• নিজস্ব সংবাদদাতা
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

আটচল্লিশ ঘণ্টারও বেশি স্তব্ধ পরিষেবা, মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে অনড় ডাক্তাররা

old
বন্ধ আরজি করের জরুরি বিভাগ। নিমতার বাসিন্দা বছর ষাটের জয়দেব কুণ্ডুকে ফিরিয়ে নিয়ে যান আত্মীয়েরা। বুধবার। ছবি: সৌরভ দত্ত।

আটচল্লিশ ঘণ্টা পরেও সঙ্কট কাটল না স্বাস্থ্যে। বুধবার দিনভর সরকারি হাসপাতালের আউটডোরে চিকিৎসা তো হলই না, জরুরি পরিষেবা পেলেন না সঙ্কটজনক রোগীরাও। 

সমাধানসূত্র খুঁজতে এ দিন দফায় দফায় বৈঠক করেন স্বাস্থ্যকর্তারা। সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য ভবনের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দিয়ে কর্মবিরতি প্রত্যাহার করার জন্য অনুরোধ করা হয় জুনিয়র ডাক্তারদের। কিন্তু তাতে বরফ গলেনি। আন্দোলনরত চিকিৎসকেরা জানিয়ে দিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া তাঁরা কিছুতেই পিছু হটবেন না। 

ফলে চরম আতান্তরে থাকা রোগী ও তাঁদের আত্মীয়দের প্রশ্ন, এই ভোগান্তি আর কত দিন? 

এনআরএসে চিকিৎসক নিগ্রহের প্রতিবাদে এ দিন রাজ্যের সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের আউটডোর পরিষেবা বন্ধ রাখার ডাক দিয়েছিল চিকিৎসক সংগঠনের যৌথ মঞ্চ। তাতে সাড়া দিয়ে গোটা রাজ্যেই স্তব্ধ ছিল চিকিৎসা পরিষেবা। 

বুধবার সকালে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় নিমতার দুর্গানগরের বাসিন্দা, বছর ষাটের জয়দেব কুণ্ডুর। অ্যাম্বুল্যান্স জোগাড় করে দুপুরে বাবাকে নিয়ে আরজি কর হাসপাতালে পৌঁছন তাঁর ছেলে তারক কুণ্ডু। কিন্তু স্ট্রেচারে করে জরুরি বিভাগের দোরগোড়ায় পৌঁছতেই নিরাপত্তাকর্মী বললেন, ‘‘মেডিক্যাল কলেজ ছাড়া অন্যত্র নিয়ে যান!’’ তারক পাল্টা বলেন, ‘‘সামান্য কারখানায় কাজ করি। অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য কোথায়!’’ কিন্তু সেই আর্জিতে কাজ হয়নি। পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবাকে ফের অ্যাম্বুল্যান্সে তুলে অন্য হাসপাতালের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন ছেলে। 

মুর্শিদাবাদের জলঙ্গির বাসিন্দা শম্পা মণ্ডল ছেলে অর্ককে নিয়ে এসেছিলেন বিধানচন্দ্র রায় শিশু হাসপাতালে। দুপুরে অর্কের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে এনআরএসে পাঠানো হয়। সেখানে জরুরি বিভাগের সামনে অর্ককে কোলে নিয়ে শম্পা বলেন, ‘‘এতগুলো ডাক্তার। এক জনও দেখল না বলে আমার ছেলের এই অবস্থা হল!’’ 

এসএসকেএম, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ, সিএনএমসি, আর আহমেদ ডেন্টাল কলেজ— সর্বত্র একই ছবি। জেলাতেও তা-ই। 

বীরভূমের সিউড়ি জেলা হাসপাতালে আউটডোরে টিকিটঘরে গিয়ে রোগীর পরিজনদের শুনতে হয়েছে— ‘‘বৃহস্পতিবারের টিকিট চাইলে নিতে পারেন!’’ বন্ধ ছিল শিশু টিকাকরণ ইউনিটও। রঘুনাথপুর সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, মানবাজার গ্রামীণ হাসপাতাল ও জেলার ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির আউটডোর বন্ধ ছিল। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর হাসপাতাল ও বারুইপুর সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের আউটডোরে ভোর ৫টা থেকে রোগীরা টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকের দেখা মেলেনি। মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজে এ দিন বিনা চিকিৎসায় নবগ্রামের এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সারা দিনের এই সব ঘটনার কথা জেনে এনআরএসের জমায়েত স্থলে চিকিৎসক সমাজের প্রতিনিধিরাও নিজেদের মধ্যে আলোচনায় প্রশ্ন তুলেছেন, এ ভাবে আর কত দিন!

যৌথ মঞ্চ আউটডোর বন্ধের আর্জি জানালেও জরুরি বিভাগ চালু থাকার কথা বলেছিলেন। কিন্তু কলকাতার পাঁচটি মেডিক্যাল কলেজে তো বটেই , রাজ্যের অন্যত্রও প্রায় কোনও হাসপাতালেই জরুরি বিভাগে কাজ হয়নি। এ দিন এনআরএস থেকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ পর্যন্ত প্রতিবাদ মিছিল শুরু হওয়ার আগে ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরামের সভাপতি অর্জুন দাশগুপ্ত বলেন, ‘‘হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী দেখা, জরুরি অস্ত্রোপচার এবং জরুরি বিভাগ যাতে বন্ধ রাখা না হয় বিক্ষোভকারী চিকিৎসকদের কাছে সেই অনুরোধ করব।’’ অ্যাসোসিয়েশন অব হেলথ সার্ভিস ডক্টরসের তরফে সাধারণ সম্পাদক মানস গুমটা বলেন, ‘‘জরুরি বিভাগ বন্ধের ঘটনা দু’একটি জায়গায় ঘটেছে! এই নৈরাজ্যের দায়ে রাজ্য সরকারকেই নিতে হবে।’’ 

এ দিন স্বাস্থ্য ভবনে শহরের পাঁচটি মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপাল, সুপার এবং প্রতিটি কলেজের জুনিয়র ডাক্তারদের দু’জন করে প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেন স্বাস্থ্যসচিব রাজীব সিংহ। পরে নবান্নে মুখ্যসচিবের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। জোড়া বৈঠক শেষে সরকারি বিবৃতিতে এনআরএসের ঘটনাকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়, অভিযুক্ত পাঁচ জন গ্রেফতার হয়েছে। কারও জামিন হয়নি। প্রশাসনিক স্তরে সব রকম পদক্ষেপ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন। তাই বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার কোনও অর্থ নেই। মানুষের দুর্ভোগ বন্ধে দ্রুত আন্দোলনরত চিকিৎসকদের কাজে ফেরার আবেদন করা হয় ওই বিবৃতিতে। 

এনআরএস সূত্রের খবর, ওই বৈঠকের পরে এত দিন হাসপাতালে তৃণমূল চিকিৎসকদের যে অংশ আন্দোলনকে নৈতিক সমর্থন জানাচ্ছিলেন তাঁরা সুর বদলেছেন। জমায়েত স্থলের ভিড়ও কিছুটা হলেও কমেছে। তার জন্য অবশ্য জমায়েতস্থলে বিকালে সাংসদ-চিকিৎসক সুভাষ সরকারের নেতৃত্বে বিজেপি’র প্রতিনিধি দলের উপস্থিতি একটা কারণ বলে জুনিয়র চিকিৎসকদের একাংশের মত। আরেক অংশের বক্তব্য, জমায়েত তুলতে রাজ্য সরকার ‘দমন-পীড়ন’-এর পথ নিতে পারে, এ ধরনের কথা প্রচার করে বিক্ষোভকারীদের মনোবল ভাঙার চেষ্টা করা হচ্ছে। 

তবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে এ দিন রাত পর্যন্ত অনড় রয়েছেন জুনিয়র ডাক্তারেরা। আজ, বৃহস্পতিবারও পরিষেবা বন্ধ রাখা হবে বলে জানিয়ে বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, রাজ্যের সব ক’টি মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রেরা পাশে দাঁড়িয়ে আন্দোলনকে সমর্থন করেছেন। ফলে পিছু হটার প্রশ্ন নেই।
অচলাবস্থা তবে কাটবে কী ভাবে? আইএমএ রাজ্য শাখার প্রাক্তনীদের বিবৃতিতে রাজ্য সরকার এবং বিক্ষোভকারী চিকিৎসকদের আলোচনার টেবিলে বসার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আর জুনিয়র ডাক্তারেরা বলছেন, ‘‘আমাদের দাবি সামান্য। মু্খ্যমন্ত্রী ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সে জখম ছাত্র পরিবহ মুখোপাধ্যায়কে দেখতে যাবেন এবং সেখান থেকে একটি কড়া বার্তা দেবেন। মুখ্যমন্ত্রী বিদ্যাসাগরের মূর্তি উন্মোচন করছেন। বেসরকারি হোটেলের উদ্বোধনে যাচ্ছেন। আর এখানে আসতে পারছেন না!’’

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের YouTube Channel - এ।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন