বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার গুরুত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে। ডাক্তারি, এঞ্জিনিয়ারিং বা অন্যান্য পেশায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্নে লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী প্রতিনিয়ত কঠোর প্রস্তুতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই প্রতিযোগিতার দৌড়ে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হচ্ছে ছাত্রদের মানসিক স্বাস্থ্য— যা আজ এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি মানেই দীর্ঘ সময় পড়াশোনা, অসংখ্য মক টেস্ট এবং প্রতিনিয়ত নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে চিন্তা। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা এই চাপকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ‘ভাল র্যাঙ্ক পেতেই হবে’— এই চাহিদা ছাত্রদের উপর এক অদৃশ্য বোঝা তৈরি করে, যা ধীরে ধীরে উদ্বেগ, হতাশা ও আত্মবিশ্বাসের অভাবের রূপ নেয়।
বিশেষত, নিট পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা এতটাই তীব্র যে অনেক ছাত্রছাত্রী নিজেদের সক্ষমতা নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়ে। বার বার ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা তাদের মানসিক ভাবে ভেঙে দেয়। অনেকেই নিজেকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করতে করতে নিজের মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলে, যা অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর পাশাপাশি কোচিং সংস্কৃতির প্রসারও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ফলাফলের চাপ দিয়ে ছাত্রদের আরও বেশি প্রতিযোগিতার মধ্যে ঠেলে দেয়। বিশ্রাম, বিনোদন বা ব্যক্তিগত সময়ের অভাব ছাত্রদের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। ফলে তারা এক যান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, যেখানে আনন্দ বা স্বাভাবিক জীবন যাপনের কোনও জায়গা থাকে না।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, পরিবারকে বুঝতে হবে যে একটি পরীক্ষাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। সন্তানদের উপর অযথা চাপ না দিয়ে তাদের মানসিক সমর্থন দেওয়া জরুরি। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টারগুলিকে শুধুমাত্র ফলাফলের দিকে নজর না দিয়ে ছাত্রদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত কাউন্সেলিং, চাপমুক্ত শিক্ষার পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার ধারণা গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন।
সর্বোপরি, ছাত্রদেরও নিজেদের সীমাবদ্ধতা ও সক্ষমতা বুঝে সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। বিশ্রাম, নিয়মিত শরীরচর্চা ও সঠিক জীবনযাত্রা মানসিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য— এ কথা ভুলে গেলে চলবে না। একটি সমাজের প্রকৃত অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু মেধায় নয়, মানসিক ভাবেও সুস্থ ও দৃঢ় থাকে। তাই নিট বা অন্য কোনও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি ছাত্রদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
রণজিৎ পাল, খোসবাগান, পূর্ব বর্ধমান
ভোটের গুরুত্ব
বিধান রায়ের ‘ভোটের আমি, ভোটের তুমি’ (রবিবাসরীয়, ৫-৪) শীর্ষক প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। গণতন্ত্রের আয়নায় আমাদের প্রতিচ্ছবি, গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা কোথায়? সংবিধানের পাতায়, না কি রাজনৈতিক ভাষণের মঞ্চে? আসলে তার প্রকৃত বাস আমাদের হাতের মুঠোয়— ভোটের মুহূর্তে। সেই ক্ষণিকের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হয় দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ। ‘ভোটের আমি, ভোটের তুমি’— এটি কেবল স্লোগান নয়, এটি গণতান্ত্রিক অস্তিত্বের গভীরতম স্বীকৃতি। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎসবটির কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষ— আমি, আপনি, আমরা সবাই।
ভোট একটি নীরব অথচ শক্তিশালী ভাষা। প্রতিটি ভোটদানের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে স্পষ্ট বার্তা। এই ভাষা ব্যক্তিগত, আবার একই সঙ্গে সমষ্টিগত। কেউ যখন ভোট দেন, তখন শুধু নিজের জন্য নয়— তাঁর চার পাশের মানুষ, সমাজ এবং আগামী প্রজন্মের পক্ষেও একটি সিদ্ধান্ত নেন। ফলে, ‘ভোটের আমি’ কখনওই একা নয়, তার ভিতরে মিশে থাকে ‘ভোটের তুমি’ও।
গণতন্ত্রের আয়নায় তাকালে আমরা কেবল শাসককে দেখি না, দেখি নিজেদেরও। আমাদের পছন্দ-অপছন্দ, মূল্যবোধ, এমনকি দুর্বলতাও সেখানে প্রতিফলিত হয়। যদি আমরা উন্নয়ন, স্বচ্ছতা ও মানবিকতার পক্ষে ভোট দিই, তবে সেই চিত্রই স্পষ্ট হয় রাষ্ট্রের নীতিতে। আবার যদি আমরা বিভাজন, ভয় বা প্রলোভনের কাছে আত্মসমর্পণ করি, তবে সেই ছায়াই দীর্ঘ হয় আমাদের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভোটের চরিত্রও বদলেছে। এক সময় ভোট ছিল প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় বাস্তবতার উপর নির্ভরশীল। আজ তা তথ্যপ্রবাহের বিস্তৃত জালে আবদ্ধ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন, ডিজিটাল প্রচার— সব মিলিয়ে ভোটার আজ বহুমাত্রিক প্রভাবের মুখোমুখি। কিন্তু এই প্রাচুর্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে বিভ্রান্তির ঝুঁকি। সত্য-মিথ্যার মিশেলে তৈরি তথ্যের ভিড়ে সচেতন নির্বাচন করাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
‘ভোটের তুমি’ ধারণাটি আমাদের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়— সহনশীলতা। গণতন্ত্রে ভিন্নমত অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু সেই ভিন্নতা যদি শত্রুতায় রূপ নেয়, তবে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই অন্যের পছন্দকে সম্মান করা, সংলাপের মাধ্যমে মতভেদ মেটানো— এ সবই পরিণত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির লক্ষণ।
ভোটের দিনটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আত্মসমালোচনার দিন। আমরা যেন আয়নায় নিজেদের স্পষ্ট ভাবে দেখতে পারি— দায়িত্বশীল, সচেতন এবং মানবিক নাগরিক হিসেবে। কারণ শেষ পর্যন্ত, গণতন্ত্রের সত্যিকারের প্রতিচ্ছবি কোনও প্রতিষ্ঠান নয়, আমরা নিজেরাই। তাই, ‘ভোটের আমি’ আর ‘ভোটের তুমি’ আলাদা কেউ নয়— একই গণতান্ত্রিক চেতনার দু’টি রূপ।
পিয়ালী ঘোষ, শ্রীরামপুর, হুগলি
নাম-মাহাত্ম্য
সপ্তর্ষি রায় বর্ধনের ‘নামের আমি নামের তুমি’ (রবিবাসরীয়, ১৯-৪) শীর্ষক প্রবন্ধ নিয়ে কিছু কথা। বিগত শতকের শেষ দিক পর্যন্ত শিশুদের নামকরণ, বিশেষত ডাকনামটি রাখতেন আত্মীয়স্বজন বা পাড়া-প্রতিবেশীরা। হাঁদা, ভোঁদা, ভেটকা, ফেলি, বুঁচি, পেঁচি নামে অভিহিত দু’চার জনের খোঁজ সব পাড়াতেই পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে সব পরিবারে সাধারণত একটি, খুব বেশি হলে দু’টি সন্তান। সন্তানের নামকরণের জন্য অভিভাবকেরা চেষ্টা করেন যাতে নামটি হয় ব্যতিক্রমী, উচ্চারণে জিভে যেন একটু জড়তা আসে। তবেই না নামকরণের সার্থকতা।
দেড় শতক পেরিয়ে এসেও রবীন্দ্রনাথ আজও আধুনিক, তাঁকে ছাড়া বাংলা সংস্কৃতি শূন্য। অথচ, রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে-গল্পে ওই সব জিভে জড়তা আসা নাম দিয়ে চরিত্র চিত্রিত করেননি। কারণ সেই রকম নাম দিয়ে নৌকাডুবি, ঘরে বাইরে সাজালে বড় বেমানান লাগত। একটা সময় ছেলেমেয়েদের নাম রাখা হত ঠাকুর-দেবতার নামে। ওদের নাম ধরে ডাকলে সঙ্গে দেবদেবীর নামটিও উচ্চারিত হত। এখনও বাংলার প্রতিটি গ্ৰাম-শহরে খোঁজ নিলে একাধিক মদন, হারু, নিমাই, দুর্গাপদ, কানাই পাওয়া যাবে, যাঁরা আজ প্রবীণ। কিন্তু নব প্রজন্মে ওই নামে প্রায় কাউকেই পাওয়া যাবে না।
কবি বলেছেন, নামে কী আসে যায়। কিন্তু, সাইক্লোনের নাম যদি হয় বুলবুল, নার্গিস, তা হলে সে বসন্তের গান গাইবে না, তার সঙ্গীতে থাকবে ধ্বংসের লীলা।
রাজীব ঘোষকুসুমদিঘি, বাঁকুড়া
ক্রসিংয়ে গাড়ি
সিগন্যালে অনেক সময় দু’চাকা, চার চাকার আরোহীরা জ়েব্রা ক্রসিংয়ের উপরেই গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখেন। এতে পথচারীদের রাস্তা পারাপারে অসুবিধা হয়। রাস্তায় উপস্থিত ট্র্যাফিক পুলিশ আধিকারিকরা এই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করলে ভাল হয়।
অজয় সাঁতরা, কলকাতা-৩৫
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)