E-Paper

ফেরানো বারণ, মুমূর্ষুকেও তাই মেঝেতে থাকতে হয় আর জি করে

স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নয়নে বরাদ্দ বেড়েছে, সামগ্রিক ভাবে বাড়ানো হয়েছে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যাও। এসএসকেএম, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ এবং নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়া রোগীদের মেঝেতে বা ট্রলিতে রাখা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

শান্তনু ঘোষ

শেষ আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২২
অসহায়: আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডের মেঝেতেই চিকিৎসা রোগীদের।

অসহায়: আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডের মেঝেতেই চিকিৎসা রোগীদের। — নিজস্ব চিত্র।

‘রিগ্রেট, নো বেড ভেকেন্ট’ (দুঃখিত, শয্যা খালি নেই) লেখার নিয়ম নেই। অগত্যা, ভর্তি নেওয়া রোগীকে থাকতে হচ্ছে মেঝেতে। এই চিত্র শহরের প্রথম সারির মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল আর জি করের!

স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নয়নে বরাদ্দ বেড়েছে, সামগ্রিক ভাবে বাড়ানো হয়েছে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যাও। এসএসকেএম, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ এবং নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়া রোগীদের মেঝেতে বা ট্রলিতে রাখা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে আর জি করের মতো হাসপাতালে কেন এখনও দিনের পর দিন এমন চলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে খোদ চিকিৎসকদেরই। সূত্রের খবর, এক বার হাসপাতালের বৈঠকে এই প্রশ্ন তুলেছিলেন তাঁরা।যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাল্টা দাবি, সমস্ত হাসপাতাল থেকেই যদি শয্যার অভাবে রোগীদের ‘রেফার’ করে দেওয়া হয়, তা হলে তাঁরা যাবেন কোথায়? তাই স্বাস্থ্য ভবনেরই নির্দেশ রয়েছে, আর জি কর থেকে কোনও রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। চিকিৎসকদের একাংশের কথায়, ‘‘উদ্দেশ্য ভাল। তবে, তার জন্য আর জি করের পরিকাঠামো আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কিন্তু তা না করে রোগীদের মেঝেতে রাখা হচ্ছে। তাতে পরিষেবা দিতে গিয়ে প্রতি মুহূর্তে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।’’

পরিস্থিতি চাক্ষুষ করতে সম্প্রতি আর জি করের মেডিসিন বিভাগের পুরুষ ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেল, মেঝেতে শুয়ে থাকা ষাটোর্ধ্ব এক রোগীর মারাত্মক শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে তাঁকে অক্সিজেন দেওয়া প্রয়োজন। কী করা যায়, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন চিকিৎসক থেকে কর্মীরা। শেষে দূরের একটি শয্যার মাথার দিকের দেওয়ালে থাকা অক্সিজেনের লাইন থেকে তিনটি পাইপ যুক্ত করে এনে দেওয়া হল ওই রোগীকে! কিন্তু ওই শয্যায় থাকা রোগীরও যদি অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়? এক কর্মীর কথায়, ‘‘আগে তো যাঁর দরকার, তাঁকে দিই। পরেরটা পরে ভাবা যাবে।’’ অন্য একটি ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেল, সেখানে ডাঁই করে রাখা নোংরা ম্যাট্রেস। রোগী এলে সেগুলি পেতে দেওয়া হচ্ছে।

চিকিৎসক থেকে কর্মীরা, সকলেই জানাচ্ছেন, এমন দৃশ্য প্রায় রোজই দেখা যায় আর জি করের মেডিসিন বিভাগের পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডে। আরও জানা যাচ্ছে, আর জি করের মেডিসিন বিভাগের দু’টি পুরুষ ওয়ার্ড মিলিয়ে প্রায় ১১০টি এবং মহিলাদের দু’টি ওয়ার্ড মিলিয়ে প্রায় ১০৫টি শয্যা রয়েছে। তবে, ওই চারটি ওয়ার্ড মিলিয়ে দৈনিক প্রায় ৬০ জন করে রোগী মেঝেতে থাকেন বলেই খবর। হাসপাতালের অন্দরের খবর, গত ফেব্রুয়ারিতে পুরুষ ওয়ার্ডে ৩৬৩ এবং মহিলা ওয়ার্ডে ২৭৩ জন রোগীকে মেঝেতে ভর্তি নেওয়া হয়েছিল।

জানা যাচ্ছে, আর জি করের জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের মধ্যে যাঁদের মেডিসিন সংক্রান্ত চিকিৎসার প্রয়োজন, তাঁদের শয্যা না থাকলেও ফেরানো হয় না। বদলে মেঝেতে ভর্তি নেওয়া হয়। জরুরি বিভাগের এক চিকিৎসক জানাচ্ছেন, ধরা যাক, কোনও হৃদ্‌রোগী জরুরি বিভাগে আসার পরে তাঁকে কার্ডিয়োলজি বিভাগে পাঠানো হল। কিন্তু সেখানে শয্যা ভর্তি থাকায় ফের ওই রোগীকে ফেরত পাঠানো হল জরুরি বিভাগে। তখন আর রোগীকে অন্যত্র ‘রেফার’ না করে মেডিসিন ওয়ার্ডের মেঝেতেই ভর্তি নেওয়া হয়। পরে সংশ্লিষ্ট বিভাগে শয্যা ফাঁকা হলে ওই রোগীকে সেখানে স্থানান্তরিত করা হয়। যদিও মেঝেতে থাকা রোগীদের চিকিৎসায় হাজারো সমস্যা হয় বলেই দাবি চিকিৎসকদের। তাঁরা জানাচ্ছেন, প্রয়োজন মতো রোগীর মাথা উঁচুতে রাখতে হলে শয্যা (বেড ব্যাক রেস্ট) তোলার উপায় নেই। অক্সিজেন দিতে হলেও অন্য শয্যার সামনে থেকে একটির সঙ্গে আর একটি পাইপ জুড়ে আনতে হয়। মুমূর্ষু কোনও রোগীর বাইপ্যাপ বা ভেন্টিলেটর দরকার হলেও দেওয়ার উপায় নেই। সুযোগ নেই শয্যায় এক্স-রে করারও। আবার মাটিতে বসে রক্তচাপ পরীক্ষা করতেও সমস্যা হয়। এক চিকিৎসকের কথায়, ‘‘অন্য রোগীদের থেকে এবং অপরিচ্ছন্ন বিছানা, মেঝে থেকে মারাত্মক ভাবে সংক্রমণের ভয়ও থাকে।আবার মেঝে থেকে ওঠা ঠান্ডাও সহজেই লেগে যায়।’’ মেঝেতে থাকা রোগীদের মাঝেমধ্যে বিড়ালের আঁচড়ও খেতে হয় বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা।

সমস্যার কথা স্বীকার করলেও প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করতে রাজি নন আর জি করের কোনও কর্তাই। অন্য দিকে, ইন্দিরা মাতৃসদন, অবিনাশ দত্ত মেটারনিটি হোম, নর্থ সাবার্বান হাসপাতাল—এই তিনটি অ‌্যানেক্স হাসপাতাল রয়েছে আর জি করের। কিন্তু প্রায় প্রতিটিরই পরিকাঠামো বেহাল। সিনিয়র চিকিৎসকদের একাংশ বলছেন, ‘‘বিভিন্ন অনুদান দিতে রাজ্য বিপুল খরচ করছে। অথচ, ওই তিনটি হাসপাতালের পরিকাঠামোর ঠিকঠাক উন্নতি করলে মেঝেতে রোগী রাখার সমস্যা মেটানো যায়।’’

গোটা বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বাস্থ্য দফতরের এক কর্তা বলেন, ‘‘প্রচুর মানুষ সরকারি হাসপাতালের উপরে নির্ভরশীল। আবার শয্যার সংখ্যাও নির্দিষ্ট। তাই এমন অবস্থা। তবে মেঝেতে রোগীদের রাখা ঠিক নয়। বিকল্প কী করা যায়, তা দেখা হবে।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Government hospitals

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy