বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন সাত জন মহিলা। ২৯৭টি আসনের মধ্যে মাত্র সাতটি আসনে জয়ী হয়েছেন তাঁরা। বাংলাদেশের ইতিহাস বলছে, এটা নতুন কিছু নয়। এর আগে বাংলাদেশের দুই মহিলা প্রধানমন্ত্রীর আমলেও ছবিটা ছিল প্রায় একই।
তবে প্রায় দু’দশক পরে এত কম সংখ্যক মহিলা সে দেশে নির্বাচিত হয়েছেন, তা নিয়ে কাটাছেঁড়া করতে গিয়ে উঠে এসেছে বিভিন্ন বিষয়। দেখা গিয়েছে, বিষয়টি পুরোপুরি ‘কাকতালীয়’ নয়। সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো পরিসংখ্যান দিয়ে জানিয়েছে, মহিলাদের প্রার্থী করার প্রবণতা রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে এ বারও ছিল কম। মহিলা প্রার্থীদের একাংশ মনে করছেন, ভোটের আগে মহিলাদের বিরুদ্ধে প্রচার ভোটবাক্সে প্রভাব ফেলেছে। জুলাই আন্দোলনের পরে মহিলা অধিকার রক্ষাকর্মীদের মনে আশা জাগলেও তা পূরণ হয়নি।
বাংলাদেশে ৩০০টি আসনের মধ্যে একটি আসনে প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে বৃহস্পতিবার ভোট হয়নি। ২৯৯টি আসনে ভোট হলেও ২৯৭টি আসনের ফলাফল বেসরকারি ভাবে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন। দু’টি আসনের ফলঘোষণা আইনি জটিলতায় আটকে রয়েছে। ২৯৭টি আসনের মধ্যে মাত্র সাতটি আসনে জয়ী হয়েছেন মহিলারা। ২০০১ সালের পরে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে এত কম আসনে জয়ী হননি মহিলা প্রার্থীরা।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে গণআন্দোলন শুরু হয়। অগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হয় শেখ হাসিনার সরকার। প্রতিষ্ঠান-বিরোধী সেই আন্দোলনের পরে মহিলা অধিকার রক্ষাকর্মীদের আশা ছিল, পরের ভোটে রাজনৈতিক দলগুলি মহিলাদের আরও বেশি করে প্রার্থী করবে। তাদের আপত্তি সত্ত্বেও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলি জানিয়েছিল, মোট আসনের পাঁচ শতাংশে তারা মহিলাদের প্রার্থী করবে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন বলছে, কার্যক্ষেত্রে সেই প্রতিশ্রুতি তারা পূরণ করেনি। জামায়াতে ইসলামী (জামাত নামে সমধিক পরিচিত) কোনও মহিলাকেই প্রার্থী করেনি। চলতি ভোটে ২৯৯টি আসনে মোট মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ৮৬। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে এখন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংখ্যা ৫০। এ বার বাংলাদেশ সংসদে মোট মহিলা সংসদ সদস্যের সংখ্যা হবে ৫৭। অর্থাৎ সংসদে মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব থাকছে ১৬ শতাংশ।
আরও পড়ুন:
-
তারেককে জয়ের অভিনন্দন, ইউনূসের বিবৃতিতে জামাত এবং এনসিপি-কেও ধন্যবাদ ‘দায়িত্বশীল ভূমিকা’-র জন্য
-
ক্যারিবিয়ান সাগরে আবার জাহাজ ধ্বংস করল মার্কিন সেনা! নিহত তিন, ট্রাম্প দাবি করলেন, হামলা জরুরি ছিল
-
ইউনূস এখন কী করবেন? ভোট পরবর্তী বাংলাদেশে বিদায়ী মুখ্য উপদেষ্টার ‘তিন পরিকল্পনা’র পাশাপাশি জল্পনায় অন্য অঙ্কও
যে সাত জন মহিলা জয়ী হয়েছেন এ বারের ভোটে, তাঁদের মধ্যে ছ’জনই বিএনপির। এক জন স্বতন্ত্র। মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির টিকিটে জয়ী আফরোজা খানম, ঝালকাঠি-২ আসনে ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, সিলেট-২ আসনে তাহসিনা রুশদী, নাটোর-১ আসনে ফারজানা শারমিন, ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ ইসলাম, ফরিদপুর-৩ আসনে নায়াব ইউসুফ আহমেদ জয়ী হয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা জয়ী হয়েছেন। রুমিন আগে বিএনপি-তে ছিলেন। দল ছেড়ে নির্দল প্রার্থী হিসাবে তিনি ভোটে লড়েন। চলতি ভোটে মোট ১০ জন মহিলাকে টিকিট দিয়েছিল বিএনপি।
ফরিদপুরে বিএনপির টিকিটে জয়ী নায়াব মনে করেন, মহিলাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রচারই ভোটবাক্সে প্রভাব ফেলেছে। নায়াব প্রথম আলো-কে বলেন, ‘‘সমাজে মহিলাদের বৈষম্যমূলক দৃষ্টিতে দেখা হয়। আমাকেও দুর্বল ভেবেছিল অনেকে। রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি পদে আমি তাদের ভুল প্রমাণিত করেছি। সমাজের একটি অংশ এখনও আমাকে মেনে নেবে না। আমি প্রমাণ করে দেব, পুরুষদের চেয়ে বেশি কাজ করি।’’ সরাসরি না বললেও তাঁর নিশানায় যে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা, অনেকেই তা মনে করছেন।
ঢাকা-১২ আসনে তাসলিমা আখতারকে প্রার্থী করেছিল গণসংহতি আন্দোলন। ওই আসনে জয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী। তসলিমার অভিযোগ, এ বারের ভোটে ‘মহিলা-বিদ্বেষী’ প্রচার হয়েছে। তাঁর মতে, আরও বেশি করে মহিলাদের টিকিট দিতে হবে। মানুষকে সচেতন করতে হবে। তা হলেই একমাত্র মিটবে বৈষম্য। এই প্রসঙ্গে তিনি জামাতের এক শীর্ষ নেতার একটি পোস্টের কথাও মনে করিয়ে দেন। ওই পোস্টে মহিলাদের চাকরি, রাজনীতিতে করা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা হয়। জামাতের তরফে দাবি করা হয়, তাদের নেতার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে। সেই নিয়ে সরব হয় বিএনপিও।
তবে পরিসংখ্যান বলছে, এই প্রথম নয়, বাংলাদেশের সংসদে মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব বরাবরই কম। নির্বাচন কমিশন-সহ বিভিন্ন সূত্রকে উদ্ধৃত করে প্রথম আলোর প্রতিবেদন বলছে, ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদে ১৫টি সংরক্ষিত আসনেই শুধু প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন মহিলারা। সে বার কোনও মহিলা নির্বাচিত হননি। ১৯৭৯-১৯৮২ সালে, দ্বিতীয় সংসদে দু’জন মহিলা নির্বাচিত হয়েছিলেন। মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল ৩০টি আসন। সব মিলিয়ে মোট ৩২ জন মহিলা সংসদ সদস্য ছিলেন সে বার। ১৯৮৮-৯০ সালে চতুর্থ সংসদে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন ছিল না। চার জন মহিলা নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯১-১৯৯৫ সালে পঞ্চম সংসদে পাঁচ জন মহিলা নির্বাচিত হয়েছিলেন। ৩০টি মহিলা আসন সংরক্ষিত ছিল।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপির ‘একতরফা’ ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিন জন মহিলা প্রার্থী নির্বাচিত হন। সে বার মহিলাদের জন্য ৩০টি সংরক্ষিত আসন ছিল। সেই নির্বাচন বাতিল হয়ে যায়। ওই বছরের জুন মাসে সপ্তম সংসদ নির্বাচন হয়। ওই ভোটে নির্বাচিত হন আট জন মহিলা। সে বার সংসদে মোট মহিলা প্রতিনিধি ছিলেন ৩৮ জন। ২০০১ সালে, অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে সাতটি আসনে নির্বাচিত হন মহিলারা। সংরক্ষিত আসন ছিল ৪৫। সে বার সংসদে মহিলা সদস্যের সংখ্যা ছিল ৫২। তার পর থেকেই মহিলা প্রার্থীর জয় ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
২০০৮ সালে, নবম জাতীয় সংসদ ভোটে ২১ জন মহিলা নির্বাচিত হন। এর পর মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন বাড়িয়ে ৫০টি করা হয়। সে বার মোট মহিলা সংসদ সদস্য ছিলেন ৭০ জন। আওয়ামী লীগের আমলে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ওই তিনটি নির্বাচনে যথাক্রমে ১৮, ২৩ এবং ১৯ জন মহিলা নির্বাচিত হয়েছিলেন।
ঘটনাচক্রে, এর আগে বাংলাদেশে দু’জন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন মহিলা— খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা। ১৯৯১ সাল থেকে তাঁরাই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তবে পরিসংখ্যান বলছে, তাঁদের আমলেও সংসদে মহিলাদের উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব ছিল না। হাসিনার আমলে শেষ দিকে, নির্বাচিত মহিলা সংসদ সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। গত দু’দশক ধরে বাংলাদেশের সংসদে মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব একটু একটু বাড়লেও চলতি ভোটে আবার সেখানেই ফিরে গেল। মনে করা হচ্ছে, মহিলাদের সে ভাবে প্রার্থীই করা হয়নি এই ভোটে। আর সেটাই হল নেপথ্যকারণ।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে মহিলাদের প্রার্থী করার প্রবণতা বরাবরই কম। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন করে। সেই কমিশনের সদস্য মীর নাদিয়া নিভিন জানান, ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এ বার মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা কমে গিয়েছে। সে বার মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ১০১। মোট প্রার্থীর পাঁচ শতাংশের কিছু বেশি। এ বছর মহিলাদের তুলনায় পুরুষেরা মনোনয়ন পেয়েছেন ২২ গুণ বেশি। মোট মহিলা প্রার্থীর আট শতাংশের বেশি জয়ী হয়েছেন। সেখানে মোট পুরুষ প্রার্থীর ১৫ শতাংশ জয়ী হয়েছেন। মহিলাদের এই ফল তাই খারাপ মনে করছেন না নাদিয়া। তাঁর কথায়, ‘‘মহিলারা খারাপ করেছেন, এমন বলার সুযোগ নেই।’’ তিনি প্রথম আলো-কে বলেন, ‘‘আরও বেশি সংখ্যক মহিলাকে প্রার্থী করে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করা হলে আরও বেশি সংখ্যক মহিলা জয়ী হতেন।’’ তাঁর মতে, এ বারের নির্বাচন থেকে একটি শিক্ষা নেওয়া দরকার। তৃণমূল স্তর থেকে আরও বেশি করে মহিলাদের তুলে আনা উচিত। তাঁদের নিজের এলাকায় পরিচয় করিয়ে দেওয়া দরকার। আগামী নির্বাচনের জন্য মহিলাদের প্রস্তুত করতে এখন থেকেই জোর দিতে হবে।