Advertisement
E-Paper

পুরনো চাল কি ফ্যাশনেও বাড়ছে? বাঙালির ‘চাল’-বাজির হাল-হকিকত ঠিক কেমন এখন

যে জাতির নামের আগে ভাতের বিশেষণ বসে, যাদের নিরাপদ জীবনের ‘কোড’ই হল দুধে-ভাতে থাকা, সেই ভেতো বাঙালির চাল নিয়ে এটুকু খুঁতখুঁতুনি মকুব। যদিও বঙ্গসমাজের ‘চাল’-চলন ইদানীং বদলেছে।

ঐন্দ্রিলা বসু সিংহ

শেষ আপডেট: ০১ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫৯
গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ

সরু না কি মোটা, লম্বা না বেঁটে, সুগন্ধ থাকবে কি থাকবে না, রান্না হলে জুঁই ফুলের পাপড়ির মতো ঝুরঝুরে হবে না কি দানা দানা আলাদা করে বোঝা যাবে না, রং কতটা ধবধবে হবে, কতখানি লালচে— এই সব শর্ত বিচার করে রোজের খাওয়ার চাল আসে বাড়িতে।

যে জাতির নামের আগে ভাতের বিশেষণ বসে, যাদের নিরাপদ জীবনের ‘কোড’ই হল দুধে-ভাতে থাকা, সেই ভেতো বাঙালির চাল নিয়ে এটুকু খুঁতখুঁতুনি মকুব। যদিও বঙ্গসমাজের ‘চাল’-চলন ইদানীং এক অন্য পথে পা বাড়িয়েছে।

চাল হঠাৎ করে অন্দরমহলের আড়াল ছেড়ে পা রেখেছে বারবাড়িতে। রান্নাঘর, খাওয়ার ঘরের দরজা ডিঙিয়ে ঢুকে পড়েছে উচ্চবিত্তের বসার ঘরের নরম গরম আলোচনায়। যেখানে চাল শুধু গৃহস্থের প্রয়োজন নয়, কেবল তাঁর শৌখিন রুচির পরিচায়ক নয়, বন্ধুবান্ধব, পরিচিতের সামনে চালিয়ে খেলার অস্ত্রও। একটু ভিন্ন ঘরানার চালবাজির হাতিয়ার।

বছর কয়েক আগেও বাড়িতে অতিথি এলে কিনে আনা হত বাসমতি চাল। কারণ শহুরে বাঙালির মনে ভাল চালের মাপকাঠি ছিল লম্বাটে সরু দানার সুগন্ধি ঝরঝরে ভাত। তার জন্য বাধ্য হয়েই নিজের ভাঁড়ার ছেড়ে দ্বারস্থ হতে হত ভিন রাজ্যের। আপন চালের ভান্ডারে ‘বিবিধ রতন’- এর খোঁজ তারা পেল পরে। বুঝল, রাজার ঘরের থেকেও বেশি ধন আছে ‘টুনির ঘরে’। শুরু হল মস্তানি!

শহুরে চালের কৌটোয় আচমকাই বাসমতি, বাঁশকাঠি, গোবিন্দভোগের সাম্রাজ্য পতন ঘটল। অকালবোধন হল তুলাইপাঞ্জি, কনকচূড়, রাধাতিলক, রাঁধুনিপাগল, বিন্নি, ভূতমুড়ি, কালো নুনিয়ার। সারা বছরের গড়পড়তা চাল নিয়মমাফিক এল। তার পাশাপাশি, শপিং মল, অরগ্যানিক স্টোর, বুটিক রেস্তরাঁ থেকে বেশি দাম দিয়ে নানা স্বাদের, গন্ধের, আকারের চাল কিনে পরম যত্নে ভাঁড়ার ঘর সাজাতে শুরু করলেন নগরবাসী। সে সব চালের ঠিকুজি কুলুজিও হল কণ্ঠস্থ। এ বার প্রদর্শনের পালা।

ডাকা হল অতিথি। একদা ‘পাঁঠার মাংস, ভাল মাছ খাওয়াবো’ বলে লোভ দেখানো অতিথিবৎসল বাঙালি বলল, ‘ভাল ভাত খাওয়াবো’। টেবিলে সবই সাজল— শুক্তো, ডাল, দোলমা। পাতুরি থেকে সর্ষেবাটা মাছ হয়ে কষা মাংস। কিন্তু ‘স্টার ভ্যালু’ তে সবাইকে টপকে গেল ভাত। আপ্যায়ক অতিথিকে শতমুখে শোনালেন কোন জেলার কোন গ্রামের কোন চাল কেন বিখ্যাত? কোন রাজার ভোজে ব্যবহার হত তা। আর কেন সেই চালের ভাত লম্বা দানার বাসমতির চেয়েও বেশি উপভোগ্য। কেন সে সব চালের স্বাদের ব্যাপারে অবগত হওয়া প্রয়োজন।

ধন-ধান্যে ভরা বঙ্গভূমি। নানা ধরনের চালের ভান্ডার। আলো-বাতাস বদলালেই স্বাদ, গন্ধ, গড়ন এবং স্বাস্থ্যগুণ বদলে ফেলে সোনার ফসল। সে সব প্রকারভেদের কিছু নামে-ডাকে শহুরে কানে পৌঁছেছিল। কিছু চাল ঢেঁকি ছেঁটে, তুষ বেছে প্রস্তুত হওয়ার পরেও গ্রাম ছাড়িয়ে জেলার বেড়া পেরোয়নি। আবার কোনও চাল রাজারাজড়া-জমিদারগোত্রীয়েরা সামলে রেখেছিলেন কেবল নিজেদের জন্য। ফলে হাতে পড়েনি সাধারণের।

দেখা গেল, সে সব চাল আচমকাই গ্রামের ধানের মরাই থেকে লাফ দিয়ে ঢুকে পড়েছে ঝকঝকে শহুরে বিপণিতে। বুটিক রেস্তরাঁর ‘ফার্ম টু টেবল’ বিভাগের সাজানো তাকে। সপ্তাহান্তে সান্ধ্য ভ্রমণে বেরিয়ে কফি খেতে গিয়ে উত্তরবঙ্গের কালো নুনিয়া, তুলাইপাঞ্জি কিনে বাড়ি ফিরছেন শহুরে শৌখিন কর্তা-গিন্নি। ঘরোয়া আড্ডায় বন্ধুদের শোনাচ্ছেন ‘চালকুলের রাজপুত্র’ কালো নুনিয়ার গল্প। যে চাল কোচবিহারের মহারাজার প্রিয় ছিল। যে চাল রাজবাড়ির দেবভোগে ব্যবহার হত। রাজার দরবারে যেত বলে নাগালই পেতেন না প্রজারা। অথবা তর্ক হচ্ছে আমের মুকুলের গন্ধে ভরা তুলাইপাঞ্জি চালের সঙ্গে বাসমতির টক্কর নিয়ে। কে এগিয়ে?

ক্যাফে, রেস্তরাঁগুলিতে এই চাল-বিপ্লব শুরু হয়েগিয়েছিল আগেই। বিদেশি খাবারকে দেশি ছোঁয়া দিতে তারা ব্যবহার করতে শুরু করেছিল বাংলার সেই সব চাল, যার ধরন-ধারণ বিদেশের চালের সঙ্গে মিলে যায়। যেমন ইটালির রিসোতো বানানোর জন্য যে সুগন্ধী, ছোট দানার নরম ভাতের দরকার তার সঙ্গে মিলে যায় কালো নুনিয়া বা তুলাইপাঞ্জি। আবার জাপানের সুশি বানানোর জন্য চালে থাকা দরকার চিটচিটে, আঠালো ভাব। তার জন্য কলকাতার রেস্তরাঁয় রন্ধনশিল্পীরা বেছে নিলেন বিন্নি ধান। যা দিয়ে তৈরি হয় খই।

অবশ্য শুধু বিদেশি খাবারই বা কেন, খাঁটি দিশি এবং বাঙালি খাবারেও বাংলার নানা ধরনের চালের ব্যবহার হয়েছে। যেমন মল্লিফুলো চালের ভুনি খিচুড়ি, রাধাতিলকের ইলিশ পোলাও, কনকচূড়ের সঙ্গে নলেন গুড় মিশিয়ে তা দিয়ে তৈরি ক্ষীর পুডিং অথবা সুফলে। এ সবই শহুরে মানুষ বিরিয়ানি, চাইনিজ় ফেলে পরমোৎসাহে খাচ্ছেন। তবে এই ট্রেন্ড-এ সবচেয়ে বেশি অভিনব হল ‘খুদ ভাত’।

খুদ হল ভাঙা চাল। ধান ভানার সময়ে যে চাল ভেঙে যায়, ভাল চাল থেকে আলাদা করে দেওয়া হয় তাকে। কিন্তু ফেলে দেওয়া হয় না। সে চালেরও খরিদ্দার আছে। অভাবের সংসারে ভাল চাল কেনার সামর্থ্য নেই যাঁদের, তাঁরা কম দামে খুদ কিনতেন বা হয়তো আজও কেনেন। খুদ থেকে তৈরি ভাতকে বলা হয় বউয়া। তবে সেই ভাত সচরাচর উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্তের হাঁড়িতে উঠত না। বাঙালির চালবাজির দৌলতে সেই বিভাজনও ঘুচেছে। অভাবের খুদ এখন ‘আপস্কেল’ রেস্তোরাঁর লব্জে হয়েছে ‘ব্রোকেন রাইস’। এ শহরেরই নামী রেস্তরাঁয় চালের খুদের সঙ্গে সাজিয়েগুছিয়ে পরিবেশন করা হয় ডাল-ভাজা-মাছের ঝোল। সাধারণ হোটেলের ডাল-ভাত-মাছের ঝোলের থেকে অনেক গুণ বেশি দাম দিয়ে সেই খাবার কিনে খান বিত্তবান বঙ্গজেরা। ছবি-সহ ইনস্টাগ্রাম পোস্টে জানান, ‘ব্রোকেন রাইস উইথ মাছের ঝোল’ খেয়ে পাওয়া তৃপ্তির কথা!

চাল কি তবে দেখনদারির বিষয় হল? নানা ধরনের, নানা নামের চালের ভাত খাওয়া কি এ যুগের ‘ফুড ফ্যাশনের’ নতুন ধারা? না কি বেশি দাম দিয়ে চাল কিনে আর্থিক শ্রীবৃদ্ধির বিজ্ঞাপন করছেন কিছু মানুষ?

চাল যে স্বাচ্ছল্যের কথা বলে না, তা নয়। বঙ্গে আরাধ্যা সমৃদ্ধির দেবীর হাতে তো ধানের ছড়াই ধরা থাকে। নতুন ধান উঠলে নব-অন্নের পার্বণ হয় দেশের বিভিন্ন রাজ্যে। অর্থাৎ সম্পদের প্রতীক হিসাবে চালের উদযাপন যুগ যুগ ধরেই হয়ে আসছে। কিন্তু এই চালবাজির লক্ষ্য ঠিক আর্থিক সমৃদ্ধির আস্ফালন নয়। বরং অনেক বেশি নিজের মাটি, নিজের সংস্কৃতি আর নিজের ঐতিহ্যের সমৃদ্ধিকে বুক বাজিয়ে বলা।

কংক্রিটের দেয়ালের এ পারে বসে যে সবুজ প্রান্তের সঙ্গে শুধুমাত্র খাবারে থালাতেই জুড়ে থাকে বঙ্গের দুই দুনিয়ার সুতো, এ চালবাজি সেই একহারা সুতোর টানের উদযাপন।

একে দু’ভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, এক, যেটা সাদা চোখে দেখা যাচ্ছে— মাটির সঙ্গে জুড়ে থাকাটাই এ যুগের ‘ফ্যাশন স্টেটমেন্ট’। অথবা দুই, ফ্যাশনের স্মার্ট আবডালে মাটির সঙ্গে চিরকালীন টান আশ মিটিয়ে অনুভব করছেন শহুরেরা।

কারণ যা-ই হোক, একটি বিষয় ধ্রুব—

পুরনো চাল শুধু ভাতে নয়, বাঙালির শৌখিন যাপনেও বাড়ছে সমান ভাবে।

Rice Bengali Rice Grains tulaipanji rice Kalo nunia Rice Bengali Food Rice Love
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy