর কেড়েছেন মুকুল চৌধরি। ২১ বছরের উইকেটরক্ষক-ব্যাটার এ বারই প্রথম আইপিএল খেলছেন। কলকাতা নাইট রাইডার্স ম্যাচে নতুন ফিনিশার পেয়ে গেলেন ঋষভ পন্থেরা।

ইডেনের ২২ গজে ২৭ বলে ৫২ রানের অপরাজিত ইনিংসে ২টি চার এবং ৭টি ছয় মেরেছেন মুকুল। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের উপযোগী আগ্রাসী ব্যাটিং করেছেন। ২১ বছরের ব্যাটার ধরেও খেলতে পারেন। তার প্রমাণ তিনি দিয়েছেন ইনিংসের প্রথম ৮ বলে। চাপের মুখে ২২ গজের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পর হাত খুলেছেন। ওই ৮ বলে মুকুলের ব্যাট থেকে এসেছিল ২ রান। ২৫ স্ট্রাইক রেটে শুরু করে শেষ করেছেন ২০০ স্ট্রাইক রেটে! যেমন মারতে পারেন, তেমন ধৈর্য নিয়েও খেলতে পারেন।

মুকুলকে নিলাম থেকে কিনেছিলেন লখনউ কর্তৃপক্ষ। তবে রাজস্থানের ঝুনঝুনুর তরুণ লখনউ কর্তৃপক্ষের নজরে পড়েছিলেন তার কয়েক মাস আগে। একটি প্রস্তুতি শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানেই লখনউ কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্গারের নজরে পড়ে যান।

Advertisement

ঝুনঝুনুতে ক্রিকেট খেলার তেমন পরিকাঠামো না থাকায় মুকুলের শিক্ষক বাবা দলীপ কুমার চৌধরি তাঁকে রাজস্থানেরই সিকারের একটি ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। ছেলের খেলার খরচ চালাতে শিক্ষকতা ছেড়ে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। দলীপ স্বপ্ন দেখতেন, ছেলেকে ক্রিকেটার তৈরি করার। ছেলের ক্রিকেটার হওয়ার লড়াইয়ে কোনও খামতি রাখেননি। অ্যাকাডেমিতে এক দিন একটি ম্যাচে উইকেটরক্ষক না থাকায় মুকুল এগিয়ে এসে দস্তানা তুলে নিয়েছিলেন। অ্যাথলিট মুকুল হতাশ করেননি। সেই থেকে তিনি উইকেটরক্ষক। লখনউয়ের ২ কোটি ৬০ লাখ টাকার ক্রিকেটার ইডেনে প্রথম ছয় মেরেছেন হেলিকপ্টার শটে! ধোনির ভক্ত বলে কথা। কিছু ছাপ তো থাকবেই। মুকুলের ক্রিকেটের জন্যই তাঁর পরিবার এখন জয়পুরের বাসিন্দা।

কেকেআরের বিরুদ্ধে চাপের মুখে মাথা ঠান্ডা রেখে ম্যাচ জেতানো মুকুল বলেছেন, ‘‘মাথা ঠান্ডা রাখাই আসল। দু’-এক বছর আগেও খুব তাড়াহুড়ো করতাম। গত কয়েক মাস ধরে নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করেছি। ধৈর্য বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। এখন চেষ্টা করি যত বেশিক্ষণ সম্ভব ব্যাট করতে। বিশ্বাস করি শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে পারলে দলকে জেতাতে পারব। খেলা শেষ করাই আমার লক্ষ্য থাকে। আগের ম্যাচে চার-পাঁচ বল খেলার সুযোগ পেয়েছিলাম। আউট না হলেও ব্যাট-বলে ঠিক মতো হচ্ছিল না। তার পর ঋষভ পন্থের সঙ্গে কথা বলি। অধিনায়ক আমায় বেশি না ভাবার পরামর্শ দেন। চাপ না নেওয়ার পরামর্শ দেন। বলেন, শুধু বল বুঝে খেলে যেতে। নিজের ব্যাটিংয়ে মন দিতে। অধিনায়কের পরামর্শ শুনে অনেক চাপ মুক্ত হয়ে খেলতে পেরেছি। ফলও পেলাম।’’

জয়ের পর মুকুল চৌধরি।

জয়ের পর মুকুল চৌধরি। ছবি: রয়টার্স।

ইডেন ম্যাচের পর ফ্যাফ ডুপ্লেসিকে লখনউ কোচ ল্যাঙ্গার বলেছেন, ‘‘কয়েক মাস আগে একটা শিবিরে মুকুলকে প্রথম দেখেছিলাম। তখন থেকেই নজরে ছিল। পরে নিলামে কিনে নিয়েছি। ভারতে প্রচুর ক্রিকেট প্রতিভা রয়েছে। আমাদের ডাটা অ্যানালিস্ট শ্রীনিবাসের কথা বলতেই হবে। ওই আমাকে প্রথম এসে বলেছিল, ‘কোচ, আমাদের এই বাচ্চাটাকে নেওয়া উচিত।’ ওর পরামর্শ মতোই মুকুলকে আমরা নিয়েছিলাম। আমরা বেশ লাভবানই হয়েছি।’’

২১ বছরের মুকুলের ক্রিকেটীয় অভিজ্ঞতা দারুণ কিছু নয়। রাজস্থানের হয়ে চারটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ, পাঁচটি ৫০ ওভারের ম্যাচ এবং ১০টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ঘরোয়া লাল বলের বা ৫০ ওভারের ক্রিকেটে ব্যাট হাতে দারুণ কিছু করার নজির নেই। তবে ২০ ওভারের ক্রিকেটে আগ্রাসী ব্যাটার। মোট ১৭০ বল খেলে করেছেন ২৮০ রান। সর্বোচ্চ অপরাজিত ৬২। তিনটি অর্ধশতরান রয়েছে। স্ট্রাইক রেট ১৬৪.৭০।

অকুতোভয় ব্যাটার। বোলারের নাম দেখে নয়, বলের মান দেখে শট নির্বাচন করেন। কেকেআরের বিরুদ্ধে কার্তিক ত্যাগীকে এক ওভারে দু’টি ছক্কা মেরে ইনিংসের গিয়ার বদলে ফেলেন মুকুল। পরে ক্যামেরন গ্রিনের ওভারে প্রথম দু’বলে সুবিধা করতে না পারলেও পরের তিনটি বলই বাউন্ডারির বাইরে পাঠান। তার মধ্যে দু’টি ছয়। এই দুই ওভারে কোণঠাসা লখনউকে লড়াইয়ে ফিরিয়েছিলেন মুকুল। খেলা শেষ করে মাঠ ছাড়তে পছন্দ করেন।

ব্যাটার মুকুলের সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে ফিটনেস। উইকেটরক্ষক-ব্যাটার মুকুলের আদর্শ মহেন্দ্র সিংহ ধোনি হলেও ফিটনেসের ব্যাপারে তাঁর কাছে শেষ কথা বিরাট কোহলি। বল বুঝে খেলেন। বড় শট নিতে পারেন। দ্রুত খুচরো রান নিতে পারেন। এককে দুই বা দুইকে তিন করতে পারেন। ফিটনেস নিয়ে মুকুলের খুঁতখুঁতে মানসিকতায় মুগ্ধ অস্ট্রেলীয় ল্যাঙ্গারও। লখনউ কোচ বলেছেন, ‘‘মুকুলের যে বিষয়টা আমার সবচেয়ে ভাল লাগে, সেটা হল ও দুর্দান্ত অ্যাথলিট। উইকেটের মাঝে ওর দৌড় অনবদ্য। প্রায় কোহলির মতো। ওর আর একটা ব্যাপারও দারুণ। ম্যাচ পড়তে পারে খুব ভাল। কখন কী করা উচিত বোঝে। আমাদের কয়েকটা প্রস্তুতি ম্যাচের সময় কথা বলেছিলাম মুকুলের সঙ্গে। ম্যাচ নিয়ে মুকুলের ভাবনা, কথাবার্তা শুনলে মনে হবে অন্তত ৩০০টা ম্যাচ খেলা হয়ে গিয়েছে। এতটাই পরিণত। যেমন শক্তিশালী ব্যাটার তেমনই ভাল অ্যাথলিট। আমরা সকলেই জানি, এই দুইয়ের মিশেলে কী হতে পারে। মুকুল ঠিক তাই।’’

ল্যাঙ্গারের মতে মুকুল লম্বা রেসের ঘোড়া। ভবিষ্যতে কেমন ফল হবে, তা নির্ভর করবে অধ্যবসায়, পরিশ্রম এবং আন্তরিকতার উপর। ল্যাঙ্গার বলেছেন, ‘‘মুকুল খুব বেশি ক্রিকেট খেলেনি। ওকে আমার অনেকটা টিম ডেভিড বা আন্দ্রে রাসেলের মতো মনে হয়। না, তুলনা করছি না। যেটা বলতে চাইছি, এই ধরনের ক্রিকেটারেরা ম্যাচ শেষ করে ফিরতে পারে। মুকুলের এখন পরিণত হওয়ার সময়। ক্রিকেটার হিসাবে বেড়ে ওঠার সময়। বয়স এখনও ২২ হয়নি। যথেষ্ট তরুণ। এখনই ওর চেখে সাফল্যের খিদে দেখা যায়। এমন একটা ইনিংসের পর ওর বাবা-মা এবং পরিবারের সকলে নিশ্চই গর্বিত হবেন। একটা নতুন ছেলে। প্রথম বার খেলছে। চেষ্টা করেছে এবং এমন সাফল্য পেয়েছে। ওর ক্রিকেটজীবনের জন্য এই ইনিংসটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।’’

মুকুলকে নিয়ে বলতে শুরু করে থামতেই চাইছিলেন না ল্যাঙ্গার। উচ্ছ্বাস সংযত করতে পারছিলেন না পেশাদার অস্ট্রেলীয়। ল্যাঙ্গার বলেছেন, ‘‘শেষ ৪ ওভারে আমাদের ৬৪ রান দরকার ছিল। চাপের পরিস্থিতি। কোচ তো মাঠে নেমে খেলতে পারে না। শুধু পরামর্শ দিতে পারে। মাঠের বাইরে বসে থাকাটা সহজ। তখন ভাবছিলাম, ম্যাচের পর ক্রিকেটারদের কী বলব সাজঘরে। আমরা ভাল বল করেছি। বোলারেরা পিচ ভাল ভাবে কাজে লাগিয়েছে। বোলিংয়ের পাশাপাশি ফিল্ডিংও ভাল হয়েছে। ভাবছিলাম, জয়-পরাজয় নিয়ে না ভেবে পারফরম্যান্সের উপর নজর দিতে। ইতিবাচক ভাবনা নিয়ে খেলতে। তার সঙ্গে আরও কয়েকটা লাইন যোগ করে দিল মুকুল। যেটা ভীষণ তৃপ্তির। কী ভাবে দায়িত্ব নিতে হয়, সেটা মুকুল দেখিয়ে দিল। ২১ বছরের একটা ছেলে দায়িত্ব পালন করল। দুর্দান্ত, দুর্দান্ত লড়াই।’’

ল্যাঙ্গার মনে করেন ভারতের সেরা ফিনিশার হয়ে উঠতে পারেন মুকুল। তিনি বলেছেন, ‘‘মুকুল যে ভাবে রান তাড়া করেছে, সেটা গোটা দলকে আত্মবিশ্বাসী করবে। মরসুমের শুরুর দিকেই এই ইনিংসটা আমাদের জন্য খুবই ইতিবাচক। মুকুলের উন্নতির অনেক জায়গা রয়েছে। সবচেয়ে যেটা আমার ভাললাগে সেটা হচ্ছে, ও সব সময় শিখতে চায়। ওর কয়েকটা দুর্বলতা আমার চিহ্নিত করেছি। ওর শক্তির জায়গাগুলো জানি। মুকুল কিন্তু দুর্বলতার জায়গাগুলো নিয়েই বেশি পরিশ্রম করে। অনুশীলনে কঠোর পরিশ্রমের ফল পেল। সব সময় ভাল পারফরম্যান্স করতে চায়। আরও শিখতে চায়। গত চার সপ্তাহ ধরে সমানে চেষ্টা করে যাচ্ছে।’’ তিনি আরও বলেছেন, ‘‘আমাদের স্কাউটদের কৃতিত্ব অবশ্যই রয়েছে মুকুলকে খুঁজে আনার জন্য। আগেই বললাম, শ্রীনিবাসের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ও দলের সঙ্গে অনেক দিন ধরে রয়েছে। শ্রীনিবাসের ক্রিকেট জ্ঞান দুর্দান্ত। আমার পাশে বসে থাকে। প্রায়ই বলে দেয়, এর পর কী হতে পারে। ও আমাদের কয়েক জন দারুণ ক্রিকেটার বেছে দিয়েছে।’’

মুকুলের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হলেও ল্যাঙ্গারের কিছুটা সংশয় রয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘‘ভারতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার লাইনটা ছোট নয়। অন্তত তিন-চার জন তো রয়েছে, যারা এখনই সুযোগ পেতে পারে। এ দেশে অবিশ্বাস্য সব প্রতিভা রয়েছে। একটা পর্যায়ে পৌঁছোনোর পর প্রতিযোগিতা খুব কঠিন। আর একটা বিষয়, এই পর্যায় যারা পৌঁছেছে, তারা সত্যিই ভাল মানের ক্রিকেটার। আইপিএল খেলা সহজ নয়। আগে আইপিএলে ভাল পারফর্ম করতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এখনও দূরে।’’

চাপ মুক্ত অকুতোভয় মুকুল চিন্তায় ফেলে দিতে পারেন আইপিএলের অন্য দলগুলিকে। কেকেআর ম্যাচের পরও সুযোগ কাজে লাগানোর অপেক্ষায় থাকা ২১ বছরের তরুণ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন। বিশ্বাস করেন, বোলার টানা চারটে ভাল বল করলেও, তার মধ্যে একটা সুবিধাজনক জায়গায় পাবেনই। সেই বলের অপেক্ষায় থাকেন তরুণ ক্রিকেটার। প্রতিপক্ষকে লড়াই থেকে ছিটকে দেওয়ার বল খুঁজে নেন।

LSG Rishabh Pant Virat Kohli MS Dhoni
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy