E-Paper

উধাও লক্ষ লক্ষ টাকা, ডাক্তারদের ভাতা নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ নীলরতনে

অভিযোগ, সরকারি নিয়ম এবং নির্দেশকে অগ্রাহ্য করে ওই মেডিক্যাল কলেজে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সিনিয়র রেসিডেন্ট চিকিৎসকদের নির্ধারিত মাসিক ভাতা থেকে ১০ হাজার টাকা করে কম দেওয়া হয়েছে!

পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৭ মে ২০২৬ ০৮:৪৯
নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। —ফাইল চিত্র।

সরকারি চিকিৎসকদের মাসিক ভাতা নিয়ে তৃণমূল জমানায় লক্ষ লক্ষ টাকার আর্থিক দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠল নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

অভিযোগ, সরকারি নিয়ম এবং নির্দেশকে অগ্রাহ্য করে ওই মেডিক্যাল কলেজে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সিনিয়র রেসিডেন্ট চিকিৎসকদের নির্ধারিত মাসিক ভাতা থেকে ১০ হাজার টাকা করে কম দেওয়া হয়েছে! অথচ, সরকার-নির্ধারিত বেতনই তাঁরা পেয়েছেন, এই মর্মে প্রতি মাসে ওই চিকিৎসকদের অ্যাকাউন্টস বিভাগের খাতায় সই করানো হয়েছে। প্রায় ২০ জন সিনিয়র রেসিডেন্টের ভাতা থেকে প্রতি মাসে কেটে নেওয়া ১০ হাজার করে টাকা কোথায় গেল, তার হদিস নেই!

এত দিন ওই হাসপাতালে তৃণমূলপন্থী কর্মী ও চিকিৎসকদের ভয়ে এবং চাপে সিনিয়র রেসিডেন্টরা মুখ খুলতে পারেননি বলে দাবি। কিন্তু বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই স্বাস্থ্য দফতরে এবং মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন নীলরতনের হেমাটোপ্যাথলজি বিভাগের এক মহিলা সিনিয়র রেসিডেন্ট। বাকি সিনিয়র রেসিডেন্টরাও তাঁকে সমর্থন করে অভিযোগ সত্য বলে জানিয়েছেন। এর পরেই হাসপাতালের অ্যাকাউন্টস অফিসার অতীগ চক্রবর্তী ছুটিতে চলে গিয়েছেন। তিনি ফোনে দাবি করেন, আয়কর বাবদ ওই টাকা কাটা হয়েছে। তা হলে অন্য মেডিক্যাল কলেজ তা কাটে না কেন? অতীগ বলেন, ‘‘সেটা ওদের সঙ্গে কথা বলে দেখতে হবে।’’ তাঁর আরও দাবি, সিনিয়র রেসিডেন্টরা যে টাকা পান, সেটা ভাতা নয়, বেতন। অথচ, অ্যাকাউন্টে টাকা ঢোকার পরে সিনিয়র রেসিডেন্টরা যে ‘অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট’ পান, সেখানে লেখা থাকে ‘স্কলারশিপ অ্যান্ড স্টাইপেন্ড’। কোন নিয়মে ৮৫ হাজারের উপরে ১০ হাজার টাকা আয়কর কাটা হতে পারে, উঠেছে সেই প্রশ্নও। এই দুর্নীতি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করে নীলরতনের অধ্যক্ষা ইন্দিরা দে পাল বলেন, ‘‘বিষয়টি এত দিন কেউ আমাকে জানাননি। এখন জানলাম। অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে।’’

আর জি কর-কাণ্ডের পরে সিনিয়র রেসিডেন্টদের ভাতা বাড়িয়েছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘চিকিৎসার আর এক নাম সেবা’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে মমতা ওই ঘোষণা করেন। তার পরে ওই বছরের ২১ মার্চ একটি নির্দেশিকা জারি করে তাতে সিলমোহর দেয় স্বাস্থ্য দফতর। জানানো হয়, স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমাধারী সিনিয়র রেসিডেন্টদের ভাতা মাসে ৬৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৮০ হাজার টাকা, স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী সিনিয়র রেসিডেন্টদের ভাতা ৭০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৮৫ হাজার টাকা এবং পোস্ট ডক্টরাল সিনিয়র রেসিডেন্টদের ভাতা ৭৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লক্ষ টাকা করা হল। ১ এপ্রিল থেকে নতুন ভাতা চালু হবে বলে জানানো হয়। একমাত্র নীলরতনেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী সিনিয়র রেসিডেন্টদের অ্যাকাউন্টসের খাতায় ৮৫ হাজার টাকা বেতন পাচ্ছেন বলে সই করিয়ে ৭৬৩০০ টাকা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ!

অভিযোগকারী সিনিয়র রেসিডেন্টের কথায়, ‘‘গত জানুয়ারি মাসে নীলরতনে কাজে যোগ দিয়েছি। আমার অ্যাকাউন্টে ৮৫ হাজারের বদলে ৭৬ হাজার টাকা জমা পড়ায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, আমাদের মতো সকলেই কম টাকা পাচ্ছেন। কিন্তু তৃণমূলের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে পারেন না। অ্যাকাউন্টস ম্যানেজারের কাছে কারণ জানতে চাইলে উনি বলেন, আয়কর কাটছে! অথচ, কোনও কাগজ বা স্যালারি স্লিপ তিনি দেখাতে পারেননি। তা ছাড়া, ভাতা বা স্টাইপেন্ডে আয়কর কাটা হয় না।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘শুধু নীলরতনের সিনিয়র রেসিডেন্টদের ভাতা থেকেই কেন ১০ হাজারটাকা কাটা হচ্ছে? কেন ন্যাশনাল মেডিক্যাল, সাগর দত্ত, এসএসকেএম বা অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে তা হচ্ছে না, এই প্রশ্নের কোনও জবাব কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দিতে পারেননি। প্রতি মাসে সকলের ভাতা থেকে কাটা মোট প্রায় আড়াই থেকে তিন লক্ষ টাকা কোথায়, কী ভাবে চলে যাচ্ছে, সেটাও রহস্য!’’

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম বলেন, ‘‘বিষয়টি জানতাম না। খতিয়ে দেখব।’’ রাজ্যের স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা ইন্দ্রজিৎ সাহা ফোন ধরেননি। সহ স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা আশিস বিশ্বাস বলেন, ‘‘এটা স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তারই দেখার কথা। তবে সরকার-নির্ধারিত ভাতা না দেওয়া গর্হিত অপরাধ। কেউ এত দিন অভিযোগ করেননি। এটা হয়ে থাকলে দফতর নিশ্চয়ইব্যবস্থা নেবে।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

NRS Medical College and Hospital financial corruption

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy