বাবার বেধড়ক মারের দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে দুই ছোট ভাই শিবরাজ (৭) ও সিদ্ধার্থকে (৫) নিয়ে পালিয়েছিল ১৩ বছরের প্রিয়া। মধ্যপ্রদেশের সাতনার দুই ভাইকে চার বছর আগে হাওড়া স্টেশন থেকে উদ্ধার করে কলকাতার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। দু’জন এখন কলকাতার একটি নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছাত্র। তাদের দিদি নিখোঁজ। এত দিনে খোঁজ মিলেছে তাদের বাবা-মায়ের। কিন্তু ফেরত নিয়ে যাওয়ার পালা শুরু হতেই বেঁকে বসেছে দুই ভাই।
পুলিশ সূত্রে খবর, এই তিন ভাই-বোনের খোঁজে সিবিআইও হন্যে হয়ে ঘুরেছে এত দিন ধরে। শেষ পর্যন্ত সাতনার ধর্মেন্দ্র সিংহ তাঁর দুই ছেলের খোঁজ পেলেন কলকাতার কেষ্টপুরের চণ্ডিবেড়িয়ার এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রধান প্রদীপ মণ্ডলের কাছ থেকে। কিন্তু এখন বাবা-মাকে দেখার ইচ্ছে হলেও তাঁদের সঙ্গে বাড়ি ফিরতে নারাজ দুই ভাই। এখানকার স্কুল খুবই প্রিয় তাদের। শিবরাজ এ বার প্রথম হয়ে ক্লাস ফোরে উঠেছে। তার ছোট ভাইও ফার্স্ট। তারা থাকতে চায় আশ্রমেই।
কী হয়েছিল চার বছর আগে?
রাজ্য সরকারের নারী ও শিশুকল্যাণ বিভাগের চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির অনুমোদিত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রধান প্রদীপবাবু জানালেন, হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশনে তাঁদের সংস্থা পথশিশুদের খাবার ব্যবস্থা করে প্রতি দিন। খাবার দিতে গিয়েই ২০১০-এ মে মাসের ১০ তারিখ তাঁদের চোখে পড়ে তিনটি শিশু একটি দূরপাল্লার ট্রেন থেকে নেমে হাওড়া স্টেশনে বসে পড়েছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে ১৭-১৮ বছরের এক অন্ধ তরুণ। স্বেচ্ছাসেবী কর্মীদের সন্দেহ হতে তাঁরা জিআরপি-কে খবর দেন। সংস্থার কর্মীদের দাবি, শিশুদের জিজ্ঞাসা করলে প্রিয়া বলে তারা একটি অজানা স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছিল। সেখানে এই অন্ধ তরুণ তাদের খাবার দেয়। তার পর তার সঙ্গেই তিন জন ভুল ট্রেনে চেপে হাওড়া চলে আসে। পুলিশ ওই তিন শিশুর দেখাশোনার ভার একটি স্বেচ্ছাসবী সংস্থাকে দিতে চাইলে কিশোরীটি জানায়, অন্ধ যুবকটি গোমো স্টেশনের কাছে তাদের বাড়ির পাশেই থাকে। তার সঙ্গে সে বাড়ি ফিরে যেতে চায়। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর দুই ভাই তখন কোনও কথা বলেনি। এর পরে প্রিয়া ও অন্ধ তরুণ অদৃশ্য হয়ে যায়। দুই ভাইকে নিয়ে আসেন প্রদীপবাবুরা।
তিনি বলেন, “আমরা পথশিশুদের নিয়ে প্রধানত তিনটি কাজ করি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন, নিরাপদ আশ্রয় দান এবং তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।” এই পদ্ধতি ধরে দুই ভাইকে নিরন্তর জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের পরিবারের খোঁজে বহু জায়গায় ঘোরেন সংস্থার কর্মীরা। তিনি বলেন, “গত ফেব্রুয়ারিতে আচমকাই সাতনার নাম করে বড়ভাই শিবরাজ। সেই সূত্র ধরে খুঁজে পাই ওদের বাবা ধর্মেন্দ্র সিংহকে।”
সিবিআই-এর পক্ষ থেকে মুখ্য জনসংযোগ অফিসার কাঞ্চন প্রসাদ জানান, ওই শিশুরা নিখোঁজ হয় ২০১০-এর ২ এপ্রিল। তাদের বাবা প্রথমে পুলিশের কাছেই যান। কিন্তু এক বছর অপেক্ষার পরেও সন্তানদের হদিস না পেয়ে তিনি হাইকোর্টে অভিযোগ করেন পুলিশেরই বিরুদ্ধে। এর পরে প্রথমে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁরা গত বছর ৮ মার্চ তদন্ত শুরু করেন। তার পরে ১৭৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে, এমনকী কয়েক জন স্থানীয় পুলিশ ও সন্দেহজনক ব্যক্তির উপরে পলিগ্রাফ পরীক্ষাও করায় সিবিআই। তবুও খোঁজ মেলেনি। তিন শিশুর খবর দিলে মোট দেড় লক্ষ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করা হয় এর পরে। অবশেষে কলকাতার শিশু আশ্রমের প্রধান খোঁজখবর করে সাতনায় পৌঁছনোর পরে সিবিআই জানতে পারে শিশুদের হদিস।
কিন্তু তারা পালিয়েছিল কেন? কিছু মনে আছে? দুই ভাই এ বিষয়ে নিশ্চুপ। কে কে আর বেশ কয়েকটি খেলায় হেরে যাওয়ায় আইপিএলে চেন্নাই সুপার কিংসকে সমর্থন করছে শিবরাজ। ছোট জন আবার উল্টো, কলকাতার দলের সঙ্গ ছাড়তে নারাজ। তারা ‘জয় হো’ সিনেমা দেখেছে। দুই ভাই একে অপরের গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে। চার বছর আগে রেলস্টেশনে তাদের যে ছবি তোলা হয়, আর এখনকার ছবির মধ্যে এতই ফারাক যে নিজেরাই তা দেখে শিউরে ওঠে। তাই পুরনো সব ছবির অ্যালবাম সরিয়ে রেখেছেন আশ্রম কর্তৃপক্ষ।
এশিয়ান সহযোগী সংস্থা ইন্ডিয়া’র (আসসি)-র কেষ্টপুরের ওই আশ্রমে তাদের সঙ্গে থাকত ১৩ বছরের একটি ছেলেও। দু’বছর ধরে খোঁজ করার পরে তার মা এসে নিয়ে যান গত মাসে। এর পর থেকে শিবরাজের মনে হচ্ছে এক বার সাতনায় বাড়ি গিয়ে বাবা-মাকে দেখে এলে ভালই হয়। সে বলে, “আমি ভাইকে বলছি, কিন্তু ও রাজি হচ্ছে না। আমি যেতে চাই। কিন্তু দেখেই ফিরে আসব। থাকব না। এখানে অনেক ভাল। এখানে স্কুলে কত বন্ধু আছে। কেউ মারে না। খারাপ কথা বলে না।”
কিন্তু শিশু আশ্রমের প্রধান প্রদীপবাবু বলেন, “বাচ্চাদের কিছু বলতে পারছি না। কিন্তু ওদের রেখে দেব কী করে! ওরা তো অনাথ নয়। আজ না হোক কাল ওদের ফেরত পাঠাতেই হবে। ”