Advertisement
E-Paper

দুবাইয়ে ইন্টারন্যাশনাল সিটিতে থাকি, পাশেই এয়ারপোর্ট, ভয়টা সেই জন্যই বেশি! গড়ফা থেকে ফোনের পর ফোন

আমি থাকি ইন্টারন্যাশনাল সিটিতে। দুবাইয়ের উপকণ্ঠে। কাছে বিমানবন্দর। একটু ভয়েই ছিলাম। বিমানবন্দর যে নিশানা হবে, তা বুঝতে বাকি ছিল না। যা ভেবেছি, হলও তা-ই।

সূর্যদেব চক্রবর্তী

সূর্যদেব চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ০১ মার্চ ২০২৬ ১৭:৫৪
ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরে দুবাইয়ের আকাশে ধোঁয়া।

ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরে দুবাইয়ের আকাশে ধোঁয়া। ছবি: রয়টার্স।

ট্রেকিং করে শনিবার দুপুরে দুবাই-আবু ধাবি রোড ধরে ইন্টারন্যাশনাল সিটিতে বাড়ি ফিরছিলাম। হঠাৎ দেখি রাস্তায় ভয়ঙ্কর যানজট। দুবাইয়ের রাস্তায় যানজট, তা-ও হয়? ঘণ্টা কাটতে চলেছে, গাড়ি নড়ে না। গাড়িতে বসেই শুনলাম বিকট শব্দ। মোবাইল খুলে দেখি, আবু ধাবিতে হামলা হয়েছে। বুর্জ খলিফার কাছেও ক্ষেপণাস্ত্র পড়েছে। সকালে মোবাইলে আসা মেসেজের কথা তখন মনে পড়ল। এয়ারস্পেস বন্ধ করা হয়েছে বলে মেসেজ এসেছিল। দুইয়ে দুইয়ে চার করলাম, এ বার তা হলে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে। এক বারের জন্য চোখের সামনে ভেসে উঠল কলকাতায় স্ত্রী-ছেলে-মেয়ের মুখ। তত ক্ষণে বাড়ি থেকে ফোন আসতে শুরু করেছে। নিজেও ভয় পেয়েছি। ভয় পেয়েছি বিমানবন্দরের কাছে থাকি বলে।

দুবাইয়ে শনি এবং রবিবার ছুটি থাকে। শনিবার ভোরে তাই আবু ধাবির কাছে ট্রেকিংয়ে গিয়েছিলাম। ঠিক ১০টার সময়ে মোবাইলে একটা মেসেজ আসে। তাতে লেখা, এয়ারস্পেস বন্ধ করা হল। তখন ওটা নিয়ে আর খুব বেশি ভাবিনি। ট্রেকিংয়ে ব্যস্ত ছিলাম। দুপুরে দুবাই-আবু ধাবি রোড ধরে ফেরার সময় টের পেলাম কী চলছে দুবাইয়ে, পশ্চিম এশিয়ায়। তখন ঘড়িতে আড়াইটে। এক ঘণ্টা কেটে গিয়েছে, দুবাই-আবু ধাবি রোডে দাঁড়িয়ে রয়েছে গাড়ি। যত দূর চোখ যায়, শুধু গাড়ি আর গাড়ি। উসখুস করছি। খবর দেখছি মোবাইলে। বুঝতে পারলাম এখানে ইরান হামলা করছে। আবু ধাবিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। বুর্জ খলিফার কয়েকশো মিটার দূরে পড়েছে আগুনের গোলা! এ-ও হয়! শেষে কি না দুবাইয়ে মিসাইল! গাড়িতে বসে বিকট একটা শব্দও পেলাম। রাস্তাটা নড়ে উঠল যেন। ভূমিকম্প! না, কিন্তু মনে হল সে রকমই।

আমি থাকি ইন্টারন্যাশনাল সিটিতে। দুবাইয়ের উপকণ্ঠে। কাছে বিমানবন্দর। তাই একটু ভয়েই ছিলাম। বিমানবন্দর যে নিশানা হবে, তা বুঝতে বাকি ছিল না। কারণ, দুবাই বিমানবন্দরের ক্ষতি হলে পশ্চিম এশিয়া, ইউরোপ, এমনকি আমেরিকায় যাতায়াতকারী বিমানের পরিষেবা স্তব্ধ হয়ে যাবে। যা ভেবেছি, হলও তা-ই।

শনিবার রাত তখন ৮টা। নিজের ঘরে বসে আছি। হঠাৎ বিকট আওয়াজ! দরজা, জানলা কেঁপে উঠল। একবার মনে হল, দরজায় কে যেন ধাক্কা দিচ্ছে। এত ভয়ঙ্কর শব্দ এখনও পর্যন্ত ওই একবারই পেয়েছি। পরে জানলাম, দুবাই বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল ইরান। তা প্রতিরোধ (ইন্টারসেপ্ট) করেছে আরব আমিরশাহির প্রযুক্তি। আর সেই প্রতিরোধের কারণে তৈরি হয়েছে বিকট শব্দ। খুব কাছেই তা হয়েছিল বলে কেঁপে উঠেছিলাম। আরব আমিরশাহি প্রশাসন বলছে, রবিবার সকাল পর্যন্ত ২০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। ১৭৫টি প্রতিরোধ করা হয়েছে। মাটিতে আছড়ে পড়েছে ১৫টির মতো। বাকি ১০টির হিসাব নেই। প্রশাসনও স্পষ্ট করেনি।

দুবাই মারিনায় যাঁরা থাকেন, তাঁরা বলছেন অন্য কথা। আমার এক সহকর্মী জানালেন, শনিবার সকাল থেকে রবিবার সকাল পর্যন্ত ২০ থেকে ২৪ বার বিকট শব্দ শুনেছেন। বাচ্চা এবং পোষ্যেরা ঘরের কোণে বসে রয়েছে। বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই জোরালো ছিল যে, মারিনা এলাকায় দু’বার বহুতল আবাসন ছেড়ে লোকজনকে পথে নেমে আসতে হয়েছে। সে রকমই করতে বলা হয়েছে তাঁদের। ক্ষণে ক্ষণে মোবাইলে বেজে উঠছে অ্যালার্ট। রাতে ঘুমাতে পারেননি মারিনা, ফুর জান এলাকার লোকজন। দুবাইয়ের মারিনা এলাকা, ডাউনটাউনেই মূলত ক্ষেপণাস্ত্র ফেলছে ইরান। সেখানে রয়েছে বহুতল, শপিং মল, বিলাসবহুল হোটেল। রয়েছে দুবাই মল, বুর্জ খলিফা। তাই ওখানেই আঘাত করতে চাইছে ইরান। এ দেশের প্রশাসন সে রকমই মনে করছে বলে শুনছি। দিনরাত মিসাইল ইন্টারসেপ্ট করা চলছে। তার পরেও মাটিতে আঘাত হেনেছে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি ক্ষেপণাস্ত্র।

শনিবার রাতে বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা বলে শুয়েছি। কলকাতায় বসে ওরা চিন্তা করছে। যতটা পেরেছি বুঝিয়েছি যে, ভয় নেই। নিজেকে আর বোঝাতে পারিনি। ভয় নিয়েই ঘুমোতে গিয়েছিলাম। রাত তখন প্রায় দেড়টা। মোবাইলে বাজল মেসেজ ঢোকার রিংটোন। সতর্ক করে মেসেজ এসেছে। তাতে লেখা, ‘নাগরিক, বাসিন্দা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তাকেই অগ্রাধিকার দেয় আরব আমিরশাহি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই আছে। কর্তৃপক্ষ প্রস্তুতি নিয়ে দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন। আপনার নিরাপত্তা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ঘরে থাকুন। সরকারি নির্দেশিকার জন্য অপেক্ষা করুন। সরকারি তথ্যেই ভরসা রাখুন।’ পরে ভোরের দিকে আবার এসেছে সেই মেসেজ। ভয় পেয়েছি।

মেসেজ পেয়ে বুঝলাম, আবার মারিনায় ক্ষেপণাস্ত্র পড়ছে। রবিবার সকালে ৭টা নাগাদ ফের সেই বিকট শব্দ পেলাম। আমার দরজা, জানলা কেঁপে উঠল। আমি একতলায় থাকি, তাই বাড়ি কেঁপেছে কি না বুঝিনি। তবে সেই শব্দ শনিবার রাতের মতো ছিল না। অফিসের লোকজনের থেকে জানতে পারলাম, আবার দুবাই বিমানবন্দর নিশানা করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল ইরান। তা প্রতিরোধ করেছে আরব আমিরশাহি। তার পরেই অফিস থেকে ইমেল পেলাম। বুধবার পর্যন্ত বাড়ি থেকেই কাজ করতে হবে। বুধবার পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়। তার পরে কী হবে, তা পরে জানানো হবে।

আমার এখানে সাইরেন বাজছে না। লোকজন দরকারে রাস্তায় বেরোচ্ছেন। গাড়িও চলছে, তবে কম। মারিনা, ডাউনটাউন, ফুর জান এলাকার ছবি কিন্তু আলাদা। সেখানে ঘন ঘন সাইরেন বাজছে। সেই সঙ্গে বাসিন্দাদের মোবাইলে সতর্ক করে মেসেজ পাঠাচ্ছে সরকার। ওখানকার বাসিন্দাদের বাইরে বেরোতে বারণ করা হয়েছে। জানলার ধারে, ছাদে যেতেও বারণ করা হয়েছে। রাস্তা প্রায় শুনশান। দুবাইয়ে প্রায় দু’বছর ধরে আছি। এই ছবি দেখিনি। যাঁরা কয়েক দশক ধরে রয়েছেন, তাঁরাও দেখেননি। এ রকম যে হবে, কোনও দিন ভাবতেই পারেননি। বুধবার পর্যন্ত বাড়ি থেকে কাজ করতে বলেছে প্রশাসন। তার মধ্যেই কি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে? মনে আশা জাগছে। আবার মনে হচ্ছে, অনির্দিষ্ট কালের জন্য ওই নির্দেশ জারি হয়ে যাবে না তো!

(লেখক ইউনিভার্সিটি অফ দুবাই-এর মহম্মদ বিন রশিদ স্পেস সেন্টার ল্যাবে কর্মরত।)

UAE
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy