Advertisement
E-Paper

যৌথ হানায় খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর প্রত্যাঘাত ইরানের! নিশানায় ট্রাম্পের বন্ধু দেশগুলি, পশ্চিম এশিয়ায় আটকে বহু ভারতীয়

খামেনেইয়ের মৃত্যুর পরই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা শিয়া মতাবলম্বী মুসলমানেরা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। এমনকি সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তানেও রবিরার আমেরিকাবিরোধী বিক্ষোভ দেখা যায়। খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই করাচির মার্কিন কনসুলেট (উপদূতাবাস) লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে থাকেন বিক্ষোভকারীরা।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০১ মার্চ ২০২৬ ২৩:১০
আমেরিকা-ইরান সংঘাতে উত্তপ্ত পশ্চিম এশিয়া।

আমেরিকা-ইরান সংঘাতে উত্তপ্ত পশ্চিম এশিয়া। ছবি: রয়টার্স।

পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত থামার লক্ষ্মণ নেই। বরং আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের যৌথ হানায় মৃত্যু হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের। মৃত্যু হয়েছে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজ়িজ় নাসিরজ়াদেহ এবং সেনাপ্রধান আব্দুল রহিম মৌসাভিরও। তার পরেও অবশ্য পিছু হটতে নারাজ তেহরান। বরং কঠোর প্রত্যাঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।

অশীতিপর খামেনেইয়ের পর ইরানের দায়িত্ব কে নেবেন, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরানের নির্বাসিত ‘যুবরাজ’ রেজা পহলভি দেশে ফিরে ইরানের শাসনভার হাতে তুলে দিতে পারেন বলে মনে করছেন অনেকে। অন্য একটি অংশের মত, ‘শহিদ’ খামেনেইকে অবলম্বন করেই ফের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্র। খামেনেইয়ের মৃত্যুর পরই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা শিয়া মতাবলম্বী মুসলমানেরা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। এমনকি সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তানেও রবিরার আমেরিকাবিরোধী বিক্ষোভ দেখা যায়। খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই করাচির মার্কিন কনসুলেট (উপদূতাবাস) লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে থাকেন বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভ চলাকালীন কয়েক জন বিক্ষোভকারী নিরাপত্তাবেষ্টনী পেরিয়ে কনসুলেটের ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। পুলিশ আটকাতে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উপদূতাবাসের কিছু জায়গায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ।

পশ্চিম এশিয়ার এই অশান্তির আঁচ এসে পড়েছে ভারতেও। রবিবার কাশ্মীর-সহ বেশ কিছু জায়গাতেও বিক্ষোভ দেখান শিয়ারা। সমগ্র পরিস্থিতির উপর সতর্ক নজর রাখছে নয়াদিল্লি। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় রবিবার রাতেই মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটি (ক্যাবিনেট কমিটি অফ সিকিয়োরিটি)-র বৈঠক ডাকেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সূত্রের দাবি, পশ্চিম এশিয়ায় আটকে পড়া ভারতীয়দের উদ্ধারের বিষয় ছাড়াও হরমুজ় প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। প্রসঙ্গত, ইরান এবং ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ জলভাগ হল এই হরমুজ় প্রণালী। বিশ্বের মোট রফতানিযোগ্য এক-পঞ্চমাংশ তেল এই পথ ধরেই রফতানি করা হয়। আর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রণালী দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান। ভারত অভ্যন্তরীণ জ্বালানি-চাহিদা পূরণে ৮০ শতাংশ তেল অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করে থাকে। পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে তেল কেনে ভারত।

খামেনেইয়ের মৃত্যু

শনিবার মধ্যরাতেই (ভারতীয় সময় অনুসারে) ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, দুই দেশের যৌথ হামলায় মৃত্যু হয়েছে খামেনেইয়ের। রবিবার সকালে সেই খবর মেনে নেয় তেহরান। তার পরেই দেশ জুড়ে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। ইরানের সংবাদমাধ্যম জানায়, নিজের অফিসে বসে কাজ করছিলেন খামেনেই। আচমকা সেখানেই বোমা এসে পড়ে। মৃত্যু হয় তাঁর কন্যা, জামাই এবং নাতনিরও।

উত্তরসূরি কে

খামেনেইয়ের মৃত্যুর পরে অস্থায়ী ভাবে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে ইরান। তিন সদস্যের ওই কমিটিতে রাখা হয়েছে খামেনেই-ঘনিষ্ঠ আলিরেজ়া আরাফিকে। সংবাদসংস্থা রয়টার্স সূত্রে এমনটাই জানা যাচ্ছে। এত দিন তিনি ইরানের অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্ট্‌স-এর ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসাবে কর্মরত ছিলেন। একই সঙ্গে ইরানের শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান হিসাবেও দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন আয়াতোল্লা আরাফি।

নরকের রাস্তা!

সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার মৃত্যুর পরেও দমছে না ইরান। বরং খামেনেইয়ের মৃত্যুর পরই মেরিকা এবং ইজ়রায়েলকে ‘নরকের রাস্তা’ দেখানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড (আইআরজিসি)। সেই হুঁশিয়ারির পরই আইআরজিসি দাবি করে, পশ্চিম এশিয়ায় অন্তত ১৪টি মার্কিন সেনাঘাঁটি তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় গুঁড়িয়ে গিয়েছে। তাদের অন্য একটি সূত্র আবার দাবি করেছে, আমেরিকার ২৮টি সেনাঘাঁটিকে নিশানা করা হয়েছে। দাবি এবং পাল্টা দাবির মধ্যেই ইরান হুঁশিয়ারি দেয়, ‘‘ওদের (আমেরিকার) জন্য নরকের দরজা খোলাই রেখেছি।’’ তবে ইরানের হুঁশিয়ারিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টা হুঙ্কার দিয়েছেন। সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘ইরান যদি এখনও হামলা বন্ধ না করে, তা হলে এর পর এমন হামলার রাস্তায় যাব, ওরা কল্পনাও করতে পারবে না।’’

নিশানায় মার্কিন রণতরী?

মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। অন্তত চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে মার্কিন রণতরীকে লক্ষ্য করে। যদিও ইরানের এই দাবি উড়িয়ে দিয়েছে আমেরিকা।

নিশানায় ট্রাম্পের বন্ধুরাও!

প্রত্যাঘাত করার প্রতিশ্রুতি বজায় রেখে ইজ়রায়েল এবং মার্কিন সেনাঘাঁটিগুলিতে পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আমেরিকার সেনাছাউনি রয়েছে। সেই সেনাঘাঁটিগুলিকেই লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা শুরু করে ইরান। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ছাড়াও, কুয়েত, কাতার, বাহরিন, ইরাক, সৌদি আরব এবং জর্ডনে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। শনিবার দুপুর থেকে একযোগে এই সব এলাকায় বিস্ফোরণের খবর মিলেছিল। রবিবারও ইরান সেই হামলা অব্যাহত রেখেছে।

ইরানের পাশে কারা

ইরানে হামলার বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে রাশিয়া এবং চিন। রবিবার খামেনেইয়ের হত্যাকে ‘অনৈতিক’ বলে অভিহিত করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এটিকে একটি ‘নৃশংস হত্যাকাণ্ড’ বলে ব্যাখ্যা করেন তিনি। পুতিনের কথায়, “এই হত্যাকাণ্ডের ফলে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘিত হয়েছে।” ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সরব হয়েছে বেজিং। চিনের বিদেশ মন্ত্রক রবিবার একটি বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, ‘‘ইরানের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং ভূখণ্ডের অখণ্ডতাকে শ্রদ্ধা করা উচিত।’’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নীতিকে ‘নির্লজ্জ হামলা’ বলেও তোপ দেগেছে বেজিং। খামেনেই-হত্যার নিন্দা করেছে পাকিস্তানও। পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, “আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হওয়ার ঘটনায় উদ্বিগ্ন পাকিস্তান। কোনও দেশের বা সরকারের প্রধানকে কখনও আক্রমণ করা উচিত নয়, এটিই প্রচলিত রীতি।”

এখনও আটকে বহু ভারতীয়

যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝে পশ্চিম এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে প্রভাবিত হয়েছে বিমান পরিষেবা। ফলে সেখানে আটকে পড়েছেন বহু ভারতীয়। ইরান আগেই নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। বন্ধ ইজ়রায়েলের আকাশসীমাও। পরে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, বাহারিন, ইরাক, কুয়েত এবং কাতারও নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতের এয়ার ইন্ডিয়া, ইন্ডিগো-সহ বিভিন্ন দেশের উড়ান সংস্থার পরিষেবা বিঘ্নিত হয়েছে। এয়ার ইন্ডিয়া, ইন্ডিগোর পাশাপাশি এয়ার ফ্রান্স, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ়, ইবেরিয়া এক্সপ্রেস, জাপান এয়ারলাইন্স, লুফথহান্‌সা, এলওটি এয়ারলাইন্স, নরওয়েজিয়ান এয়ারলাইন্স, টার্কিশ এয়ারলাইন্স, ভার্জিন অতলান্তিক, এয়ার আলজিরি, স্ক্যানডেনেভিয়ান এয়ারলাইন্স, উইজ় এয়ার, পেগাসাস এয়ারলাইন্স, আইটিএ এয়ারওয়েজ়ের মতো উড়ান সংস্থাগুলি পশ্চিম এশিয়ার উপর দিয়ে বিমান আপাতত বাতিল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ভারতীয়দের নিরাপদে উদ্ধার করে নিয়ে আসার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটি (ক্যাবিনেট কমিটি অফ সিকিয়োরিটি)-র বৈঠকে। রবিবার রাতে দিল্লিতে ফিরেই এই বৈঠকে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

Iran israel US Ayatollah Ali Khamenei
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy