আইএসএল-টু-র সবচেয়ে দামি ফুটবলার সুনীল ছেত্রীকে কিনবে কে?
ভারত অধিনায়ক প্রথম বার জাঁকজমকের টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ পেয়ে এতটাই উত্তেজিত, এই নিয়ে ভাবছেনই না। ‘‘আমার কোনও চয়েজ নেই। গত বার ক্লাব ছাড়েনি বলে খেলতে পারিনি। বাইরে থেকে দেখেছিলাম সব কিছু। গুয়াহাটিতে গিয়ে দেখেছিলাম মাঠটা কী সুন্দর তৈরি। ঝকঝকে ড্রেসিংরুম। ভর্তি দর্শক। তেরো বছর খেলছি, কখনও এ দেশে এ রকম দেখেনি। সেটাই আগ্রহী করে তুলেছিল আমাকে। টাকার জন্য নয়, এই পরিবেশটাকে উপভোগ করতে চাই বলেই এ বার আইএসএল খেলছি।’’ ৭০০ কোটির টুর্নামেন্ট যাঁর মগজ থেকে উৎপন্ন সেই নীতা অম্বানীর সঙ্গে বৈঠক করে বেরিয়ে প্যালেডিয়াম হোটেলের লবিতে দাঁড়িয়ে বলছিলেন জাতীয় দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
কিন্তু প্রশ্ন হল, জাতীয় দলের আশি লাখের স্ট্রাইকারকে নিলামে কিনবে কোন ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্লাব? তাঁকে নেওয়ার জন্য কী ঝাঁপাবেন একাধিক টিমের কর্তারা? বৃহস্পতিবার আট দলেরই কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে চমকে উঠতে হল। সাইড ব্যাক রিনো অ্যান্টোর জন্য যতটা আগ্রহী ক্লাবগুলো, তার চেয়ে অনেকটাই কম সুনীলকে পেতে। তবে সেটা টাকার ফারাকের জন্য যত না, তার চেয়েও বেশি পজিশনের জন্য। স্ট্রাইকার সুনীলের দামের চার ভাগের এক ভাগ দামও নয় রিনো অ্যান্টোর (সাড়ে সতেরো লাখ)। সাইড ব্যাক রিনোর জন্য অন্তত পাঁচটা টিম ঝাঁপাবে বলে খবর। সুনীলের জন্য হয়তো দু’টো। কারণ ফ্র্যাঞ্চাইজি কর্তারা মনে করছেন স্ট্রাইকারের জায়গা বিদেশি দিয়ে পূরণ সম্ভব। সাইড ব্যাকের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়!
বড় কোনও স্কুপ ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় যে রকম মুখ করে ঘুরে বেড়ান রাজনৈতিক নেতারা, অনেকটা সে ভাবে নিলামের আগের দিন ঘুরে বেড়াচ্ছেন এখানে আসা বিভিন্ন ক্লাবের কর্তারা। মুখে কুলুপ। কেউ নিজের স্ট্র্যাটেজি জানাতে চান না। তবুও যা ইঙ্গিত পাওয়া গেল তাতে সুনীলকে নেওয়ার জন্য রবের্তো কার্লোসের দিল্লি ডায়নামোস, এফসি পুণে সিটি ঝাঁপাতে পারে। এই দু’দলের কর্তাদের ধারণা, সুনীলকে নিলে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে টিমের বিপণন ভাল হবে। মাঠেও দর্শক আসবে বেশি। বোঝাই যায়, গ্ল্যামারের জন্যই সুনীলকে নেওয়ার ব্যাপারে এঁদের আগ্রহ বেশি।
“আমার কোনও চয়েজ নেই। গত বার ক্লাব ছাড়েনি বলে খেলতে পারিনি। বাইরে থেকে দেখেছিলাম সব কিছু।
গুয়াহাটিতে গিয়ে দেখেছিলাম মাঠটা কী সুন্দর তৈরি। ঝকঝকে ড্রেসিংরুম। ভর্তি দর্শক।
তেরো বছর খেলছি, কখনও এ দেশে এ রকম দেখেনি। সেটাই আগ্রহী করে তুলেছিল আমাকে।
টাকার জন্য নয়, এই পরিবেশটাকে উপভোগ করতে চাই বলেই এ বার আইএসএল খেলছি।” —সুনীল ছেত্রী।
সুনীল-সহ দেশের যে দশ ফুটবলার নিলামে শুক্রবার উঠছেন তাঁদের নয় জন বৃহস্পতিবার সাত সকালেই হাজির মুম্বইয়ের পাঁচ তারা হোটেলে। ফোটো শ্যুটের জন্য। যা দেখানো হবে নিলাম শুরুর আগে। অসুস্থতার জন্য গরহাজির শুধু রবিন সিংহ। রিনো অ্যান্টো, ইউজিন লিংডো, করণজিৎ সিংহ, আরাতা আজুমিদের সঙ্গে ফটো শ্যুট করার ফাঁকেই কথা বলছিলেন সুনীল। প্রথম আইএসএল খেলতে পারেননি বলে গুমড়ে ছিলেন। তখন বলেছিলেন, ‘‘ক্লাব না ছাড়লে খেলব কী করে?’’ সেটা যে অভিমান থেকে বলা বোঝা যাচ্ছিল এ দিন তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময়। বারবার বলছিলেন, ‘‘এ বার ক্লাব ছেড়েছে। তাই খেলতে পারছি। এ রকম একটা পরিবেশ থেকে কী দূরে সরে থাকা যায়!’’
কিন্তু যিনি ভাইচুং ভূটিয়ার ছায়া থেকে বার করে এনে ভারতীয় ফুটবলের সব আলো নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন গত কয়েক বছরে, সেই সুনীল ছেত্রীকে সামনে পেলে দেশীয় ফুটবলের নানা প্রসঙ্গ উঠবেই। সেটা উঠলও।
আইএসএলে তো খেলবেন, কিন্তু এতে কী ভারতীয় ফুটবল এক ইঞ্চিও এগোবে? ‘‘কারও একার পক্ষেই এ দেশের ফুটবলের ছবি বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের দেশের পনেরো ভাগ অঞ্চলও এখনও ফুটবলের আওতায় আসেনি। লাক্ষাদ্বীপে কে ফুটবল খেলে কেউ জানে? আইএসএল তো মাঠে অন্তত দর্শক টেনে আনছে। ভারতে যে ফুটবল হয় সেটা বিশ্বের একটা বড় অংশ দেখছে। পরিকাঠামোর উন্নতি হচ্ছে। আই লিগও যদি এরকম ভাবে হয় তা হলে আরও ভাল হবে। তবে তৃণমূল স্তরে কাজ না করলে কিছু হবে না।’’ বলছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমান সুনীল।
প্রাক বিশ্বকাপে ওমানের কাছে হার। পরে গুয়ামের কাছেও পর্যুদস্ত। এ জন্য সুনীল দায়ী করছেন নিজেদের ভাল না খেলাকেই। বিদেশে ভারতীয় বংশোদ্ভুত ভাল খেলা ফুটবলারদের দেশের জার্সিতে খেলানোর পক্ষে মত দিয়েও সুনীল বলছেন, ‘‘ভাল বিদেশি ফুটবলার এলেও তো এখানে খেলার উন্নতি হয়।’’
দেশের ফুটবল নিয়ে কথা বললেও সুনীলের মন যদিও পড়ে রয়েছে শুক্রবারের নিলামে। কারণ জীবনে প্রথম বার চোখের সামনে প্রকাশ্যে কেনা-বেচা হবে তাঁর। সংগঠকরা যে নতুন নিয়ম চালু করেছেন তাতে কোনও ক্লাব নিলামে কোনও ফুটবলারকে কিনতে চাইলে, অন্য ক্লাবও তাঁকে কেনার জন্য চেষ্টা করতে পারে। ‘‘আমি বসে থাকব। আমার সামনেই আমি বিক্রি হয়ে যাব। এটা ভেবে কেমন যেন উত্তেজনা লাগছে।’’ বলছিলেন সুনীল।
দেখার জাতীয় দলের সবচেয়ে হাইপ্রোফাইল ফুটবলারকে নিয়ে নিলাম টেবলে কতটা টানাটানি হয়?