আর্থিক সমস্যায় ধুঁকতে থাকা উত্তরবঙ্গের সর্ব বৃহৎ দুধ সরবরাহকারী সংস্থা হিমূলকে ‘চাঙ্গা’ করা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ভোটের মরসুমেই ওয়েস্টবেঙ্গল মিল্ক ফেডারেশনের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর দেবব্রত চক্রবর্তীর সঙ্গে ‘মাদার ডেয়ারি’র প্রতিনিধি হিমূল পরিদর্শন করে গিয়েছেন।
হিমূল সূত্রের খবর, মাটিগাড়ার খাপরাইল এলাকার হিমূলের কারাখানা, দফতর থেকে শুরু করে শিলিগুড়ির চম্পাসারি রেগুলেটেড মার্কেট লাগোয়া পশুখাদ্যের কারখানাটিও ঘুরে দেখেছেন। সেই সঙ্গে হিমূলের নথিপত্রও তাঁরা খতিয়ে দেখেছেন। তবে মাদার ডেয়ারির সঙ্গে যৌথ ভাবে হিমূলকে বাঁচানোর চেষ্টা হবে, না হিমূলকে পুরোপুরি ওই সংস্থার হাতে তুলে দিয়ে পুনরুজ্জীবনের পথে হাঁটার চেষ্টা হবে, তা ভোটের পর নতুন রাজ্য সরকার এসে ঠিক করবে। হিমূলের চেয়ারম্যান তথা জেলাশাসক অনুরাগ শ্রীবাস্তব বা কার্যনিবার্হী আধিকারিক ইউ স্বরূপ নির্বাচনী বিধি লাগু থাকায় বিষয়টি নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। মাদার ডেয়ারির তরফেও এখনই কেউ কোনও মন্তব্য করতে চাননি।
হিমূলের এক শীর্ষ স্তরের অফিসার জানিয়েছেন, গত ১-২ বছর ধরেই হিমূলের পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন সময় এককালীন অনুদান বা প্রতি মাসে ওয়ার্কিং ক্যাপিটল দিয়ে সংস্থাকে চালানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সংস্থার পুরো খোলনলচে বদল দরকার। তার জন্য যৌথ উদ্যোগ বা সংস্থাকে পুরোপুরি কারও হাতে তুলে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। মাদার ডেয়ারি হিমূলকে নিয়ে উৎসাহ দেখিয়েছে। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্ত ভোটের পরেই হবে। তা হলে হিমূল আবার পুরানো গৌরব ফিরে পেতে পারে।
সরকারি সূত্রের খবর, হিমূল এখন প্রায় ১৩ কোটি ৯১ লক্ষ টাকার মতো দেনায় দায়ে ডুবে রয়েছে। কর্মীদের বকেয়া, পঞ্চম পে কমিশন, ডিএ মেটানো সম্ভব নয় বলেও কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গিয়েছে। আর্থিক সমস্যায় থাকা হিমূলের আর্থিক পরিস্থিতি জানতে কয়েক মাস আগে রিপোর্ট তৈরির নির্দেশ দিয়েছিল রাজ্য সরকার। সেই রিপোর্ট ভোটের আগেই সরকারের কাছে জমা পড়েছে। সেখান থেকেই সংস্থার স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি এবং দেনা সব মিলিয়ে কী করা হবে, তা ঠিক করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। প্রথমে কোনও বেসরকারি হাতে দেওয়ার কথাও ভাবা হয়। এর মধ্যেই মাদার ডেয়ারির নাম উঠে আসে।
হিমূলের কয়েকজন অফিসার জানান, হিমূলের কর্মী সংখ্যা বর্তমানে ৯৮ জন। প্রতি মাসেই কর্মীদের একাংশ অবসর নেওয়ায় সংখ্যা কমছে। তবে কর্মীদের বেতন ছাড়াও অবসরপ্রাপ্তদের বড় অংশের পিএফ, গ্র্যাচুইটি মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। সেখানে নতুন সংস্থা হিমূলের দায়িত্ব নিলে ঠিক কী ভাবে নেবেন, তাই নতুন সরকারের আসার পর চূড়ান্ত রূপ নিতে পারে। তবে কর্মীদের রেখে, বকেয়া মিটিয়ে নতুন করে বিনিয়োগ করে হিমূলকে চাঙ্গা করার পথে যাতে নতুন সংস্থা হাঁটে, সেই চেষ্টাই করা হচ্ছে। সংস্কার, বকেয়া, নতুন মেশিন-সহ সব মিলিয়ে অন্তত ২০-৩০ কোটি টাকা প্রথম দফায় বিনিয়োগ হলেই হিমূল পুরানো রূপ ফিরে পাবে।
হিমূল সূত্রের খবর, বাম আমলেই ধুঁকতে শুরু করে হিমূল। তৃণমূল সরকারের আমলে একই দশা ছিল। রোজ ১ লক্ষ লিটার দুধ প্যাকেটজাত করার উৎপাদন ক্ষমতা ছিল হিমূলের। কিন্তু উৎপাদন এখন ১১-১২ হাজার লিটারে নেমে এসেছে। বর্তমানে বিহারের বারউনি থেকেই মূলত দুধ আসছে। পাহাড় এবং শিলিগুড়ি মহকুমার গ্রামীণ এলাকা থেকেও কিছু কিছু দুধ আসছে। এর সঙ্গে গরম পড়তে টকদই, লস্যিও বাজারে এক বছর পর আনা হয়েছে। সেই সঙ্গে বিহারে কয়েকটি সংস্থার সঙ্গে পশুপাদ্যের চুক্তিও করছে হিমূল। এতে সংস্থা কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে কর্মীদের বেতন এবং পুরানো বকেয়া মেটানো শুরু হয়েছে।
যদিও মাঝে পিএফের টাকা না মেটানোয় সংস্থার পাঁচটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও সিল করে দেন পিএফ কতৃর্পক্ষ। টাকা মিটিয়ে ধীরে ধীরে সেগুলি খোলার প্রক্রিয়াও চলছে। এই অবস্থায় ১৯৭৪ সালে ন্যাশনাল ডেয়ারি ডেভলপমেন্ট বোর্ডের তৈরি মাদার ডেয়ারি দায়িত্ব নিয়ে সংস্থার অবস্থার পরিবর্তন করবে কি না, তাই এখন হিমূলের অন্দরে জোর আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।