শুধু সার্বিক পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ নয়। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে বিরোধী সাংসদেরা যে নোটিস দিয়েছেন, তাতে তাঁর বিরুদ্ধে আরও নানা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম, তাঁর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম। রয়েছে, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগ। তা ছাড়া গত বছর জ্ঞানেশের নামে আপত্তি জানিয়ে রাহুল যে ‘নোট’ দিয়েছিলেন, তারও উল্লেখ রয়েছে নোটিসে। আনা হয়েছে, ভোটে কারচুপিতে মদত দেওয়ার অভিযোগও।
শুক্রবার সংসদের উভয় কক্ষে জমা দেওয়া ওইউ নোটিসে সিইসি পদ থেকে কুমারকে অপসারণের জন্য একটি প্রস্তাব আনার দাবি করা হয়েছে। ১৯৩ জন বিরোধী সাংসদ (লোকসভার ১৩০, রাজ্যসভার ৬০) নোটিসে সই করেছেন। সেখানে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে আপত্তি জানিয়ে এবং ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন তাঁরা। সিইসি-কে অপসারণের প্রক্রিয়া সুপ্রিম কোর্ট বা হাই কোর্টের বিচারপতিকে অপসারণের প্রক্রিয়ার মতোই— ‘প্রমাণিত অসদাচরণ বা অক্ষমতা’-র যুত্তিতেই কেবল অপসারিত (ইমপিচ) করা যেতে পারে তাঁকে।
বিরোধী সাংসদদের ১০ পাতার এই নোটিসে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে লোকসভার বিরোধী দলনেতার জমা দেওয়া একটি ‘ভিন্নমত (ডিসেন্ট) নোটে’র উল্লেখ রয়েছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী বিদায়ী সিইসি রাজীব কুমারের উত্তরসূরি মনোনয়নের জন্য বৈঠকে বসেছিলেন। সেখানে জ্ঞানেশের নামে আপত্তি জানিয়ে ওই ‘ডিসেন্ট নোটে’ রাহুল লিখেছিলেন, “কমিটির গঠন এবং প্রক্রিয়া সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে এবং ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে শুনানি হওয়ার কথা থাকা সত্ত্বেও নতুন সিইসি নির্বাচনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যরাতে সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত অসম্মানজনক ও অশোভন।”
বিরোধী সাংসদদের নোটিসে ২০২৫ সালের অগস্টে সাংবাদিক বৈঠক থেকে রাহুলের উদ্দেশে সিইসি-র প্রকাশ্য আল্টিমেটামের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বিরোধীদের ‘ভোট চুরি’-র অভিযোগের প্রেক্ষিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে জ্ঞানেশ বলেছিলেন, ‘‘বিরোধী দলনেতাকে হয় ক্ষমা চাইতে, নয়তো নির্বাচনী নিয়ম অনুযায়ী স্বাক্ষরিত হলফনামা দিয়ে তাঁর দাবি প্রমাণ করুন।’’ নোটিসে কর্নাটকের আলান্দ এবং মহাদেবপুরায় ভোটার তালিকায় কারসাজির অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে, যা বিরোধী দলগুলো তুলেছিল। বিরোধী শিবির জানিয়েছে, নোটিসগুলিতে জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে মোট সাতটি অভিযোগ আনা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ‘পক্ষপাতদুষ্ট ও বৈষম্যমূলক আচরণ’, ‘নির্বাচনী জালিয়াতির তদন্তে ইচ্ছাকৃত বাধা সৃষ্টি’ এবং ‘বৃহৎ পরিসরে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা’।
বিরোধী দলগুলো একাধিকবার সিইসি-র বিরুদ্ধে বিজেপি-কে সহায়তা করার অভিযোগ তুলেছে, বিশেষ করে এসআইআর প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে। অভিযোগ, কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে এসআইআর। যদি সংসদের উভয় কক্ষেই বিরোধীদের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়, তা হলে লোকসভার স্পিকার এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যান যৌথ ভাবে একটি কমিটি গঠন করবেন। সেই কমিটিতে থাকবেন ভারতের প্রধান বিচারপতি অথবা সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র বিচারপতি, ২৫টি হাই কোর্টের যে কোনও একটির প্রধান বিচারপতি এবং একজন ‘বিশিষ্ট আইনজীবী’।
কমিটির কাজ আদালতের মতোই পরিচালিত হয়— সাক্ষী এবং অভিযুক্তকে জেরা করা হয়। সিইসি-ও এই প্যানেলের সামনে বক্তব্য রাখার সুযোগ পাবেন। নিয়ম অনুযায়ী, কমিটি তাদের রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর তা সংসদে উপস্থাপন করা হবে এবং ইমপিচমেন্ট নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। সিইসি-কে অপসারণের প্রস্তাব উভয় কক্ষেই পাশ করাতে হবে। সংসদে প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা চলাকালীন, অধিবেশনে নিজের পক্ষে সাফাই দেওয়ার অধিকার থাকবে জ্ঞানেশের। প্রসঙ্গত, জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে প্রথম অপসারণের প্রস্তাব আনতে উদ্যোগী হয়েছিল তৃণমূল।