• Derek O Brian
  • ডেরেক ও’ব্রায়েন
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর অন্ত্যেষ্টির আয়োজন করে ফেলেছে বিজেপি

Graphic
অর্থনৈতিক ভাবে রাজ্যগুলোকে পঙ্গু করে দেওয়াই লক্ষ্য বিজেপির। গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ।
  • Derek O Brian

বিজেপির একচ্ছত্র রাজত্বের দশকে বাস করছি আমরা। অর্ধেক মেয়াদ ইতিমধ্যেই পূর্ণ। এর আগে এমনটা হয়েছিল আশির দশকে। ১৯৮০-৮৯ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রে একাধিপত্য ছিল কংগ্রেসের। সেই সময়ে রাজ্যগুলির অধিকার খর্ব করার জন্য ৩৫৬ ধারার অপব্যবহার করা হত।  কিছু মেরুদণ্ডহীন রাজ্যপালকে ব্যবহার করে রাজ্যের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করা হত।

আজও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। কিন্তু এখন যেন আরও প্রকট ও মারাত্মক হয়ে গিয়েছে এই পন্থা। এখন আর ৩৫৬ ধারার কোনও দরকার হয় না। এখন লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক ভাবে রাজ্যগুলোকে পঙ্গু করে  দিয়ে কী ভাবে তাদের শেষ করে দেওয়া যায়। উল্লেখ্য, ১৪-তম অর্থ কমিশন যে রিপোর্ট দিয়েছিল তা কার্যত অস্বীকার করা হয়েছে। তাও আবার ‘যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো’-র দোহাই দিয়ে। কোভিড-১৯ অতিমারির দাপট শুরু হওয়ার আগেই দেশে এই পরিস্থিতি উদ্ভূত হয়েছিল। আর, অতিমারি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার সাঁড়াশি আক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।

২০১৫ সালে যখন চতুর্দশ অর্থ কমিশনের রিপোর্ট গৃহীত হল, তখন বলা হয়, রাজ্যগুলিকে অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভর করার জন্য বেশি করে অর্থ সাহায্য করা হবে। এই পদক্ষেপের ফলে রাজ্যগুলির সামাজিক ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি পাবে। এর দু’বছর পরে জিএসটি লাগু করার জন্য দোহাই দেওয়া হল যে, এর ফলে আখেরে লাভ হবে রাজ্যগুলিরই।

আরও পড়ুন: শোভন-ভাবনা শেষ, বেহালা পূর্ব আসনে এ বার সেলিব্রিটি মুখ তৃণমূলের?

কিন্তু বাস্তবে কী হল? চতুর্দশ অর্থ কমিশনের প্রজেকশন অনুযায়ী কেন্দ্রীয় রাজস্বের যে ভাগ রাজ্যগুলির পাওয়ার কথা, তার পরিমাণ ক্রমশ কমে গেল। এর অন্যতম কারণ অবশ্যই কেন্দ্রের ভ্রান্ত নীতির ফলে উদ্ভূত অর্থনৈতিক মন্দা। আর একটি কারণ হল, জিএসটি আদায় আশাব্যঞ্জক পরিমাণে না হওয়া। ২০১৮-১৯ সালে জিএসটি সংগ্রহের পরিমাণ প্রত্যাশা থেকে শতকরা ২২ ভাগ কম ছিল।

ইতিমধ্যে কেন্দ্র বিভিন্ন পণ্যে নানা রকম সেস বসিয়েছে। সেস থেকে সংগৃহিত অর্থে রাজ্যের ভাগ থাকে না। এখন তো গুজব শোনা যাচ্ছে যে, কোভিড-১৯ নিয়েও সেস চালু করা হবে। সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ-এর  সমীক্ষা বলছে, চতুর্দশ অর্থ কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী রাজ্যগুলির যে পরিমাণ অর্থ পাওয়ার কথা, তার ৬.৮৪ লক্ষ টাকা কম দেওয়া হয়েছে। আর এমন সময়ে এটা করা হয়েছে যখন সরকারি ব্যয়ের ধরনে এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। ২০১৪-১৫ সাল নাগাদ যেখানে রাজ্য সরকারগুলি বিভিন্ন খাতে কেন্দ্রের থেকে ৪৬% বেশি খরচ করত,  এই সংখ্যা এখন বেড়ে হয়েছে ৬৪%। তা সত্ত্বেও কেন্দ্রের রাজস্ব ঘাটতি রাজ্যগুলির সম্মিলিত রাজস্ব ঘাটতির চেয়ে ১৪%বেশি! এর মানে আজ দেশের মানুষ কেন্দ্রীয় সরকারের অকর্মণ্যতা-র ফল ভোগ করছে।

তার ওপর কোভিড-১৯ অতিমারির প্রকোপে অবস্থা আরও সঙ্গীন হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা বাঁচাতে এবং দুর্দিনে তাদের পাশে দাঁড়াতে রাজ্যগুলিকে অনেক বেশি খরচ করতে হচ্ছে। কেন্দ্রের সাহায্য প্রায় নেই বললেই চলে। ৩০শে জুন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার কোভিড-১৯  মোকাবিলায় ১,২০০ কোটি টাকা খরচ করেছে। উল্টোদিকে, স্টেট ডিজাস্টার রেসপন্স মিটিগেশন ফান্ডের আওতায় প্রাপ্য অর্থের মাত্র ৪০০ কোটি টাকা দিয়েছে কেন্দ্র। অতিমারির জন্য এক পয়সাও দেয়নি। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত, বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় আমপানের সৌজন্যে বাংলায় ২৮ লক্ষ ঘরবাড়ি আর ১৭ লক্ষ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১.০২ লক্ষ কোটি টাকা। মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকার যেখানে এই বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়াতে ইতিমধ্যেই ৬২৫০ কোটি টাকা রিলিজ করেছে, সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে মিলেছে ১০০০ কোটি টাকা!

এই অতিমারির ফলে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক প্রত্যেকটি সরকারি দফতরকে ব্যয় সঙ্কোচের নির্দেশ দিয়েছে। তার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে রাজ্যগুলির উপর। জানতে চান কিভাবে? গ্রামীণ উন্নয়নের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ থমকে গেছে। ২০২০-২১ সালে বাংলার পঞ্চায়েতগুলি যে সব প্রকল্পের কাজ শুরু করবে তার জন্য প্রাপ্য ৪,৯০০ কোটি টাকা এখনও কেন্দ্রীয় গ্রামীণ উন্নয়ন দফতর থেকে আসেনি। আর্থিক বছরের এক চতুর্থাংশ সময় কেটে গেছে। এখনও এক পয়সাও আসেনি।

এই অর্থের ৭০ শতাংশ গ্রাম পঞ্চায়েতের জন্য এবং ৩০ শতাংশ পঞ্চায়েত সমিতি ও জেলা পরিষদের জন্য বরাদ্দ। এই সুপারিশ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার স্বীকৃতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এই টাকায় রাস্তা বানানো, ব্রিজ বা কালভার্ট তৈরি করা, স্থানীয় জল প্রকল্পে খরচ করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা যেত। কিন্তু, কিছুই হল না।

আরও পড়ুন: কন্টেনমেন্টে সেই বিধি-ভাঙাদের লুকোচুরি​

কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প মিলিয়ে বাংলার প্রাপ্য অর্থ ৩৬,০০০ কোটি টাকা; রাজস্বের অংশ বাবদ প্রাপ্য ১১,০০০ কোটি টাকা; বকেয়া জিএসটি বাবদ প্রাপ্য ৩,০০০ কোটি টাকা; খাদ্য ও অন্যান্য খাতে ভর্তুকি বাবদ প্রাপ্য ৩০০০ কোটি টাকা। তাহলে সব মিলিয়ে বাংলার প্রাপ্য ৫৩,০০০ কোটি টাকা! আমি বাকি রাজ্যদের কথা বলতে পারব না, কিন্তু দুর্যোগ ও অতিমারি বিধ্বস্ত বছরে বাংলার প্রাপ্য টাকা না পাওয়ায় বাংলার বোঝা আরও বেড়ে গেল।

আজ সারা বিশ্বে বিভিন্ন সরকার মানুষের হাতে টাকা তুলে দিচ্ছে, তাদেরও রাজ্স্ব ঘাটতি নিয়ে নাকানিচোবানি খেতে হচ্ছে। ভারতে যে সব রাজ্য সাম্প্রতিক সময়ে আর্থিক অনুশাসন মেনে কাজ করেছে, তাদেরও অবস্থা করুণ। বিপদের সময় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে সামাজিক খাতে অনেক বেশি খরচ করতে হচ্ছে।

খাতায় কলমে, এফআরবিএম-এর আওতায়, রাজস্ব ঘাটতির ঊর্ধ্বসীমা ৩% থেকে ৫% করেছে কেন্দ্র। কিন্তু, বাস্তবে এর মধ্যে মাত্র ০.৫% কোনও শর্ত ছাড়া, বাকী ১.৫% -র জন্য রাজ্যগুলিকে কিছু অবাস্তব ও অকার্যকরী শর্তপূরণ করতে হবে— যেমন বিদ্যুতের বেসরকারিকরণ বা স্থানীয় পুরসভার আয়বৃদ্ধি ইত্যাদি।

রাজ্যগুলির অন্ত্যেষ্টির সব আয়োজন করে ফেলেছেন ‘মো-শা’। শ্রাদ্ধের কার্ড ছাপানোটাই বাকি। এটাই বিজেপির ‘সহযোগী যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো’-র বাস্তব চিত্র।

(লেখক রাজ্যসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের দলনেতা)

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন