বাবা আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের হত্যার এক সপ্তাহ পরে তাঁর পদে বসেছেন পুত্র। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হয়েছেন ৫৬ বছরের মোজতবা খামেনেই। ৮৮ জন শিয়া ধর্মনেতার একটি দল তাঁকে বাছাই করেছে। কেউ কেউ বলছেন, এটা প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদন বলছে, পুত্রকে নিজের উত্তরসূরি করতে নাকি অনিচ্ছুক ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। তবে কাকে করতে চেয়েছিলেন? যদিও ইরানবাসীদের বড় অংশের কাছে মোজতবা ‘রহস্যময়’ এক চরিত্র। বহু বছর ক্ষমতার ছায়ায় থেকেছেন তিনি। তবে প্রকাশ্যে আসেননি। এ বার সেই মোজতবাই হাল ধরবেন ইরানের। তাঁর হাতে থাকেব ইসলামিক রেভলিউশনার গার্ড কোরের রাশ।
ইরানে লাগাতার হামলা চালাচ্ছে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল। তার মাঝেই সোমবার ভোরে (ইরানের সময়) একটি বিবৃতি পেশ করে খামেনেইয়ের উত্তরসূরি হিসাবে মোজতবার নাম ঘোষণা করেছে তেহরান। আর তা করেই বুঝিয়ে দিয়েছে, এই বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনও দাবি তারা মানছে না। ইরানের রাশ থাকবে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতেই, আর সেই ধর্মীয় নেতা খোদ খামেনেইয়ের পুত্র। সেই খামেনেই, যাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে মেরেছে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল।
খামেনেই বেঁচে থাকতে মোজতবাকে সে ভাবে প্রকাশ্যে আসতে দেখা যায়নি। দেশবাসীর একটা বড় অংশের কাছে তিনি ‘রহস্যময়’ চরিত্র। বাবা বেঁচে থাকতে বরাবর নেপথ্যে থেকে কাজ করেছেন। তবে খামেনেইয়ের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক বরাবর। ইরানের বাহিনী, গোয়েন্দা বিভাগের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করার দায়িত্ব অনেকটাই ছিল তাঁর কাঁধে। সূত্রের খবর, ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের সঙ্গেও বরাবর ভাল সম্পর্ক মোজতবার। গত শতাব্দীর আশির দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময়ে বিভিন্ন অভিযানে গিয়েছিলেন তিনি। সে সময় তিনি হাবিব ব্যাটেলিয়নে নিযুক্ত ছিলেন।
আরও পড়ুন:
-
তেহরানের পাশে থাকার বার্তা পুতিনের, শুভেচ্ছা খামেনেইয়ের পুত্রকে! ইরানি হামলায় মৃতের সংখ্যা বাড়ল ইজ়রায়েলে
-
খামেনেইয়ের উত্তরসূরির নাম ঘোষণা করে দিল ইরান! সর্বোচ্চ নেতা পুত্র মোজতবাই, ট্রাম্পের দাবি উড়িয়ে সিদ্ধান্তে সিলমোহর
-
আমেরিকা-ইজ়রায়েলকে সমর্থন করলে বাজেয়াপ্ত হবে সম্পত্তি, জুটবে শাস্তিও! প্রবাসী ইরানিদের হুঁশিয়ারি তেহরানের
কিন্তু মোজতবাকে প্রকাশ্যে তেমন দেখা যায়নি। দেশবাসীর উদ্দেশে কখনও তাঁকে বক্তব্য রাখতে শোনা যায়নি। প্রশাসনের কর্মসূচিতেও দেখা যায়নি। তবে মোজতবা নিজে নাকি দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুতই ছিলেন। এমনটাই বলছেন জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ে ইরান এবং শিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ভালি আর নাসর। তাঁর মতে, বহু বছর আগে থেকেই খামেনেইয়ের উত্তরসূরি হিসাবে মোজতবার নাম গণ্য করা হচ্ছিল ইরানে। কিন্তু গত দু’বছর সেই দৌড়ে যেন কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিলেন খামেনেই পুত্র। তার নেপথ্যে ছিলেন তাঁর বাবা-ই, দাবি ভালির। ঘনিষ্ঠদের খামেনেই নাকি স্পষ্টই জানিয়েছিলেন যে, নিজের উত্তরসূরি হিসাবে তিনি মোজতবাকে বসাতে চান না। কারণ, তা হলে ইরানে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদ উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত পদে পরিণত হবে।
১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের রাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। সে সময় জনগণকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সর্বোচ্চ নেতার পদ উত্তরাধিকার সূত্রে পরের প্রজন্মের হাতে যাবে না। খামেনেইয়ের আশঙ্কা ছিল, নিজের পুত্রকে নিজের পদে বসালে জনমানসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। সে কারণে গত কয়েক বছর মোজতবা পদের দৌড়ে একটু হলেও পিছিয়ে পড়েছিলেন। এ কথা দাবি করেছেন খামেনেই ঘনিষ্ঠ তিন প্রশাসনিক কর্তা। যদিও ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ তাঁদের নাম প্রকাশ করেনি।
ওই সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মোজতবার পদপ্রাপ্তিতে খুশি ইরানের বাহিনী। খুশি ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি। তবে আয়াতোল্লার বিরুদ্ধে দেশের যে অংশ বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল, তারা মোজতবার পদপ্রাপ্তিকে স্বাভাবিক ভাবেই অখুশি। সংঘাত বিধ্বস্ত ইরানে এখনও তারা নতুন করে কোনও বিক্ষোভ দেখাচ্ছে না। তবে ওই অংশ যে মোজতবাকে মেনে নেবে না, তা একপ্রকার স্পষ্ট। তা ছাড়া মোজতবার বিরুদ্ধে বিদেশে বেআইনি ভাবে টাকা পাঠিয়ে সম্পত্তি ক্রয়-সহ কিছু অভিযোগ রয়েছে। এ দিকে তাঁকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদে বসিয়ে আমেরিকা, ইজ়রায়েলকে ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে, আপাতত সংঘাতে তারা ইতি টানছে না। এই পরিস্থিতিতে ঘরে-বাইরে আগামী দিন যে তাঁর কাছে খুব মসৃণ হবে না, তা একপ্রকার স্পষ্ট।