মায়ের জন্মদিন। মাকে নিয়ে লিখতে গেলে কথা শেষ হয় না। আমি সৌভাগ্যবান, মায়ের বহু ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও, আমি মায়ের সাহচর্য পেয়েছি। মায়ের সঙ্গে ছোট থেকেই সারা পৃথিবী ঘোরার সুযোগ পেয়েছি আমি। আমার স্কুলের পড়াশোনা তো ছিলই। তার মধ্যেও সব দিক সামাল দিয়ে আমি মায়ের সঙ্গে দেশবিদেশে ঘুরেছি। যার ফলে বিভিন্ন স্থানের পারফর্মিং আর্ট দেখা এবং নানা কিছু শেখার সুযোগ পেয়েছি মায়ের জন্য।
আমি তখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। টানা সাড়ে তিন মাসের ইউরোপ ভ্রমণে গিয়েছিলাম। আমার স্কুলের (সেন্ট জে়ভিয়ার্স) প্রিন্সিপাল-এর সঙ্গে দেখা করে অনুমতি নিতে গিয়েছিলেন মা। তখন ফাদার বুশে বলেছিলেন, ‘অবশ্যই ওকে নিয়ে যান। চার দেওয়ালের মধ্যে থেকে ও যা শিখবে, আপনার সঙ্গে ভ্রমণ করে তার চেয়ে অনেক বেশি শিখবে ও।’ তবে এ সবের পরেও, মা-কে কিন্তু আদ্যোপান্ত মা হিসাবেই আমরা পেয়েছি বাড়িতে। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের শিল্পীসত্তাটাকে বুঝতে পেরেছি। আসলে ছোটবেলা থেকেই বোঝানো হয়েছে, পা যেন মাটিতে থাকে। যেন কখনও আমাদের মধ্যে থেকে বিনয় চলে না যায়। তবে সীমা থাকে সব কিছুরই। তাই বিনয়ী হওয়ার জন্য অন্য কেউ যেন সুযোগ না নিতে পারে, সেই শিক্ষাও আমাদের দেওয়া হয়েছে।
প্রত্যেক পরিবারেরই একটা ধারা থাকে, যা বহন করে নিয়ে যেতে হয়। কিন্তু আমাকে কখনও কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। এমন ভাবে বড় করা হয়েছে আমাদের, এমনিতেই কিছু মূল্যবোধ তৈরি হয়ে গিয়েছে। আলাদা করে আমাদের বলে দিতে হয়নি কিছু।
মায়ের কিছু বিষয়ে স্পষ্ট মতামত রয়েছে। মা সেগুলি প্রকাশও করেন কোনও রাখঢাক না করে। তাই আমিও ট্রোলিং-কে পাত্তা দিই না। এঁরা এই ট্রোল করার যোগ্য কি না, সেটাই তো একটা বড় প্রশ্ন। একটা মানুষের নিজস্ব মতামত থাকতেই পারে। সেটার সঙ্গে আপনি একমত না-ই হতে পারেন। আমার মা যা যা বলে এসেছেন, তার বেশির ভাগের সঙ্গেই আমি একমত। আবার কিছু বিষয়ে হয়তো দ্বিমত রয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক। ভিন্নমত হলে মায়ের সঙ্গে আলোচনা করি। সেটাই তো সুস্থ সমাজের লক্ষণ। আমি বুঝি না, বর্তমান সমাজে সবাই কেন এত অসহিষ্ণু। কারও কারণ থাকতে পারে। কিন্তু অযৌক্তিক ভাবে বা অকারণে যারা রাগ দেখায় তাদের নিয়ে ভাবতেই চাই না।
মা মমতাশঙ্করের সঙ্গে রাতুলশঙ্কর। ছবি: সংগৃহীত।
সবচেয়ে বড় বিষয় হল, মাকে প্রশ্ন করা হলে মা উত্তর দিয়েছেন। মা শুধুমাত্র নিজের বিশ্বাস, নিজের ভাবনাটুকু প্রকাশ করেছেন। কখনও তো বলেননি, ‘আমি যা বলছি সেটাই মানতে হবে।’ সেটা বুঝে মানুষ প্রতিক্রিয়া দেবেন, এটাই আশা করব। না করলে তো সত্যিই কিছু করার নেই। উনি যেমন, তেমনই থাকবেন।
ভারতীয় মধ্যবিত্ত পরিবারের মায়েরা যেমন হন, তেমই আমার মা-ও। কখনও তারকাসুলভ কোনও বিষয় আমাদের মধ্যে আসেইনি। বহু ব্যস্ততার মধ্যেও আমাদের শৈশবকে অনেকটা সময় দিয়েছেন মা-বাবা দু’জনেই। মাত্র তিন বছর বয়স থেকে মায়ের সঙ্গে দেশবিদেশ ভ্রমণ যেতাম। মনে আছে, সেই বার ‘চণ্ডালিকা’ মঞ্চস্থ করছিলেন মা। মঞ্চের পাশে হাতে একটা হ্যামবার্গার দিয়ে আমাকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। খেতে খেতেই ঘুমিয়ে পড়েছি হয়তো। মা কিন্তু তার মধ্যেই ফাঁক পেয়ে দেখে যাচ্ছিলেন আমাকে।
খাবারের প্রসঙ্গে বলি, মা কিন্তু খুব ভাল রান্না করেন। মায়ের হাতের প্রন ককটেল অসাধারণ। এখনও রেঁধে খাওয়ান। মা চিজ় টোস্ট বানান। রান্নাটা হয়তো খুবই সাদামাঠা। কিন্তু স্বাদে কোনও ঘাটতি ছিল না। এখনও সেই স্বাদ মুখে লেগে। মায়ের হাতের মাটন চপও আমার খুব পছন্দের। সাধারণ ডাল, তরকারিও খুব ভাল রান্না করেন মা। আমাকে কিন্তু অনেক বড় বয়স অবধি নিজে হাতে ডালভাত মেখে খাইয়ে দিয়েছেন। সেটারও এক অন্য স্বাদ রয়েছে।
এখন আমাদের সকলের ব্যস্ততা বেড়েছে। তবে আমার স্ত্রী ও আমার ভাই ও ভাইয়ের স্ত্রী মায়ের নাচের সংস্থার অংশ। ওরা ছোট থেকেই মায়ের কাছে নাচ শিখেছে। তাই মায়ের সঙ্গে ওদের অনেকটা সময় কাটে। ব্যস্ততার মাঝেও চেষ্টা করি বছরে একটা সময় যেন আমরা সকলে মিলে কোথাও একটা যেতে পারি।
মায়ের জন্মদিন উপলক্ষে আজ হয়তো সকলে একসঙ্গে কিছুটা সময় কাটবে। মাকে যাঁরা আশীর্বাদ করে এসেছেন, তাঁদের বেশির ভাগই আজ নেই। ক্রমশ তেমন মানুষ কমে আসছে। তবে আমাদের এক দাদু রয়েছেন। তিনি হলেন আমার দিদিমা অমলাশঙ্করের সবচেয়ে ছোট ভাই বিশু নন্দী। মাত্র ৯৭ বছর এখন ওঁর! প্রতিভাবান চিত্রগ্রাহক ছিলেন একসময়ে। তিনি মাকে আশীর্বাদ করবেন। আর আমার বাবা আশীর্বাদ করবেন। আর আমরা পায়েস খাওয়াব আর মায়ের থেকে অনেক অনেক আশীর্বাদ নেব।