তিনি কোনও দলের দরবারে যান না। ‘অনন্ত’ শক্তির সাহায্য পেতে দলগুলি বরং তাঁর দরবারে আসে। কারণ, তিনি যে দলে, জয়ও সেই দলে! আরও এক বার সে কথা প্রমাণ করে দিল বিহারের বিধানসভা নির্বাচন। রাজধানী পটনা সংলগ্ন মোকামা কেন্দ্রে বিপুল ভোটে জিতলেন অনন্তকুমার সিংহ। এ বার শাসকদল জেডিইউ-এর টিকিটে। ভোটের ঠিক পাঁচ দিন আগে প্রতিপক্ষের কর্মীকে খুনের অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। ভোটবাক্সে সেই গ্রেফতারির কোনও প্রভাবই পড়ল না!
বিহারের ‘বাহুবলী’ নেতা হিসাবে পরিচিত অনন্ত। ২০০৫ সাল থেকে মোকামায় তাঁর রাজত্ব চলছে। একাধিক বার দল বদলেছেন, কিন্তু কখনও ভোটে হারেননি। অনেকে তাঁকে ‘ছোটে সরকার’ও বলেন। মোকামায় এ বার তাঁর বিরুদ্ধে আরজেডি-র টিকিটে দাঁড়িয়েছিলেন বীণা দেবী। তিনি অনন্তের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী সুরজভান সিংহের স্ত্রী। সুরজভান নিজেও মোকামায় ‘বাহুবলী’। কিন্তু তাঁর স্ত্রী অনন্তের কাছে হারলেন ২৮২০৬ ভোটে। এ ছাড়া, প্রশান্ত কিশোরের দল জন সুরাজ পার্টির হয়ে মোকামায় লড়েছেন প্রিয়দর্শী পীযূষ। নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, ১৯ হাজার ভোট পেয়ে ওই আসনে তিনি তৃতীয়।
আরও পড়ুন:
কয়েক মাস আগে মোকামায় প্রিয়দর্শীর হয়ে প্রচারে বেরিয়ে তাঁর আত্মীয় ৭৫ বছরের দুলার চাঁদ যাদব খুন হন। অভিযোগ, অনন্ত তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন। এর পর তাঁর দলের কর্মীরা বেধড়ক মারধর করেন ওই বৃদ্ধকে। পিষে দেওয়া হয় গাড়ি দিয়ে। এই খুনের ঘটনায় জেডিইউ প্রার্থীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। জেলে যেতে যেতেই অনন্ত ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, মোকামায় তাঁর জয় শুধু সময়ের অপেক্ষা। বলেছিলেন, ‘‘সত্যের জয় হবেই।’’ অনেকে অবশ্য মনে করেছিলেন, ভোটের মুখে প্রার্থীর গ্রেফতারিতে শাসকদল কিছুটা হলেও অস্বস্তিতে থাকবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, আরজেডি বা পিকের দল ‘অনন্ত’ শক্তির সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে গেল। প্রতি বারের মতো এ বারেও তিনি জিতলেন। রেকর্ড ব্যবধানে জিতলেন।
শুক্রবার বিহারে ভোটগণনার সকাল থেকেই মোকামা ‘অনন্তময়’। তাঁর বাড়ির সামনে তাঁবু খাটিয়ে লোকজনকে ভরপেট খাওয়ানোর বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সমর্থকদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে। এমনকি, মোকামার দেওয়ালে পোস্টার পড়েছে, ‘জেল কা ফটক টুটেগা, হামারা শের ছুটেগা’!
২০০৫ সালে মোকামা থেকে জেডিইউ-এর টিকিটে প্রথম ভোটে জিতেছিলেন অনন্ত। সেই আসন ধরে রাখেন ২০১০-এও। কিন্তু ২০১৫ সালে লালুপ্রসাদ যাদবের দলের সঙ্গে নীতীশ কুমার হাত মেলালে জেডিইউ ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন অনন্ত। নির্দল হিসাবে মোকামায় লড়েছিলেন, হারিয়ে দিয়েছিলেন জেডিইউ প্রার্থীকেই! ২০২০ সালের নির্বাচনের আগে আবার আরজেডি-তে যোগ দেন অনন্ত। তত দিনে নীতীশ-লালুর ‘বিচ্ছেদ’ হয়ে গিয়েছে। রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেলেও মোকামা কিন্তু বদলায়নি। সেখানে আরজেডি প্রার্থী অনন্ত জেতেন। ২০২২ সালে অস্ত্র সংক্রান্ত একটি মামলায় তাঁর নাম জড়িয়ে গিয়েছিল। তাতে বিধানসভার সদস্যপদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন অনন্ত। তবে উপনির্বাচনে তাঁর আসনে লড়েন তাঁর স্ত্রী নীলম দেবী। তিনিই জিতে বিধায়ক হন!
এ বছর আরজেডি-র হাত ছেড়ে আবার জেডিইউ-তে ফিরেছেন মোকামার ‘ছোটে সরকার’। বিহারের ভোট সম্পর্কে যাঁরা ওয়াকিবহাল, তাঁরা গ্রেফতারি সত্ত্বেও অনন্তের জয় নিয়ে একপ্রকার নিশ্চিত ছিলেন। দেখা গেল, ভোটের ফলাফলে খুব একটা ফারাক হল না।
মনোনয়নপত্র অনুযায়ী, অনন্তের বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে ২৮টি মামলা রয়েছে। তার মধ্যে খুন, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, অত্যাচার, অপহরণ এবং হেনস্থার অভিযোগ অন্যতম। এ ছাড়া, চুরি, অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়া এবং অস্ত্র সংক্রান্ত একাধিক মামলাও রয়েছে। হলফনামা বলছে, অনন্ত ১৩ কোটি টাকার স্থাবর সম্পত্তির মালিক। রয়েছে একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি (২ কোটির টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজ়ার, এবং টয়োটা ফরচুনার এসইউভি)। এ ছাড়া, একটি হাতি, একটি ঘোড়া এবং বেশ কিছু গবাদি পশুর মালিক মোকামার ‘ছোটে সরকার’। স্থাবর, অস্থাবর মিলিয়ে তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ ৩৭.৮৮ কোটি টাকা। তাঁর স্ত্রী তথা মোকামার বিদায়ী বিধায়কের ৬২.৭২ কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- ৬ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার বিহারে প্রথম দফার নির্বাচন। দ্বিতীয় দফার নির্বাচন হবে আগামী মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর)। ভোটগণনা এবং ফলপ্রকাশ হবে ১৪ নভেম্বর। বিহারবাসীর জন্য সব দলই ঢালাও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এক কোটি চাকরি থেকে শুরু করে মহিলাদের অর্থসাহায্য— বাদ নেই কিছুই। বিরোধীরা তেজস্বী যাদবকে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করেছে। নরেন্দ্র মোদী থেকে অমিত শাহ, বার বার বিহারে প্রচারে এসে জানিয়েছেন, নীতীশ কুমারের নেতৃত্বেই লড়বে এনডিএ। তবে ভোটে যদি এনডিএ জেতে তবে মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে ধোঁয়াশা জিইয়ে রেখেছে শাসকজোট।
- রাজ্যের ২৪৩টি বিধানসভা কেন্দ্রে লড়াই মূলত এনডিএ এবং আরজেডি-কংগ্রেস-বামেদের জোট মহাগঠবন্ধনের মধ্যে। লড়াইয়ে আছে প্রাক্তন ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোর (পিকে)-এর জন সুরাজ পার্টিও। মোট ২৪৩টি আসনের মধ্যে ১০১টি আসনে লড়ছে বিজেপি আর নীতীশ কুমারের জেডিইউ ১০১টি আসনে লড়ছে। চিরাগ পাসওয়ানের লোক জনশক্তি পার্টি (রামবিলাস) লড়ছে ২৯টি আসনে। অন্য দিকে, বিহারের অনেক বিধানসভা কেন্দ্রেই মহাগঠবন্ধনের জোটসঙ্গীরা একে অপরের বিরুদ্ধে প্রার্থী দিয়েছে। শাসকজোট এ নিয়ে কটাক্ষ করলেও বিরোধীদের দাবি, ‘বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই’।
-
নীতীশের মন্ত্রিসভায় সংখ্যাধিক্য বিজেপির-ই! আরও ৯ জনকে পরে নেওয়ার রাস্তা খোলা রাখল এনডিএ, বাকি কাদের কত মন্ত্রী?
-
বিজেপির শরিক নীতীশ কুমারকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিলেন তৃণমূলের শত্রুঘ্ন সিন্হা! ‘বিহারিবাবু’র কাণ্ড সম্পর্কে অবগত দলনেতা অভিষেক
-
এসআইআরের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরেও তিন লক্ষ ভোটার বাড়ল কী ভাবে? কংগ্রেসের প্রশ্নের জবাব দিল কমিশন
-
কিডনি দান করেছেন বাবাকে, লালুকন্যা সেই রোহিণীই সব সম্পর্ক ছিন্ন করলেন পরিবারের সঙ্গে! দাবি, ছাড়ছেন রাজনীতিও
-
‘পল্টুরাম’ থেকে অসুস্থতার অভিযোগ, কাজে এল না কিছুই, নীতীশ বুড়ো হন, কিন্তু হারেন না