এক দিকে পারস্য উপসাগর, অন্য দিকে ওমান উপসাগর। দুইয়ের মাঝে ২১ মাইলের সঙ্কীর্ণ জলপথের নাম হরমুজ় প্রণালী— পশ্চিম এশিয়ার বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। যে সমুদ্র পূর্বে মুম্বইকে ছুঁয়ে আছে, সেই আরব সাগরই পশ্চিমে মিশেছে হরমুজ় হয়ে আসা ওমান উপসাগরের সঙ্গে। ফলে ভারতের প্রাথমিক মানচিত্রে দেখা না-গেলেও হরমুজ় খুব দূরে নয়। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ় যখন সঙ্কটে, তার প্রত্যাশিত ভাবেই প্রভাব পড়ছে ভারতের উপরেও।
হরমুজ় প্রণালীর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে আটটি দেশ। তার মধ্যে অন্যতম ইরান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের যৌথবাহিনী ইরান আক্রমণ করে এবং সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যু হয়। এর পরেই পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে প্রত্যাঘাত শুরু করে ইরান। গত ৪ মার্চ তারা হরমুজ়ের উপর ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ ঘোষণা করে। হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, কোনও জাহাজ ওই প্রণালী দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেই তার উপর হামলা হবে।
হরমুজ় প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে পণ্যবাহী জাহাজ। ছবি: রয়টার্স।
হরমুজ়ের জলে মাইন পেতে রেখেছে ইরান। আমেরিকার শত হুঁশিয়ারিতেও লাভ হয়নি। এখনও পর্যন্ত হরমুজ় প্রণালীতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে। বুধবার গুজরাতে আসার পথে তাইল্যান্ডের পণ্যবাহী জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ২০ জনকে উদ্ধার করা গেলেও ভিতরে আটকে পড়েন তিন জন। তাঁরা এখনও নিখোঁজ। এই নিয়ে হরমুজ় প্রণালীতে মোট আক্রান্ত জাহাজের সংখ্যা পৌঁছোল ১৩-তে।
হরমু়জ়ের ঠিকানা
হরমুজ় প্রণালীর উত্তরে ইরান, দক্ষিণে ওমান। সংলগ্ন পারস্য এবং ওমান উপসাগরের উপকূল জুড়ে রয়েছে আরও ছ’টি দেশ— সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, বাহরিন, কুয়েত এবং ইরাক। প্রতিটিই অপরিশোধিত তেলের খনি। এই দেশগুলি থেকে বিশ্বের নানা প্রান্তে তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানি করা হয়। রফতানির একমাত্র পথ হরমুজ়। তেলসমৃদ্ধ পশ্চিম এশিয়া থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তো বটেই, ইউরোপ, আমেরিকাতেও পণ্য পরিবহণ করা হয় হরমুজ় প্রণালী দিয়ে। আমেরিকা-ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে সারা বিশ্বের জ্বালানির এই প্রাণকেন্দ্রে আঘাত করে বসেছে ইরান। অকেজো করে দেওয়া হয়েছে হরমুজ়। ফলে সারা বিশ্ব বিপাকে।
কেন ইরানের দাপট
হরমুজ় প্রণালী সর্বসাকুল্যে প্রায় ১০০ মাইল লম্বা। সঙ্কীর্ণতম অংশে এর প্রস্থ ২১ মাইল। সাধারণ ভাবে এটি ইরানের জলসীমার মধ্যে পড়লেও বাণিজ্যিক গুরুত্বের বিচারে একে আন্তর্জাতিক জলপথ হিসাবে ধরা হয়। বস্তুত, হরমুজ়ের অবস্থানই তার উপর ইরানের দাপট নিশ্চিত করে দিয়েছে। শুধু এই প্রণালীই নয়, পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর-সহ সমগ্র এলাকার উত্তরাংশ জুড়ে রয়েছে ইরানের সীমানা। আর একই অংশের দক্ষিণ উপকূল সৌদি, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ওমান, বাহরিন, কুয়েতের সীমানায় ভাগ করা। ফলে উত্তরে রয়েছে ইরানের অলিখিত একচ্ছত্র আধিপত্য। যুদ্ধের সময় তা-ই কাজে লাগাচ্ছে খামেনেইয়ের দেশ।
কী বলছে আন্তর্জাতিক আইন
সাধারণ ভাবে হরমুজ় প্রণালী যে কোনও জাহাজের জন্য উন্মুক্ত। বহু দেশ পণ্য পরিবহণের জন্য এই জলপথ ব্যবহার করে। হরমুজ় প্রণালীতে দু’মাইল চওড়া করে দু’টি পথ ভাগ করা আছে। এক দিক দিয়ে জাহাজ পূর্বে আসে, অন্য দিক দিয়ে যায় পশ্চিমে। দ্বিমুখী এই জলপথের মাঝে আরও দুই মাইল চওড়া অংশ রাখা হয়েছে, যা দু’টি পথকে পৃথক করে। আন্তর্জাতিক আইন বলছে, যে কোনও দেশ তার উপকূল থেকে ১৩.৮ মাইল পর্যন্ত অংশের জলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ দাবি করতে পারে। এই নিয়ম অনুযায়ী, হরমুজ়ের সঙ্কীর্ণ অংশে ইরান, ওমান উভয়ের নিয়ন্ত্রণই স্বীকৃত। তবে ইরান তুলনামূলক বেশি ক্ষমতাধর রাষ্ট্র। তাই তার দাপটও বেশি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমু়জ়
