E-Paper

দল ভাঙার ‘ঔদ্ধত্য’ও এগিয়ে দিয়েছে হার

এসআইআর চলাকালীন ভোটাধিকার নিয়ে রাজ্যব্যাপী আন্দোলনে নেমে পড়লেও গত দেড় দশকে জনমতকে উপেক্ষা করে দলের শাসন প্রতিষ্ঠার অসংখ্য অভিযোগও ছিল তৃণমূলের বিরুদ্ধে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৭ মে ২০২৬ ০৮:৪০

—প্রতীকী চিত্র।

কলকাতা থেকে বেশি রাতেই ফোন গিয়েছিল কৃষ্ণনগরে। জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্তার কাছে আবদারের সুরে নির্দেশ ছিল— ‘নদিয়া জেলা পরিষদ আমাদের চাই। যা দরকার করতে হবে’! শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের সেই অলিখিত নির্দেশ মতো কাজ হয়েছিল রাজ্য প্রশাসনে।

পঞ্চায়েত ভোটের ওই রকমই এক রাতে বাড়ি ঘিরে আচমকা বোমাবাজি শুরু হওয়ায় অবাক হয়েছিলেন কংগ্রেসের এক বিধায়ক। পর দিন জেলাশাসককে ফোন করে রাগত ভাবে জানিয়েছিলেন সে কথা। জবাবে শুনেছিলেন, জেলাশাসক বলছেন, জেলা পরিষদের যে তিনটি আসনে কংগ্রেস প্রার্থী দিয়েছে, তার দু’টি থেকে সরতে হবে। তাঁর দলকে একটি আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেওয়া হবে। তা হলে অশান্তি হবে না!

এসআইআর চলাকালীন ভোটাধিকার নিয়ে রাজ্যব্যাপী আন্দোলনে নেমে পড়লেও গত দেড় দশকে জনমতকে উপেক্ষা করে দলের শাসন প্রতিষ্ঠার এমন অসংখ্য অভিযোগও ছিল তৃণমূলের বিরুদ্ধে। দলের একাংশের ধারণা, স্থানীয় প্রশাসনের ভোটে জনমত ‘লুট’ এবং বিধানসভা ও লোকসভায় নির্বাচিতদের দলবদল করিয়ে শাসক দল যে ভাবে দখলদারির রাজনীতি করেছে, তাতে সাধারণ মানুষের মনে বিপুল ক্ষোভ ছিল। এ বার বুথে বুথে তারও বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। শহরাঞ্চলে আগে থেকেই এই ধাক্কা স্পষ্ট হতে শুরু করলেও এ বার গ্রামীণ এলাকাতেও সেই প্রভাব ছিল বলে মেনে নিচ্ছেন দলের বড় অংশ। তৃণমূলের এক নেতার কথায়, ‘‘রাজ্যে ক্ষমতায় আসার বছর দুয়েকের মধ্যেই এই প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন তৎকালীন দলীয় নেতৃত্ব। রাজ্যে ২০১৩ সালের পঞ্চায়েত ভোটেই একচেটিয়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা শুরু হয় ঝড়ের গতিতে।’’

দলের একাংশের দাবি, ২০১৮ সালের পঞ্চায়েতের ভোটের সময়ে জেলা পরিষদ স্তরে ‘টাকা দিয়ে প্রার্থী’ হওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। সেই কারণে জয় নিশ্চিত করতে গিয়ে ছাপ্পা ভোটকে সাধারণ পথ হিসেবে বেছে নেন অনেক প্রার্থী। এই একই ঘটনা পরবর্তী কালে ছড়াতে থাকে কলকাতা-সহ অন্যান্য পুরভোটেও। সকলে নন, তবে যাঁরা ওই পথে মনোনয়ন পেয়েছিলেন, তাঁরা হারের ‘ঝুঁকি’ এড়াতে চেয়েছিলেন।

ঘরোয়া আলোচনায় তৃণমূল নেতাদের অনেকেই বলছেন, প্রশাসনের সব স্তরে বিরোধীহীন করার প্রক্রিয়া দলেরই বিপদ ডেকে এনেছে। এক নেতার কথায়, ‘‘বাম আমলে পুরসভা ও পঞ্চায়েতের নানা স্তরে বিরোধী কংগ্রেস ছিল। মুর্শিদাবাদ, মালদহ-সহ একাধিক জেলা পরিষদও চালিয়েছে কংগ্রেস, পরে কিছু জেলায় তৃণমূলও। কিন্তু আমরা শাসক-বিরোধী জনমতকে সেই জায়গা দিইনি। একটু একটু করে তা এক জায়গায় জড়ো হয়েছে।’’ তাই এ বারের ভোটে দলের কাছেই অবিশ্বাস্য, এমন অনেক কেন্দ্রে হেরে গিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা। নেতাদের একাংশের মতে, বহুদলীয় ব্যবস্থায় বিরোধী পরিসর কমিয়ে আনার ফলে বিরোধী জনমত কমেনি, বরং এক ছাতার তলায় জমা হয়েছে। এ বার পূর্ণশক্তিতে তা নিজেদের দিকে নিতে পেরেছে বিজেপি। যাঁর হাত ধরে এই দলবদলের অনেকটাই সম্পূর্ণ হয়েছিল, সেই শুভেন্দু অধিকারী বিরোধী শিবিরে নেতৃত্বে থাকায় গোটা বিষয়টিকে গুছিয়ে নিতে সুবিধাই হয়েছে তাদের।

বাম-শাসনে দল ভাঙানোর এই রাজনীতি হয়নি। তৃণমূলের দ্বিতীয় সরকারের আমলে এই প্রক্রিয়ায় চলে আসেন বিধায়কেরাও। নানাআইনি ফাঁকের সুযোগ নিয়ে বিরোধী প্রতীকে বিজয়ী বিধায়কদের দলে এনেছে তৃণমূল। দলবদল করে বিধায়ক-পদে ইস্তফা না-দিয়েই তাঁরা থেকে গিয়েছেন বহু দিন। রাজনৈতিক যোগাযোগ তো বটেই, বিরোধী দলের প্রতীকে নির্বাচিত এক বিধায়ককে তো দলবদলের জন্য কার্যত বাধ্য করেছিলেন এক পুলিশ সুপার! প্রাথমিক ভাবে ওই বিধায়ক রাজি না-থাকলেও সেই চাপের সামনে তাঁকে আত্মসমর্পণ করতে হয়।

জনমত অস্বীকারের এই ‘ঔদ্ধত্য’ নিয়ে ভিন্ন সুর ছিল তৃণমূলের অন্দরেও। কিন্তু এতে সর্বোচ্চ নেত্রীর সায় থাকায় সেই আপত্তি নিয়ে এগোননি কেউই। ফলে দলের পথ বদল হয়নি। অনেকেরই মত, তা করলে বিরোধী ভোট এ ভাবে একমুখী না-ও হতে পারত।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

TMC

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy