আরজি কর হাসপাতালে লিফ্টে আটকে পড়ে ৪০ বছর বয়সি যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় প্রশাসনের ব্যর্থতা মেনে নিলেন তৃণমূল বিধায়ক অতীন ঘোষ। তিনি ওই হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতিরও সদস্য। শুক্রবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন অতীন। সোমবার রোগী কল্যাণ সমিতির জরুরি বৈঠক ডাকবেন বলে জানিয়েছেন। দাবি, স্থানীয় স্তরে প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। হাসপাতালে এখনও রয়েছে নজরদারির অভাব। সকালেই ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন কলকাতা পুলিশের ডিসি (উত্তর) দীনেশ কুমার। আপাতত অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করেছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ইতিমধ্যে আরজি করে লিফ্ট বিভ্রাটকাণ্ডে বেশ কয়েক জনকে থানায় তলব করা হয়েছে। লিফ্টম্যানকেও ডাকা হয়েছে। এ ছাড়া, নিরাপত্তা ও নজরদারির দায়িত্বে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে পুলিশ কথা বলবে। কারও গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে পদক্ষেপ করা হবে।
আরও পড়ুন:
আরজি কর থেকে অতীন বলেন, ‘‘সোমবার রোগী কল্যাণ সমিতির জরুরি বৈঠক ডাকতে বলব। এই ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে হবে। দেখতে হবে প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিয়েছে। যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, তার জন্য চেষ্টা করতে হবে। সকলকে তৎপর হতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যর্থতায় এই ঘটনা, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।’’
২০২৪ সালের অগস্টে এই আরজি করেই রাতের ডিউটিতে কর্তব্যরত মহিলা চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুন করা হয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছিল নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক নজরদারি নিয়ে। তার পরেও কেন ছবিটা বদলাল না? হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উপরেই দায় চাপিয়েছেন অতীন। তিনি বলেন, ‘‘যাঁরা এই সমস্ত ক্ষেত্রে দায়িত্বে আছেন, তাঁরা দায় এড়াতে পারেন না। লিফ্ট পূর্ত দফতরের অধীনে। সেটা ঠিক মতো না চললে এখানে দায়িত্বে থাকা আধিকারিকদের দায় নিতে হবে। নিরাপত্তারক্ষীরা ঘটনাস্থলে না-থাকলে, সেটা তাঁদের দায়িত্ব। সংশ্লিষ্ট এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’’ রোগী কল্যাণ সমিতির ভূমিকা নিয়ে অতীন বলেন, ‘‘আমার নতুন কমিটির সবে দুটো বৈঠক হয়েছে। হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে কোথায় কী সমস্যা, আমরা চিহ্নিত করেছিলাম। আমি রোজ এখানে আসতেই পারি। কিন্তু তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন বলবে, অনধিকার চর্চা করছি। দৈনন্দিন প্রশাসনে মাথা গলানোর ক্ষমতা রোগী কল্যাণ সমিতির আইন আমাকে দেয়নি। বৈঠক ছাড়া তাই কিছু বলতে পারছি না। এটা একেবারেই নজরদারির অভাবের ফল।’’ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের সুপার সপ্তর্ষি চট্টোপাধ্যায়। কর্তৃপক্ষ বৈঠকে বসেছেন। কী ভাবে লিফ্ট পড়ে গেল, ২৪ ঘণ্টা লিফ্টম্যান থাকার নিয়ম সত্ত্বেও কেন সেখানে কেউ ছিলেন না, তা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন সুপার।
বিধানসভা নির্বাচনের আগে আরজি কর হাসপাতালকে ফের শিরোনামে তুলে আনল শুক্রবার সকালের ঘটনা। চার বছরের সন্তানের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গিয়েছিলেন দমদমের বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। লিফ্টে পাঁচতলা থেকে নীচে নামার সময়েই দুর্ঘটনা ঘটে। অভিযোগ, প্রবল ঝাঁকুনির পর লিফ্ট নীচে পড়ে যায়। দীর্ঘ ক্ষণ দরজা খোলা যায়নি। পরিবারের লোকজনের আকুতিতেও কেউ কর্ণপাত করেননি বলে অভিযোগ। দেড় থেকে দু’ঘণ্টা আটকে থাকার পর অরূপের মৃত্যু হয়। বিক্ষোভে ফেটে পড়েন তাঁর পরিজনেরা। হাসপাতাল চত্বরে বিক্ষোভ দেখান অন্যান্য রোগীর আত্মীয়েরাও। সূত্রের খবর, মৃতের স্ত্রী এবং সন্তান আরজি করেই চিকিৎসাধীন।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৮ অগস্ট রাতে এই আরজি কর হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিল্ডিংয়ে ধর্ষণ এবং খুন করা হয় এক চিকিৎসক-ছাত্রীকে। সেই ঘটনাকে ঘিরে তোলপাড় হয়েছিল রাজ্য রাজনীতি। ঘটনাক্রমে, প্রয়াত চিকিৎসকের মা বৃহস্পতিবারই পানিহাটি কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন। যদিও বৃহস্পতিবার প্রকাশিত বিজেপির দ্বিতীয় তালিকায় পানিহাটি কেন্দ্রে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। এ বার কলকাতার সেই হাসপাতালেই লিফ্ট আটকে মৃত্যু হল এক যুবকের। যা নিয়ে ফের সরগরম রাজনীতি।
অতীনের পর শুক্রবার আরজি করে গিয়েছেন ওই কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী রিতেশ তিওয়ারিও। তিনি প্রশানিক কর্তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘‘প্রশাসনের বিরুদ্ধে, যাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যার মামলা রুজু করা উচিত। টালা থানার স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এটা করা উচিত। তাতে পরিবার কিছুটা হলেও বিচার পাবে। পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং অন্তত এক জনকে সরকারি চাকরি দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’’