সারা বিশ্বের মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ় প্রণালী দিয়েই যাতায়াত করে। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর দৈনিক গড়ে দু’কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত এবং জ্বালানি তেল হরমুজ় প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। পেট্রলিয়াম রফতানিকারক দেশগুলির সংগঠন বা ওপিইসি-র সদস্য ইরান, সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-সহ ১২টি দেশ। তারা অধিকাংশ জ্বালানি তেল হরমুজ় প্রণালী দিয়েই রফতানি করে। মূলত হরমুজ় হয়ে এই তেল যায় এশিয়ায়। যার অন্যতম ক্রেতা চিন, ভারত এবং বাংলাদেশ। এ ছাড়া, বিশ্বের বৃহত্তম তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রফতানিকারক দেশগুলির মধ্যে অন্যতম কাতার। তারা তাদের সমস্ত পণ্য এই প্রণালীর মাধ্যমেই ক্রেতাদের কাছে পাঠায়। বিশ্বের মোট এলএনজি-র জোগানের এক-তৃতীয়াংশ এই প্রণালী দিয়ে যায়। সব মিলিয়ে মাসে ৫০ কোটি ব্যারেল তেল এবং ৬০ লক্ষ টন গ্যাস এশিয়ার বাজারে যায় হরমুজ়ের মারফত।
যুদ্ধের প্রভাব
এর আগেও ইরানের সঙ্গে ইজ়়রায়েল বা আমেরিকার যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু হরমুজ় প্রণালীর বাণিজ্যিক প্রবাহ কখনও আটকানো হয়নি। আশির দশকের পর এই প্রথম প্রণালীটি ক্ষেত্রবিশেষে ছাড় দিয়ে বন্ধ করেছে ইরান। প্রতি মাসে ৩,০০০ জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। সংঘাতের জেরে চড়চড় করে বেড়েছে জ্বালানির দাম। খনিজ তেল ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারে (৯,২১৯ টাকা) পৌঁছে গিয়েছে। তেল পরিশোধন সংস্থাগুলি শঙ্কায় ভুগছে। সৌদির বৃহত্তম সংস্থা ‘আরামকো’ জানিয়ে দিয়েছে, এ ভাবে চলতে থাকলে শীঘ্রই বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে। এই সঙ্কটের মধ্যেও কিন্তু এখনও পর্যন্ত হরমুজ় নিয়ে পিছু হটার নাম নিচ্ছে না ইরান। বুধবারও তারা হরমুজ়ে ভাসমান তৈলবাহী জাহাজগুলিকে নিশানা করেছে। ইরানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইব্রাহিম জ়োলফাকারি বলেছেন, ‘‘তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ২০০ ডলার (প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার টাকা) হতে চলেছে। তার জন্য তৈরি হও। হরমুজ়ে আমরা আরও তিনটে জাহাজ আক্রমণ করেছি।’’ আমেরিকা, ইজ়রায়েলকে লক্ষ্য করে এর পরে তিনি বলেছেন, ‘‘তেলের দাম আঞ্চলিক নিরাপত্তার উপর নির্ভর করে। সেটা তোমরাই তছনছ করে দিয়েছ।’’
ভারতে কী অবস্থা
ভারত সরকারও জ্বালানির জোগান নিয়ে চিন্তিত। বুধবার কেন্দ্রীয় পেট্রলিয়াম মন্ত্রক জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত দেশে খনিজ তেলের জোগান নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কারণ, অন্তত ৪০টি দেশ থেকে ভারত তেল আমদানি করে। হরমুজ় প্রণালী দিয়ে যে তেল আসে, তা ব্যাহত হয়েছে। তবে ৭০ শতাংশ জোগান আসছে অন্য রাস্তা দিয়ে। তবে প্রাকৃতিক গ্যাস নিয়ে চিন্তার কারণ রয়েছে। ভারতে প্রাকৃতিক গ্যাসের মোট খরচ দৈনন্দিন ১৮.৯ কোটি মেট্রিক আদর্শ ঘনমিটার (এমএসসিএমডি)। তার মধ্যে ৯.৭৫ কোটি এমএসসিএমডি গ্যাস ঘরোয়া ভাবে উৎপাদন করা হয়। বাকিটা আমদানি করা হয়। সরকার জানিয়েছে, ৪.৭৪ কোটি এমএসসিএমডি-র জোগান পশ্চিম এশিয়ার সঙ্কটের কারণে প্রভাবিত হয়েছে। এলপিজি-র মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ ভারত বাইরে থেকে আমদানি করে। তার ৯০ শতাংশই আসে হরমুজ় প্রণালী দিয়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিকল্প রুটে জোগান বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে।