কলকাতায় রথযাত্রা উৎসবেও গড়াল রাজনীতির চাকা। জগন্নাথ-বলভদ্র-সুভদ্রার রথের রশিতেও রাজনৈতিক টানাটানি। এক দিকে ইসকনের রথযাত্রার উদ্বোধন করে শান্তি-সম্প্রীতির বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংসদ নুসরত জাহান। অন্য দিকে, মহাজাতি সদনে রথযাত্রা উৎসবে শামিল মুকুল রায়-সহ রাজ্য বিজেপির নেতারা। রাম নবমীর পর এ বার রথযাত্রা উৎসবের মধ্যে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা জারি রাখল রাজ্যের শাসক-বিরোধী দু’দলই।

বেশ কয়েক বছর ধরেই ইসকনের রথযাত্রার উদ্বোধন করে আসছেন মুখ্যমন্ত্রী। এ বারও তিনিই প্রধান অতিথি। এর মধ্যে নতুনত্ব কিছু ছিল না। কিন্তু এ বার সেই রথযাত্রাতেই বিশেষ অতিথি হিসেবে তৃণমূলের অভিনেত্রী সাংসদ নুসরতকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ইসকন কর্তৃপক্ষ। নুসরতও জানিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি উৎসবে হাজির থাকবেন। সেই মতো এদিন স্বামী নিখিল জৈনকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন রথের সূচনায় গিয়েছিলেন তিনি।

মধ্য কলকাতার অ্যালবার্ট রোডে ইসকন মন্দিরের উল্টো দিকে হাঙ্গারফোর্ড স্ট্রিট থেকে শুরু হয় ইসকনের রথযাত্রা। সুসজ্জিত জগন্নাথ-বলভদ্র-সুভদ্রাদের মাসির বাড়ি যাত্রার সূচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তা, ‘‘জগন্নাথ দেব সবাইকে ভাল রাখুন। ধর্ম মানে সর্বজনীন, ধর্ম মানে বিশ্বজনীন। সারা পৃথিবীর সবাইকে ভালবেসে যে ধর্ম, সেটাই আসল ধর্ম, সেটাই মানব ধর্ম। সেই ধর্মের জয় হোক, শুভবুদ্ধির জয় হোক, সম্প্রীতির জয় হোক, ঐক্যের জয় হোক। মানবতার জয় হোক। জয় শ্রীরাম স্লোগান নিয়ে বিজেপি-তৃণমূল সংঘাত চলছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দলের অবস্থান, তাঁরা জয় শ্রীরাম বলবেন না। এ দিনও রথযাত্রার সূচনা পর্বের শেষে মমতার মুখে শোনা গিয়েছে, ‘জয় জগন্নাথ’, ‘জয় হিন্দ’, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান।

সিদুঁর-মঙ্গলসূত্র পরায় তাঁকে কার্যত ফতোয়া দিয়েছিলেন উত্তরপ্রদেশের দেওবন্দের ইমাম মুফতি আসাদ ওয়াসমি। তার জবাবে নুসরত বলেছিলেন, তিনি কী পরবেন, তা নিয়ে অন্যের কথা বলা উচিত নয়। ধর্মবিশ্বাস পোশাকের ঊর্ধ্বে। তিনি অখণ্ড ভারতের প্রতিনিধি। এই পর্বের পরেই নুসরতকে রথযাত্রা উৎসবে আমন্ত্রণ জানান ইসকন কর্তৃপক্ষ। তখনই জানিয়েছিলেন, আমন্ত্রণ পেয়ে তিনি আপ্লুত। আর বৃহস্পতিবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে অনুষ্ঠানে সর্বক্ষণ ছিলেন নুসরত। বসিরহাটের সাংসদ বলেন, ‘‘আমাকে আমন্ত্রণ জানানোয় গর্ব বোধ করছি। পশ্চিমবঙ্গে জাতি ভেদাভেদ ভুলে সব উৎসবই আমরা একসঙ্গে পালন করি। এটাই আমাদের ঐতিহ্য। বাংলা সম্প্রীতি এবং শান্তির প্রতীক। প্রার্থনা করব, আমরা যেন সবাই ভাল ভাবে থাকতে পারি।এত সুন্দর একটা অনুষ্ঠান। আসুন আমরা সবাই মিলে এই অনুষ্ঠান পালন করি।’’ বক্তব্যের শেষে ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনিও দেন নুসরত।

 

আরও পডু়ন: ‘বাংলা’ এবং ‘মাদ্রাসা’ নিয়ে তৃণমূলের পাশে কংগ্রেস-সিপিএম

উত্তর কলকাতার মহাজাতি সদন এলাকায় রামমন্দিরের সামনে থেকে রথযাত্রা উপলক্ষে সকাল থেকেই সেখানে সাজ সাজ রব। প্রতি বছরই জাঁকজমকের সঙ্গে রথযাত্রা উৎসব পালন করেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু, গত এক বছরে রাজ্যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে অনেকেটাই। এই পরিস্থিতিতে মহাজাতি সদনের এই রথযাত্রায় এ বার ছবিটা অনেকটাই আলাদা। এখানকার অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন বিজেপি নেতারা। রথযাত্রার সূচনা করেন দলের নেতা মুকুল রায়। রশিতে টান দিয়ে রথের সঙ্গেই পদযাত্রায় শামিল হন রাজ্য বিজেপির নেতারা। রাজ্য রাজনীতিতে বিজেপির প্রভাব যত বাড়ছে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। কয়েক বছর আগেও যাতে কার্যত একাধিপত্য ছিল তৃণমূল নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। রাজনৈতিক পট পরবিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিজেপি যেমন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের পরিসর বাড়াচ্ছে, তেমন ভাবেই কমছে তৃণমূলের পরিধি।

আরও পডু়ন: আমি আর নেই, কাউকে পাশে পাইনি, টুইটারে চিঠি লিখে ক্ষোভ উগরে দিলেন রাহুল

ইসকনের রথযাত্রা এবার ৪৮তম বর্ষে পা দিল। হাঙ্গারফোর্ড স্ট্রিট থেকে মাসির বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন জগন্নাথ-বলভদ্র-সুভদ্রারা। শেষ হয় ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে, অর্থাৎ মাসির বাড়িতে। সেখানে সাত দিন দর্শনার্থীদের দেখার জন্য রাখা হয়। উল্টো রথে ফের একই পথে ওই হাঙ্গারফোর্ড রোডে ইসকনের মন্দিরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের তিন দেবতাকে। অন্য দিকে,মহাজাতি সদনের রথযাত্রা শুরু হয়রাম মন্দিরের সামনে থেকে। গিরিশ পার্ক হয়ে বাগবাজারে মাসির বাড়িতে সাত দিন কাটিয়ে আবার নিজের বাড়িতে ফিরবেন জগন্নাথরা।