ব্যবধান ন’বছরের। দু’টি দল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন তিনি। কিন্তু সেই তিনিই দেখালেন, বহিষ্কার তাঁকে সংসদীয় রাজনীতিতে ‘নেতা’ হওয়া থেকে আটকাতে পারেনি। ২০১৭ সালে সিপিএম থেকে বহিষ্কারের পর কয়েক বছর ‘দলহীন’ থেকে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। ২০২৬ সালের জুনের গোড়ায় তৃণমূল থেকে বহিষ্কারের পরে তৃণমূলকেই চুরমার করে দিলেন তিনি। পেয়ে গেলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতিও। তিনি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।
নানা অভিযোগে সিপিএম তাঁকে বহিষ্কার করার পরে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন ঋতব্রত। বলেছিলেন, ‘‘নাড়ির টান ছেঁড়ার যন্ত্রণা!’’ সই-কাণ্ডের কথা বিধানসভার স্পিকারকে জানানোর বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্যে বলে দেওয়ার পরই তাঁকে বহিষ্কার করে তৃণমূল।
কিন্তু এ বার চোখের কোণে জল তো দূরের কথা, গত কয়েক দিন ধরে নাওয়াখাওয়া ভুলে কালীঘাট এবং ক্যামাক স্ট্রিটকে বাদ দিয়ে পরিষদীয় দলে নিয়ন্ত্রণ রাখার ‘খেলা’ চালিয়ে গিয়েছেন তিনি। বুধবার প্রমাণ করে দিয়েছেন, তিনি ১৯ মে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে যে ভাবে বিদ্রোহী মেজাজ দেখিয়েছিলেন, তা নিবে যেতে দেননি। বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বসু তাঁকে বিরোধী দলনেতার মর্যাদা দেওয়ার পরে সাংবাদিক বৈঠক করে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, ‘‘মমতাদিকে অনুরোধ করব, তিনি যাতে আমাদের পরামর্শ দেন। আর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই পরিষদীয় দলের কেউ নন। তাঁর সঙ্গে অষ্টাদশ বিধানসভার কোনও সম্পর্ক নেই।’’
আরও পড়ুন:
-
বিদ্রোহীদের দখলেই মমতার পরিষদীয় দল, বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত! স্পিকার স্বীকৃতি দিতেই খুলে দেওয়া হল বিধানসভার ঘর
-
ছোট লালবাড়িতেও আর নিয়ন্ত্রণ নেই তৃণমূলের! ববি মেয়র পদ ছাড়তে চান, হাকিমের সম্মান রক্ষায় সম্মতি মমতার: কুণাল
-
‘একই খেলা চলছে, রেফারি-আম্পায়ার বদলেছে’! মমতাকে খোঁচা দিয়ে তৃণমূল কর্মীদের জন্য দরজা খুললেন অধীর
বিরোধী দলনেতা হওয়ার পর ঋতব্রত বলেন, ‘‘এটা আমির বিরুদ্ধে আমরার লড়াই। তাই আমি বলেছি বিরোধী দলনেতা হিসাবে আমার কোনও বিশেষ ধরনের চেয়ার থাকবে না। তাতে থাকবে না অলঙ্কারও। আমরা সকলেই সমান। কালেক্টিভ, কালেক্টিভ, কালেক্টিভ।’’
যাদবপুরের রামলালবাজারের ভূমিপুত্র ঋতব্রত। সাউথ পয়েন্ট স্কুলের ছাত্র ছিলেন। তার পর ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে ভর্তি হন আশুতোষ কলেজে। সেখানেই তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি। সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআই করা শুরু করেন ঋতব্রত। আশুতোষ কলেজের ইউনিট সম্পাদক থেকে ক্রমে সংগঠনের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন তিনি। আশুতোষের পরে তিনি ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
যাদবপুরের কলোনি এলাকার বাঙাল পরিবারে জন্ম হলেও ঋতব্রত কট্টর মোহনবাগান সমর্থক। ভক্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজ় ক্রিকেটের। সেই সঙ্গে বিশ্ব ফুটবলে ব্রাজিলের অন্ধভক্ত। বিশ্বকাপের আসরে ব্রাজিল নামার সপ্তাহ দুয়েক আগেই পরিষদীয় রাজনীতিতে ঋতব্রত যেন দেখাতে চাইলেন, ‘খেলা হল’।
সিপিএমে থাকার সময় থেকেই সুবক্তা হওয়ার কারণে দ্রুত নজরে পড়তে থাকেন নেতাদের। প্রিয় হয়ে ওঠেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের। বিদেশি বই, চলচ্চিত্র ইত্যাদি নিয়ে আগ্রহের কারণে বুদ্ধদেবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও তৈরি হয় তাঁর। ঋতব্রতের ঘনিষ্ঠেরা জানেন, তাঁর কাছে এমন কিছু বই সংগ্রহে রয়েছে, যার পাতায়-পাতায় বুদ্ধদেবের হাতের লেখায় নির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করে ‘নোট’ লেখা রয়েছে। ২০১৪ সালে সিপিএম তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিল। সেই পর্বে সিপিএম রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর অনেকেরই তা নিয়ে আপত্তি ছিল। কিন্তু বুদ্ধদেবের কারণেই শেষ পর্যন্ত তাঁর নামে সিলমোহর দেয় আলিমুদ্দিন স্ট্রিট। তিন বছরের মধ্যেই ঋতব্রতকে বহিষ্কার করে তৃণমূল। সিপিএম ঋতব্রতের বিরুদ্ধে যে তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল, তার চেয়ারম্যান ছিলেন বর্তমান রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। সেই তদন্ত কমিশনকে ‘ক্যাঙারু কোর্ট’ বলেছিলেন ঋতব্রত।
আরও পড়ুন:
-
তৃণমূলের যুযুধান দুই শিবিরকে ‘মেলালেন’ শুভেন্দু! প্রশাসনিক বৈঠকে ববি-কুণালের সঙ্গেই নবান্নে হাজির ঋতব্রত-সন্দীপন
-
৩০ বিধায়কের সমর্থন পেলেই বিরোধী দলনেতা হওয়া যায়, ঋতব্রতের দরকার অন্তত ৪১! দল দখলে অন্যান্য অঙ্ক কী
-
বিরোধী হয়েও ‘চুরি’! সই-কাণ্ডে নালিশ করা দুই বিধায়কের নাম মুখ্যমন্ত্রী জানাতেই ঋতব্রত ও সন্দীপনকে তাড়িয়ে দিল তৃণমূল
রাজ্যে যেমন বুদ্ধদেবের প্রিয় পাত্র ছিলেন ঋতব্রত, তেমন সর্বভারতীয় সিপিএমে তিনি ছিলেন সীতারাম ইয়েচুরির ঘনিষ্ঠ। সিপিএম বহিষ্কারের পরে ২০২০ সাল পর্যন্ত ‘দলহীন’ সাংসদ হিসাবে রাজ্যসভায় ছিলেন তিনি। তার পর যোগ দেন তৃণমূলে। ২০২১ সালে তৃণমূল তৃতীয় বার ক্ষমতায় ফেরার পরে ঋতব্রতকে শ্রমিক সংগঠনের দায়িত্ব দিয়েছিল তৃণমূল। তাঁর আগেও অনেকে সিপিএম থেকে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু কেউই সে ভাবে সাংগঠনিক দায়িত্ব পাননি। সে দিক থেকে প্রথম ঋতব্রতই।
২০২৪ সালে আরজি কর-কাণ্ডের পরে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেন প্রাক্তন আমলা জহর সরকার। জহরের মেয়াদ ছিল গত এপ্রিল পর্যন্ত। ভাঙা মেয়াদে ঋতব্রতকে সংসদের উচ্চকক্ষে পাঠায় তৃণমূল। সেই সঙ্গে ঋতব্রত তৈরি করেন বিরল রেকর্ড। এক ব্যক্তি হিসাবে তিন পরিচয়ে রাজ্যসভায় যান তিনি। প্রথমে সিপিএম, তার পর দলহীন এবং শেষে তৃণমূল। বিধানসভায় তাঁকে প্রার্থী করা নিয়ে তৃণমূলের অন্দরে মতানৈক্য ছিল। একটি অংশ চেয়েছিল রাজ্যসভায় তাঁকে রেখে দেওয়া হোক। কারণ, সংসদের উচ্চকক্ষে সেই অর্থে তৃণমূলের বক্তা নেই। কিন্তু অন্য অংশ চেয়েছিল রাজ্য রাজনীতিতে তাঁকে ফিরিয়ে আনতে।
শেষপর্যন্ত ঋতব্রতকে উলুবেড়িয়া পূর্ব আসনে প্রার্থী করে তৃণমূল। পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে পদ্ম-ঝড়ের মধ্যেও তিনি জিতেছেন। তার পর গত এক মাসে তৃণমূলের অন্দরে ঘটনার ঘনঘটা দেখেছে রাজ্য রাজনীতি। আন্দোলিত হয়েছে তৃণমূল। যার নিউক্লিয়াস হয়ে উঠেছিলেন ঋতব্রত। অবশেষে মমতার সিদ্ধান্তকে নস্যাৎ করে দিয়ে, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিমদের সরিয়ে বিধানসভায় তৃণমূলের পরিষদীয় দলে নিজের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে ফেললেন ঋতব্রত। ৪৬ বছর বয়সে রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হলেন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- গত কয়েক দিন ধরেই সইকাণ্ড নিয়ে অস্বস্তি বাড়ছিল তৃণমূলের অন্দরে।
- সইকাণ্ড নিয়ে চাপানউতরের মধ্যে জল্পনা জোরালো হতে থাকে, তৃণমূল কি ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে?
- বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসাবে বর্ষীয়ান তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাবের চিঠিকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সূত্রপাত।
-
১৯:২৭
দু’টুকরো জোড়াফুল, অভিষেকই কি কারণ, ভাঙনের ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন মমতা? -
১০:৪৫
মমতার হাতছাড়া হচ্ছে তৃণমূল? ৫৯ বিধায়কের সমর্থনের চিঠি নিয়ে বিধানসভায় বিদ্রোহী ও বহিষ্কৃত ঋতব্রত, সঙ্গী অন্যেরাও -
২২:২২
দল দখলের জাদু-সংখ্যা প্রায় নাগালে ঋতব্রতদের! আরও নিঃসঙ্গ মমতা, ধর্নামঞ্চে তাঁর পাশে মাত্র ৮ জন বিধায়ক -
তৃণমূলে ভাঙনের জোর জল্পনা, ধর্নামঞ্চ থেকে মমতা বললেন, ‘বিশ্বাসঘাতকদের সুমতি হোক’
-
সই-বিতর্কের মধ্যে স্পিকারকে ফের চিঠি অভিষেকের! অতীত স্মরণ করিয়ে বিরোধী দলনেতা হিসাবে শোভনদেবের নাম প্রস্তাব