Advertisement
E-Paper

ক্ষমতা বেড়েছে, তাই ‘সংযম’ও বেড়েছে! শোকজ়-চিঠির বয়ানে কার্যত নিলম্বনের বার্তা থাকলেও শব্দচয়নে এ বার সতর্ক রাজ্য বিজেপি

পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির প্রধান প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন যে, রাজ্য জুড়ে ইতিমধ্যেই শোকজ় চিঠি পেয়েছেন ৫০ জনেরও বেশি।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২২ মে ২০২৬ ১৯:১৫
Bengal BJP’s Show Cause letters contain message of suspension, but in different words! What explanation comes out unofficially

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

বছর পাঁচেক আগে দলের জন্য সময় ছিল কঠিন। তবু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে শৃঙ্খলাভঙ্গ সংক্রান্ত অভিযোগে একাধিক ‘কঠিন সিদ্ধান্ত’ নিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি। এ বার ঠিক উল্টো ছবি। দলের জন্য সময় এখন সুবিধাজনক তো বটেই। সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রশ্নে যে কোনও ‘কঠিন সিদ্ধান্ত’ নেওয়াও আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ। কিন্তু বিজেপি সে পথে হাঁটল না। ‘কঠিন সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার ক্ষেত্রে ভাষায় নমনীয়তা আনল রাজ্য বিজেপির শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি। দলের যে-চিঠি কার্যত নিলম্বনের (সাসপেনশন) নির্দেশ, সে-চিঠিতে ‘সাসপেন্ড’ বা ‘বরখাস্ত’ গোছের শব্দ প্রয়োগ এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে এর কারণ কী, প্রকাশ্যে কেউ ব্যাখ্যা দিতে চান না। তবে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের একাংশের বক্তব্য, ‘ক্ষমতা বাড়লে সংযমও বাড়াতে হয়’।

বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের আগে থেকেই রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য দলীয় কর্মী-সমর্থকদের ভোট পরবর্তী হিংসায় না-জড়ানোর বার্তা দিতে শুরু করেছিলেন। ফলপ্রকাশের পর থেকে সে-কথা আরও বেশি করে বলতে শুরু করেন তিনি। ভোট দল বিপুল জয় পেয়েছে বলে বিজেপির কোনও নেতা বা কর্মী কোনও হিংসাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করলে দল কঠোর পদক্ষেপ করবে বলে শমীক হুঁশিয়ারি দেন। ক্ষমতায় আসার সুযোগ নিয়ে কেউ যদি তোলাবাজি করেন বা সিন্ডিকেট তৈরির চেষ্টা করেন, তা হলেও দল কড়া ব্যবস্থা নেবে বলে জানান তিনি। বিজেপি রাজ্য সভাপতি বার বারই বলেছেন, ‘‘আমরা এ রাজ্যের ভোট-সংস্কৃতি বদলের কথা বলেছি। তাই মানুষ আমাদের ভোট দিয়েছেন। ভোটে জেতার পরে আমরাও তৃণমূলের সংস্কৃতিতেই গা ভাসাতে পারি না।’’

শমীকের ঘোষণা তথা হুঁশিয়ারি যে কথার কথা ছিল না, তা বিজেপির পদক্ষেপ থেকেই স্পষ্ট হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির প্রধান প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, রাজ্য জুড়ে ইতিমধ্যেই শোকজ় চিঠি পেয়েছেন ৫০ জনেরও বেশি। প্রতাপের কথায়, ‘‘কমবেশি সব জেলা থেকেই অভিযোগ আসছে। আমরা প্রত্যেকটি অভিযোগই খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করছি।’’ কী ধরনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিজেপির শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি সক্রিয় হচ্ছে? বিজেপি সূত্রের খবর, কোথাও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত কারও বাড়িতে বা দোকানে হামলার অভিযোগ উঠছে। কোথাও হুমকি দিয়ে টাকা তোলার অভিযোগ উঠেছে। সব অভিযোগ সত্য নয়। তবে এ ধরনের অভিযোগ উঠলেই তা দল খতিয়ে দেখছে এবং সত্যতার আভাস মিললে পদক্ষেপও করছে।

যাঁরা ইতিমধ্যেই শোকজ় চিঠি পেয়েছেন, তাঁরা দল থেকে কার্যত নিলম্বিতই হয়ে গিয়েছেন। কারণ শোকজ় চিঠিগুলির যে বয়ান, তাতে সাত দিনের মধ্যে অভিযুক্তের জবাব চাওয়া হচ্ছে। আর লেখা হচ্ছে যে, শোকজ় প্রাপক যেন রাজ্য নেতৃত্বের পরবর্তী নির্দেশ না-পাওয়া পর্যন্ত দলের যে কোনও কাজে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। অর্থাৎ শুধু সাত দিনের মধ্যে শোকজ় চিঠির জবাব দিলেই আবার দলের কাজকর্ম আগের মতোই করা যাবে, এমন নয়। শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি যদি সেই জবাবে সন্তুষ্ট হয়, তা হলে রাজ্য সভাপতিকে তা জানাবে। তার পরে সভাপতি নির্দেশ দিলে আবার দলের কাজে ফেরা যাবে। নিলম্বিত নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রেও এটিই ঘটে। দল থেকে তাঁদের বহিষ্কার করা হয় না ঠিকই। কিন্তু দলের সব কর্মসূচি থেকেই তাঁদের দূরে রাখা হয়। এবং দলে ফেরার জন্য রাজ্য নেতৃত্বের পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষা করতে হয়।

প্রশ্ন হল, শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে যখন কার্যত নিলম্বিতই করা হচ্ছে, তখন সে কথা স্পষ্ট করে লেখা হচ্ছে না কেন? ২০২১ সালে তো অন্য রকম ছবি ছিল। বিধানসভা নির্বাচনে ‘২০০ পার’-এর হুঙ্কার ছেড়ে বিজেপির রথ ৭৭-এ থেমে গিয়েছিল। তার পর রাজ্য সভাপতি পদ থেকে দিলীপ ঘোষকে সরিয়ে সুকান্ত মজুমদারকে আনা হয়েছিল। সুকান্তের নতুন কমিটি ঘোষিত হতেই রাজ্য স্তরের একাধিক নেতা ‘বিদ্রোহী’ হয়ে উঠেছিলেন। ফলে রীতেশ তিওয়ারি, জয়প্রকাশ মজুমদার (তখন বিজেপিতে ছিলেন), চন্দ্রশেখর বাসোটিয়া, সমীরণ নন্দীদের মতো অনেক পরিচিত নাম পর পর নিলম্বিত হয়েছিলেন। তাঁদেরকে দল যে-চিঠি দিয়েছিল, তাতে লেখা হয়েছিল ‘সাময়িক বরখাস্ত করা হল’। রাজ্য নেতৃত্বের পরবর্তী নির্দেশ জারি না-হওয়া পর্যন্ত ‘বরখাস্ত’ই থাকতে হবে বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ ‘নিলম্বন’ বা ‘সাসপেনশন’ শব্দ ব্যবহার না-করলেও যথেষ্ট কঠোর শব্দই সে বার ব্যবহার করেছিল বিজেপি। তা নিয়ে নানা প্রশ্নও উঠেছিল। বিজেপির গঠনতন্ত্রে আদৌ ‘সাময়িক বরখাস্ত’ বলে কোনও শব্দবন্ধ রয়েছে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু রাজ্য নেতৃত্ব পিছু হঠেননি। দল কঠিন পরিস্থিতিতে থাকা সত্ত্বেও কঠিন সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন তাঁরা। ২০২৫ সালে শমীক সভাপতি হওয়ার পরে একে একে রীতেশ, চন্দ্রশেখরদের দলের কাজে ফেরানো হয়।

এ বার পরিস্থিতি ভিন্ন। বিজেপি ২০৭টি আসনে জিতে ক্ষমতায় এসেছে। দলে যোগদানের উৎসাহ কার্যত উপচে পড়ছে। এখন শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে বা দায়ে কাউকে দল থেকে ‘বরখাস্ত’ বা ‘নিলম্বিত’ করলে সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এমন আশঙ্কা কমই। তবু বিজেপি আগের বারের চেয়ে সতর্ক কেন?

রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব সে বিষয়ে মন্তব্য করতে চাইছেন না। আর রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলছেন, ‘‘কাকে শোকজ় করা হবে, শোকজ়ের চিঠিতে কী ভাষা ব্যবহার করা হবে, এগুলো শৃঙ্খলারক্ষা কমিটিই দেখে। রাজ্য সভাপতি বা রাজ্য বিজেপির সংগঠন সম্পাদক যে ভাবে নির্দেশ দেবেন, সে ভাবেই সিদ্ধান্ত হবে। এ নিয়ে আমার কোনও ব্যাখ্যা দেওয়ার নেই।’’ তবে বিজেপির অন্য একটি সূত্রের ব্যাখ্যা, দল পশ্চিমবঙ্গে ‘ঐতিহাসিক’ ফল করেছে। বিজেপির পূর্বসূরি জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মাটিতে প্রথম বার শ্যামাপ্রসাদ-অনুগামী সরকার তৈরি হয়েছে। এত দিন যাঁরা নানা প্রতিকূলতা সহ্য করেও বিজেপির সঙ্গে ছিলেন, এ রকম সন্ধিক্ষণে পৌঁছে তাঁদের প্রতি দল প্রথম সুযোগেই ‘নির্মম’ হতে চায় না। শৃঙ্খলাভঙ্গ হয়ে থাকলে পদক্ষেপ হবে। কিন্তু শুধরে গেলে যে দলের কাজে ফেরার অবকাশ রয়েছে, সে বার্তাও থাকবে।

রাজ্য বিজেপির আর একটি সূত্রের ব্যাখ্যা, পাঁচ বছর আগে বিজেপি এ রাজ্যে এত ক্ষমতাশালী ছিল না। এখন ক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে দায়িত্ববোধ বাড়া উচিত, সংযমও বাড়া উচিত। ক্ষমতা বেড়েছে বলেই তার প্রয়োগও বাড়বে, এমন না-হওয়াই উচিত বলে রাজ্য বিজেপির একাংশের মত। সে সব মাথায় রেখেই শোকজ়-চিঠির ভাষাও আগের চেয়ে ‘সংযমী’ বলে বিজেপি সূত্রের ব্যাখ্যা।

BJP Show cause Notice show cause letter suspension
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy