বাংলাদেশে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসতে চলেছে বিএনপি। ফলে এটা প্রায় নিশ্চিত যে, শেষ মুহূর্তে নাটকীয় কোনও মোড় না ঘুরলে খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানই সে দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। কিন্তু কুর্সিতে বসার পর তারেকের ভবিষ্যতের পথ খুব একটা ‘মসৃণ’ হবে না বলেই মনে করছেন বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহালদের একাংশ। অন্তত প্রথম পর্বে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা তাঁকে করতে হতে পারে।
প্রত্যাশিত ভাবেই নতুন সরকারের গতিবিধি ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রেখেছে নয়াদিল্লিও। তবে হবু প্রধানমন্ত্রী তারেকের মা বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পরে তাঁর অন্ত্যেষ্টিতে যোগ দিয়েছিলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর। কূটনীতিকদের একাংশের মতে, তখন থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ‘স্বাভাবিক’ হওয়ার দিকে এগিয়েছে। জামাতের বদলে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় সেই বিষয়টি আরও ত্বরান্বিত হতে পারে বলেই মনে করছেন অনেকে।
২০০৮ সালে সপরিবার বাংলাদেশ ছেড়ে ব্রিটেনে চলে গিয়েছিলেন তারেক। দীর্ঘ ১৭ বছর পর গত ডিসেম্বরে যখন ফিরলেন, তখন শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে সুষ্ঠু ভাবে নির্বাচন আয়োজন করাই বড় চ্যালেঞ্জ। সেই পর্বে দেশের রাজনীতিতে তারেকের প্রত্যাবর্তন ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। অনেকের মতে, দেশে ফেরার পর তারেককে দেখতে ঢাকার রাজপথে বিপুল জনসমাগমই ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিয়ে। হাসিনা-পরবর্তী অস্থির সময়ে বাংলাদেশের মানুষ যে নেতার খোঁজ করছিলেন, তারেক যেন সেই নেতা হয়েই ঢাকায় পা রেখেছিলেন। ভোটের প্রচারের প্রথম দিনেই তিনি বলেছিলেন, ‘‘দিল্লি নয়, পিন্ডি (রাওয়ালপিন্ডি) নয়, সবার আগে বাংলাদেশ।’’
আরও পড়ুন:
ঢাকা-১৭ এবং বগুড়া-৬, ভোটে দু’টি আসন থেকে লড়েছেন তারেক। দু’টিতেই জিতেছেন বড় ব্যবধানে। প্রচারপর্বের শুরু থেকেই তিনি বাংলাদেশের জনগণ, তাঁদের দৈনন্দিন চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন। প্রচারে গিয়েছেন স্ত্রী-কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম একে ‘ফ্যামিলি ম্যান কৌশল’ বলে উল্লেখ করেছিল। ‘আমি তোমাদেরই লোক’— এই বার্তা দিয়ে তারেক বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করেছেন বার বার।
তবে মসনদে বসার পর বাংলাদেশের ঘরে-বাইরে তারেকের জন্য অন্তত পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
১. জনতার আস্থা
অস্থির, অনিশ্চিত সময়ে বিএনপি-র উপর বাংলাদেশের মানুষ যে আস্থা রেখেছেন, তার মর্যাদা দেওয়া তারেকের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে। দেশটিতে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অত্যাচার নিয়ে একাধিক বার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত সরকার। প্রায় প্রতি দিনই কোনও না কোনও নৃশংসতার খবর আসছে। এই নিপীড়ন বন্ধ করে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশু উন্নতিকে অগ্রাধিকার দিলেই জনমনে ইতিবাচক বার্তা দিতে পারবেন তারেক। তিনি নিজেও একাধিক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশে ‘স্বাভাবিক পরিস্থিতি’ ফেরানো হবে তাঁর প্রাধান্য। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে তাঁর সরকার। হাসিনার পদত্যাগের পর থেকে দেশকে যে অস্থিরতা ঘিরে রেখেছে, তার অবসান ঘটিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার কথা বার বার বলেছেন তারেক।
২. আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর যে প্রশ্নটি উঠেছে, তা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তারেক নিজে একাধিক বার দাবি করেছেন, কোনও রাজনৈতিক দল বা তার কর্মসূচি নিষিদ্ধ করার পক্ষপাতী তিনি নন। কেউ দোষ করলে আইন মেনে তার শাস্তি নিশ্চিত করাই হবে তাঁর সরকারের লক্ষ্য। হাসিনার আমলে বাংলাদেশে দীর্ঘ দিন ‘নিষ্ক্রিয়’ করে রাখা হয়েছিল বিএনপিকে। তারেক কি সেই পথে হাঁটবেন? তিনি কি আওয়ামী লীগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবেন? বিরোধী জামাতের সঙ্গে সে ক্ষেত্রে আরও বড় সংঘাত হতে পারে বিএনপির। ফলে তারেককে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যে ভারতবিরোধী শক্তি হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, তার নেপথ্যে জামাতের বড় ভূমিকা ছিল। বাংলাদেশের বহু এলাকায় শক্তি বাড়িয়েছে এই কট্টরপন্থী দল।
৩. ভারত-নীতি
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে তারেকের অবস্থানের উপর ভারতের সঙ্গে তাঁর সরকারের সম্পর্কও অনেকাংশে নির্ভর করবে। বাংলাদেশ থেকে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। জুলাই গণহত্যার মামলায় বাংলাদেশের আদালতে তিনি ইতিমধ্যে দোষী সাব্যস্ত। মাথার উপর ঝুলছে মৃত্যুদণ্ডের খাঁড়া। একাধিক বার ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়ে নয়াদিল্লিকে চিঠি দিয়েছে। এখনও ভারত থেকে তার কোনও জবাব দেওয়া হয়নি। এই পরিস্থিতিতে তারেকও হাসিনার প্রত্যর্পণ চাইবেন কি না বা ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনও কৌশল নেবেন কি না, সে দিকে কেন্দ্রীয় সরকারের নজর থাকবে। ইউনূসের আমলে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ‘ঘনিষ্ঠতা’ যে ভাবে বেড়েছে, তারেক তা আরও এগিয়ে নিয়ে যান কি না, তার উপরেও নজর রাখবে ভারত। তারেকের জয় নিশ্চিত হতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়ে একসঙ্গে কাজ করার বার্তা দিয়েছেন। পোস্ট করেছেন বাংলায়। আবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফও দুই দেশের ‘ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির’ ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
আরও পড়ুন:
৪. জুলাই সনদ
সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদ নিয়ে গণভোট হয়েছে বাংলাদেশে। এই সনদের ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে অন্তত তিনটিতে আনুষ্ঠানিক ভাবে আপত্তি জানিয়েছিল বিএনপি। গণভোটের ফল সনদের পক্ষে গেলে তারেককে ওই তিনটি ধারা নিয়েও ভাবতে হবে। জুলাই সনদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে একই ব্যক্তি একসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী এবং দলীয় প্রধানের পদে থাকতে পারবেন না। অধিকাংশ দল একমত হলেও বিএনপি-সহ কয়েকটি দল এতে আপত্তি জানায়। তারেকের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও এই প্রস্তাবের উপর নির্ভর করছে। তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে বিএনপি চেয়ারম্যানের পদ তাঁকে ছাড়তে হতে পারে। এ ছাড়া, দেশের সংবিধানের উপরে জুলাই সনদের প্রাধান্য, সনদ নিয়ে আদালতে আপত্তি না-জানানোর মতো বিধানের বিরোধিতাও করেছে তাঁর দল। বিএনপি ক্ষমতায় এলে এবং গণভোটের ফলাফল সনদের পক্ষে গেলে দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষাও তারেকের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে।
৫. অর্থনীতির সঙ্কট
বাংলাদেশে ভোটের ঠিক আগে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করেছিল ইউনূসের সরকার। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের পণ্যে শুল্কের পরিমাণ ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করে দিয়েছে। কিন্তু তার চড়া ‘মূল্য’ও দিতে হয়েছে ঢাকাকে। আমেরিকার অনেক দাবি মুখ বুজে মেনে নিতে হয়েছে। ছ’হাজারের বেশি মার্কিন পণ্য থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করতে হবে বাংলাদেশকে। এর ফলে মার্কিন পণ্যের শুল্ক থেকে রাজস্ব বাবদে আয় অনেক কমে যাবে। ধাক্কা খেতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতি। ক্ষমতায় আসার পরে এই পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্যও তারেককে সাবধানে পা ফেলতে হবে।