ভারত মহাসাগরের বুকে রণতরীতে মার্কিন হামলার পর এ বার পাল্টা হুঙ্কার দিল ইরান। জানিয়ে দিল, এর জন্য পস্তাতে হবে আমেরিকাকে। একই সঙ্গে জানাল, ‘ভারতীয় নৌসেনার অতিথি’-র উপরে হামলা চালিয়েছে আমেরিকা। কোনও রকম সতর্কবার্তা না দিয়েই ইরানি রণতরীতে হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ তেহরানের।
বুধবার ভোরে ভারত মহাসাগরের বুকে ইরানি রণতরী ‘ডেনা’-র উপরে হামলা চালায় মার্কিন ডুবোজাহাজ। টর্পেডো ছুড়ে ইরানের যুদ্ধজাহাজকে ধ্বংস করে দেয় তারা। মার্কিন টর্পেডোর হামলার ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ৮৭ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে। জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা গিয়েছে ৩২ জনকে। কিন্তু এখনও প্রায় ৬০ জনের কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবারও ওই নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। তবে এত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরে তাঁদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনাও ক্ষীণ হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
আমেরিকার হামলার পরে এ বার মার্কিন বাহিনীকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখলেন ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, “ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ২০০০ মাইল (৩২১৮ কিলোমিটার) দূরের সমুদ্রে এক নির্মম কাণ্ড ঘটিয়েছে আমেরিকা। কোনও সতর্কবার্তা না দিয়েই আন্তর্জাতিক জলসীমায় ভারতীয় নৌসেনার অতিথি ফ্রিগেট ‘ডেনা’র উপরে হামলা করে তারা। জাহাজে তখন প্রায় ১৩০ জন ছিলেন। মনে রাখবেন, আমেরিকা যে কাণ্ড ঘটিয়েছে তার জন্য ওদের পস্তাতে হবে।”
বুধবারের ওই হামলাটি হয়েছিল শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলের কাছে। শ্রীলঙ্কার নৌসেনাই ওই যুদ্ধজাহাজে উদ্ধারকাজ শুরু করে। যে ৩২ জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে, তাঁরা এখন ভর্তি রয়েছেন শ্রীলঙ্কার দক্ষিণে বন্দর শহর গলের এক হাসপাতালে।
সম্প্রতি, ভারতের বিশাখাপত্তনমে একটি আন্তর্জাতিক নৌসেনা মহড়া হয়েছিল। সংবাদসংস্থা পিটিআই জানাচ্ছে, ভারত আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক নৌমহড়ায় অংশগ্রহণ করেছিল ইরানি যুদ্ধজাহাজটি। যদিও ভারতীয় নৌসেনার তরফে এ বিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। এ বার ইরানের বিদেশমন্ত্রীও দাবি করলেন, মার্কিন টর্পেডো হানায় ডুবে যাওয়া রণতরীটি ছিল ভারতীয় নৌসেনার ‘অতিথি’।
আরও পড়ুন:
আরাঘচির পোস্টের বিষয়েও ভারত সরকারের তরফে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে সরকারি সূত্রকে উদ্ধৃত করে একাংশের দাবি, ১৬-২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ওই নৌমহড়ায় অংশগ্রহণ করেছিল ডেনা। ভারতের জলসীমা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরে সেটিকে আর ভারতের ‘অতিথি’ বলা যায় না বলেই দাবি ওই সূত্রের।
ডেনার উপর হামলার পরে এ বার উপকূলীয় এলাকায় সতর্কতা বৃদ্ধি করেছে শ্রীলঙ্কা। বৃহস্পতিবার কলম্বো জানিয়েছে, তাদের উপকূলীয় এলাকায় আরও একটি ইরানি জাহাজ রয়েছে। সেটিকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে শ্রীলঙ্কা। দ্বীপরাষ্ট্রের মন্ত্রিসভার মুখপাত্র নালিন্দা জয়তিসা বলেন, “আমরা (ইরানি জাহাজে থাকা মানুষদের) জীবন রক্ষার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছি।”
শ্রীলঙ্কার উপকূলে বুধবার কে বা কারা ইরানি নৌসেনার উপরে হামলা চালিয়েছে, তা প্রাথমিক ভাবে স্পষ্ট ছিল না। যদিও শ্রীলঙ্কার নৌসেনা এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে জানা যায়, কোনও এক ডুবোজাহাজই হামলা করেছে ইরানের রণতরীতে। পরে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। মার্কিন আধিকারিক সূত্রে রয়টার্স দাবি করে, ওই হামলা চালিয়েছে আমেরিকাই। ঘটনাচক্রে, এর অব্যবহতি পরেই পেন্টাগনও স্বীকার করে নেয় হামলার কথা। যদিও সরাসরি শ্রীলঙ্কা উপকূলের কথা উল্লেখ করেনি তারা।
পেন্টাগন থেকে সাংবাদিক বৈঠকে মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ জানান, আমেরিকার ডুবোজাহাজ আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজকে ডুবিয়ে দিয়েছে। তাঁর দাবি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই প্রথম বার টর্পেডো দিয়ে হামলা করে শত্রুপক্ষের কোনও জাহাজে ডুবিয়েছে আমেরিকা।
মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিব হেগসেথ বলেন, “একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ মনে করছিল, আন্তর্জাতিক জলসীমায় তারা নিরাপদ থাকবে। সেই জাহাজকে ডুবিয়ে দিয়েছে আমেরিকার ডুবোজাহাজ। টর্পেডো দিয়ে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে।” হেগসেথের এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট আমেরিকার অভিপ্রায়। আন্তর্জাতিক জলসীমাতেও যে ইরান আর ‘সুরক্ষিত’ নয়, তা শ্রীলঙ্কা উপকূলে এই হামলা থেকেই বুঝিয়ে দিয়েছে পেন্টাগন।