টিটাগড়ের তৃণমূল নেতা সতীশ মিশ্র খুনের ঘটনায় ইতিমধ্যেই চার জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আর সেই ধৃতদের মধ্যেই রয়েছে ভোলা প্রসাদ। এলাকায় ভোলার পরিচয় বড় মাপের পরিবহণ ব্যবসায়ী হিসাবে। পুলিশের দাবি, আড়াই লাখ টাকার সুপারি দিয়ে সতীশ খুনের ব্লু-প্রিন্ট ছকেছিল সে। পুলিশের আরও দাবি, সতীশের সঙ্গে তৃণমূল কাউন্সিলর মণীশ শুক্লকেও সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার।

ভোলার পরিবহণ সংস্থায় প্রায় দুশো ট্রাক রয়েছে। এলাকায় ব্যবসায়ী হিসাবে ভালই  প্রতিপত্তি। বিভিন্ন সময়ে প্রাক্তন এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের তাবড় নেতাদের দেখা গিয়েছে ভোলার সঙ্গে। কিন্তু সরাসরি রাজনীতির ময়দানে কখনওই দেখা যায়নি তাকে। সেই ভোলা, টিটাগড়-ব্যারাকপুর এলাকার সবচেয়ে দাপুটে নেতা মণীশ এবং তাঁর ছায়াসঙ্গী সতীশকে কেন খুন করবে? সেই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে যদিও পুলিশ মুখে কুলুপ এঁটেছে।

তবে পুলিশ সূত্রেরই খবর, ভোলাকে জেরা করে উঠে এসেছে আরও বড় ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত। এই খুনের তদন্তের সঙ্গে যুক্ত এক পুলিশ আধিকারিকের ছোট্ট উত্তর,“ভোলা মুখ খুললে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে পড়বে।”

কথাটা যে অমূলক নয় তার ইঙ্গিত পাওয়া গেল ওই এলাকার এক মাঝারি মাপের তৃণমূল নেতার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে। তিনি বলেন,“ভোলা হয়তো সামনে থেকে গোটা ছকটা তৈরি করেছে। কিন্তু এটা মানা শক্ত যে, এই পরিকল্পনা শুধু ভোলার। এর পেছনে আরও বড় মাথা রয়েছে।” এই বড় মাথা যে, কোনও বড়মাপের রাজনৈতিক নেতা,তা নিয়ে সংশয় নেই ওই এলাকার তৃণমূল কর্মীদের।

নিহত সতীশ মিশ্র। 

টিটাগড় ব্রহ্মস্থানের বাসিন্দা এক তৃণমূল কর্মী বলেন, “ভোলাকে আমি দেখছি ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় বাম প্রার্থী প্রচারে আসতেই ভোলা এসে দেখা করে যায়। সেই দাপুটে সিপিএম নেতার সঙ্গে ভোলার যে বেশ ভাল সম্পর্ক ছিল তা এলাকার সবাই জানতেন।”ওই তৃণমূল কর্মীর দাবি, রাজ্যে পালাবদলের পর, একই রকম ভাবে ভোলার সঙ্গে হৃদ্যতার সম্পর্ক তৈরি হয় প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদের সঙ্গে, যিনি বর্তমানে বিজেপির নেতা। টিটাগড় পুরসভার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের এক তৃণমূল নেতা বলেন, “আসলে ভোলার ব্যবসায়ী হিসাবে প্রতিপত্তি রয়েছে। তেমনই ওর কাছে শ’পাঁচেক লোকজন কাজ করে। তাই সব দলই ভোলার সঙ্গে হৃদ্যতার সম্পর্ক রাখে।” সেই ভোলার সঙ্গে ব্যাবসা নিয়ে মণীশ এবং তাঁর সঙ্গীদের যে খুব একটা ভাল সম্পর্ক ছিল না, তা স্বীকার করছেন এলাকার সবাই। কিন্তু সেই শত্রুতার জেরে মণীশ-সতীশকে খুন করার ঝুঁকি ভোলা কেন নেবে? এই প্রশ্নের উত্তর নেই এলাকার পোড় খাওয়া পার্টি কর্মীদের কাছেও।

আরও পড়ুন: বর্বর গৃহকর্তা! অসুস্থ বৃদ্ধা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে খুঁজছেন আত্মীয়ের হাত

আর সেখান থেকেই স্থানীয় তৃণমূল কর্মীদের ধারণা, মণীশ-সতীশকে রাজনৈতিক উদ্দ্যেশেই সরিয়ে দেওয়ার ছক কষা হয়েছিল। তৃণমূলের অন্দরে মণীশ ভাটপাড়ার বিধায়ক, শিল্পাঞ্চলের‘বাহুবলী’ নেতা অর্জুন সিংহের খাস লোক  হিসাবে পরিচিত। গত কয়েক বছরে টিটাগড়-ব্যারাকপুর এলাকায় মণীশই শেষ কথা। মণীশের এই ক্ষমতার বাড়বাড়ন্ত যে দলের একাংশই ভালভাবে নিতে পারেনি, তা স্বীকার করেন মণীশ ঘনিষ্ঠরাও। যদিও প্রকাশ্যে মণীশকে নিয়ে তাঁরা কোনও মন্তব্য করতে চাননি।

তবে, তাঁর রাজনৈতিক গডফাদার অর্জুন অবশ্য এরই মধ্যে বিষয়টিকে বিজেপির ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন। কিন্তু ভোলাকে দিয়ে বিজেপি এত বড় পরিকল্পনা করবে বলে সংশয়ে তৃণমূল কর্মীরাও। তাঁদের দাবি মণীশ-সতীশকে সরিয়ে দিলে রাজনৈতিক ভাবে লাভবান হত দলেরই একটা অংশ, যাদের মুরুব্বি উত্তর ২৪ পরগনার এক শীর্ষ জেলা নেতা, যিনি নিজেও বিধায়ক। রাজনৈতিক স্বার্থেই ভোলাকে দলের মণীশবিরোধী শিবির কাজে লাগিয়েছে এমনটাই সন্দেহ তাঁদের।

আরও পড়ুন: রাস্তা আটকে চাঁদা নয়, বলছেন ছেলে-হারা মা 

তদন্তকারীদেরও একটা অংশ সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দিতে পারেননি। তাঁদের একজন বলেন,“গ্রেফতার হওয়ার পর পরই ভোলা যেভাবে জেরা এড়াতে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চলে গেল, তাতে স্পষ্ট ভোলার মুখ বন্ধ রাখার জন্য সক্রিয় অনেকেই।” তবে তদন্তকারীদের একটা অংশ বলছেন, সম্প্রতিমণীশের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে ভোলা হাজির হয়েছিল খোদ অর্জুনের দরবারে। ধীরে ধীরে মণীশের গড ফাদারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর চেষ্টা করছিল। সতীশ খুনে এই তথ্যও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। খুনের নেপথ্যে কে, তানিয়ে কিছু সংশয় থাকলেও, তৃণমূল কর্মী থেকে তদন্তাকারীরা প্রায় নিশ্চিত, ভোলা গোটা খেলায় দাবার বোড়ে, রাজা-মন্ত্রী রয়েছেন আড়ালেই।