ধর্মের নামে চলছে গণপিটুনি। সরকার বিরোধী কথা বললেই দেগে দেওয়া হচ্ছে দেশদ্রোহী বলে। ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি পরিণত হয়েছে যুদ্ধের স্লোগানে। এমনই সব অভিয়োগ তুলে এবং মুক্ত চিন্তাধারার পক্ষে সওয়াল করে এ বার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে খোলা চিঠি লিখলেন বিদ্বজ্জনরা। কেন্দ্র তথা মোদী সরকারকে কাঠগড়ায় তুলে অবিলম্বে ধর্মের নামে এই উন্মাদনা বন্ধ করার আবেদন জানিয়েছেন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিখ্যাতরা। আদুর গোপালকৃষ্ণন, শ্যাম বেনেগালের মতো চিত্র পরিচালকরা যেমন রয়েছেন, তেমনই এ রাজ্য থেকে সই করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন, কৌশিক সেনের মতো বিশিষ্টরা।

চিঠিতে সই করেছেন চিত্র পরিচালক, অভিনেতা, লেখক, সাহিত্যিক, সমাজসেবী, চিকিৎসক, পরিবেশবিদ, ভাস্কর, চিত্রকর, শিক্ষাবিদ, গায়ক, ফ্যাশান ডিজাইনারের মতো বিভিন্ন পেশার ৪৯ জন বিদ্বজ্জন। নিজেদের শান্তিকামী ও গণতন্ত্রপ্রিয় দেশবাসী হিসেবে উল্লেখ করে গণপিটুনি ও ধর্মের নামে যে উন্মাদনা চলছে, তা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ  করেছেন। বিশেষ করে দলিত ও মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর যে অত্যাচার, গণপিটুনি-মারধর চলছে তার জন্য কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকেই দূষেছেন এই বিশিষ্টজনরা।

চিঠির শুরুতেই বিদ্বজ্জনরা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীকে। তাঁরা লিখেছেন, ‘‘ভারত ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশ। এখানে যে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সমানাধিকার। সংবিধানই সেই অধিকার দিয়েছে।’’ কিন্তু সেই অধিকার যে বার বার নানা ঘটনায় লঙ্ঘিত হচ্ছে, সেটাই তুলে ধরতে চেয়েছেন তাঁরা। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) পরিসংখ্যান তুলে ধরে তাঁরা বলেছেন, ২০১৬ সালে দলিতদের উপর ৮৪০টি অত্যাচারের ঘটনা ঘটেছে। অথচ দোষীদের বিচার হয়েছে এমন নজির প্রায় নেই। এ ছাড়া আরও কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমীক্ষা এবং রিপোর্ট উল্লেখ করে গণপিটুনি ও অন্যান্য অত্যাচারের ঘটনার পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়েছে চিঠিতে।

এই ধরনের ঘটনার উল্লেখ শুধু নয়, সরকার যে এই সব ঘটনা কড়া হাতে দমন করতে কোনও পদক্ষেপই করেনি, তাও কার্যত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন বিদ্বজ্জনরা। সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে নিশানা করে চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘‘সংসদে গণপিটুনির মতো ঘটনার নিন্দা করেছেন আপনি। কিন্তু সেটাই যথেষ্ট নয়। ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? আমরা দৃঢ় ভাবে মনে করি, এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দায়ের করতে হবে এবং দ্রুত ও নিশ্চিত ভাবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা যায়। খুনের ক্ষেত্রে যদি প্যারোল ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান থাকে, তাহলে গণপিটুনির ক্ষেত্রে কেন নয়, যেটা বরং আরও ঘৃণ্য? কোনও দেশেই কোনও নাগরিক ভয়-ভীতির মধ্যে থাকুক এটা কাম্য নয়।’’

 

বিদ্বজ্জনদের পাঠানো চিঠির অংশ। গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ

আরও পড়ুন: ১৫ বছর ধরে ৪০ জঙ্গি সংগঠন সক্রিয় ছিল পাকিস্তানে, বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি ইমরানের

এ রাজ্যের রাজনীতিতে শাসক তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি নিয়ে কম বিবাদ হয়নি। কিন্তু সেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের বাইরেও হিংসাত্মক ঘঠনার নজির রয়েছে বহু। ‘জয় শ্রীরাম’ না বলায় মারধর, গণপিটুনির মতো ঘটনা আকছার ঘটছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। হাতে গরম উদাহরণ রয়েছে কিছু দিন আগেই বিহারে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক যুবককে ‘জয় শ্রীরাম’ না বলায় গণপিটুনির জেরে মৃত্যুর ঘটনা। এই নিয়েই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিদ্বজ্জনরা। তাঁদের বক্তব্য, ‘‘জয় শ্রীরাম এখন এক ‘যুদ্ধের হুঙ্কার’। এই স্লোগানকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হচ্ছে। সবচেয়ে আতঙ্কের, এই উন্মাদনা, এই বিশৃঙ্খলা হচ্ছে ধর্মের নামে। এটা তো মধ্যযুগ নয়। ...রামের নামে এই উন্মাদনা আপনি অবিলম্বে বন্ধ করুন।’’

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে ভর করেই দ্বিতীয় বার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি তথা এনডিএ দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু সরকার বা শাসক দলের বিরুদ্ধ কোনও মতামত প্রকাশ করলেই দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলেও মনে করেন ওই পর্যবেক্ষকরা। এই প্রবণতার বিরুদ্ধেও সরব হয়েছেন বিদ্বজ্জনরা।

আরও পডু়ন: কর্নাটকে সরকার গড়ার প্রস্তুতি বিজেপির, চতুর্থ বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পথে ইয়েদুরাপ্পা

এই চিঠি প্রকাশ্যে আসার পর আনন্দবাজারের তরফে কৌশিক সেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘‘আমরা হঠাৎ করে চিঠি লিখে ফেললাম এমন নয়। এ রাজ্য-সহ গোটা দেশেই পরিস্থিতিটা কেমন অন্য রকম হয়ে উঠেছে। আমরা এর আগে ভাটপাড়া গিয়েছি, কাঁকিনাড়া গিয়েছি, চিকিৎসকদের আন্দোলনের সময় এনআরএস-এ গিয়েছি, প্রাথমিক শিক্ষকরা অনশন করছেন, সেখানেও গিয়ে তাঁদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছি এবং মুখ্যমন্ত্রীকে রিপোর্ট দিয়েছি। পশ্চিমবঙ্গ-সহ গোটা দেশেই একটা বিভাজনের পরিস্থিতি কাজ করছে। কোথাও যেন অন্য স্বর, অন্য প্ল্যাটফর্ম থাকতে পারে না। জয় শ্রী রামের মতো একটা ধর্মীয় মন্ত্রকে কী ভাবে যুদ্ধনিনাদে পরিণত করা যায়, তা গোটা দেশ দেখছে। বিজেপির বিচারধারায় কারও সঙ্গে না মিললে তাকেই দেশদ্রোহী দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীকে সে ব্যাপারে চিঠি দিয়েছি। আমরা যেমন পশ্চিমবঙ্গের বিষয়েও উদ্বিগ্ন, তেমনই গোটা দেশের ব্যাপারেও। সে কারণেই দেশের সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ চিঠি দিয়েছি।’’

অপর্ণা সেনের বক্তব্য, ‘‘প্রতিবাদ করার অধিকার থাকা উচিত। যে কোনও গণতন্ত্রে সেটাই নিয়ম। প্রতিবাদ করলে সেটা যদি অ্যান্টি ন্যাশনাল বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়, তা হলে সুস্থ গণতন্ত্র হয় না। আমরা প্রধানমন্ত্রীকে সেটাই জানিয়েছি।’’