• ঈশানদেব চট্টোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

অন্য 'জাতিস্মর'! ভুবন পেরিয়ে কলকাতায় এসে বাঙালি মাকে খুঁজছেন ফরাসি অ্যাঞ্জেলা

Angela
মা-কে খুঁজতে ফ্রান্স থেকে পশ্চিমবঙ্গে অ্যাঞ্জেলা কেলড।

বুড়োটে উত্তর কলকাতার ঝিম ধরা গলির মধ্যে সেঁধিয়ে থাকা একটা আধা-দাতব্য হাসপাতাল। সুদূর ইউরোপে ছবি আর কবিতার দেশ ফ্রান্স। আর প্রশান্ত সাগর পাড়ে পল্লবিত হয়ে ওঠা বিশ্বজয়ী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি হলিউড। এক বিন্দুতে এসে মিলছে হঠাৎ।

প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার উড়ে এসেছেন অ্যাঞ্জেলা কেলড। উড়ে এসেছেন যেন এক জন্ম থেকে আর এক জন্মের দেশে। এসেছেন নিজের ‘শিকড়’ খুঁজতে। কোথায় খুঁজবেন, কী ভাবে খুঁজবেন, আদৌ খুঁজে পাবেন কি না— কিছুই জানেন না। জানেন শুধু একটা নাম— লিলি সিংহ।

প্যারিসের অনতিদূরে বাড়ি অ্যাঞ্জেলার। পেশাদার ফোটোগ্রাফার। বয়স এখন ৪২। আর ৪২ বছর আগের ওই তারিখটাই তাঁকে জুড়ে রেখেছে কলকাতার সঙ্গে।

বাবা-মাকে যেমন দেখতে, তাঁকে ঠিক তেমন দেখতে নয়। ভাই নিকোলা অনেকটা তাঁরই মতো। কিন্তু কমিউনিটি সেন্টারে আলাপ হল যে ছেলেটার সঙ্গে বা ক্লাসরুমে পাশে বসে যে মেয়েটা, তাদের মুখের গড়ন অন্য রকম, রঙেও ফারাক। ছোটতেই কৌতূহলটা জেগেছিল। বাবা-মা সে কৌতূহল নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টা একটুও করেননি। ছোটতেই অ্যাঞ্জেলাকে তাঁরা জানিয়েছিলেন, তার শিকড় ভারতে। সাত মাস বয়স থেকে ফ্রান্সে অ্যাঞ্জেলা। অতএব ‘মা’ ডাকতেও শিখেছিলেন ফরাসিতেই। কিন্তু আসলে তিনি বাঙালি, জানিয়েছিলেন ফরাসি মা-বাবা-ই।

২১ নভেম্বর, ১৯৭৭। রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিটের জে এন রায় হাসপাতালে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন এক কুমারী মা। সামাজিক সঙ্কটের ভয়ে হোক বা অন্য কোনও কারণে, সেই মা আর খোঁজ নেননি সেই শিশুর। সদ্যোজাতকে নিয়ে যায় মাদার হাউজ, নাম রাখা হয় অ্যাঞ্জেলা। যখন বয়স সাত মাস, তখন এক ফরাসি দম্পতি দত্তক নেন অ্যাঞ্জেলাকে। আদালতের মাধ্যমে উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই দত্তক দেওয়া হয়। অ্যাঞ্জেলাকে ফরাসি মা-বাবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয় মাদার হাউজের তরফ থেকেই।

 ফরাসি বাবা মায়ের কোলে ৭ মাসের অ্যাঞ্জেলা কেলড।

৪২ বছর পরে জে এন রায় হাসপাতালে ফিরে এসে অ্যাঞ্জেলা বললেন, ‘‘একটা হলিউড মুভি দেখেছিলাম— লিয়ঁ। তার পরেই সিদ্ধান্ত নিই, কলকাতায় আমাকে পৌঁছতেই হবে।’’ কয়েক দিনের আলাপে অ্যাঞ্জেলার দোভাষী হয়ে উঠেছেন প্যারিস প্রবাসী স্নেহদীপ কায়েত। ‘লিয়ঁ’ শুনে প্রথমে ধন্দে পড়েছিলেন তিনি। ফরাসি শহর লিয়ঁ-র কথা বলছেন কি? ফরাসিতেই আর এক বার জিজ্ঞাসা করে নিয়ে বাংলায় জানালেন, মুভিটার নাম ‘লায়ন’, ফরাসি সংস্করণে ‘লিয়ঁ’। সেই ছবির কাহিনী এক আমেরিকান মেয়েকে নিয়ে, যিনি মা-কে খুঁজতে ভারতে এসেছিলেন। হৃদয় ছলকে উঠেছিল অ্যাঞ্জেলার। জন্মদাত্রী মা-কে খুঁজতে তিনিও যেতে চান, নিজের শিকড়, নিজের সভ্যতা, নিজের সংস্কৃতিকে চিনে আসতে চান— সে দিনই মনে হয়েছিল বাঙালি মায়ের ফরাসি মেয়ের।

মা-বাবাকে অকপটে অ্যাঞ্জেলা জানান নিজের ইচ্ছার কথা। আর মেয়ের সে ইচ্ছাকে প্রথম দিন থেকে উৎসাহিত করতে থাকেন ফরাসি দম্পতি। ‘‘মা-বাবা সব সময়ই বলে এসেছেন— জন্মদাত্রীকে খুঁজে বার করার চেষ্টা অবশ্যই তোমার করা উচিত, অবশ্যই ভারতে যাওয়া উচিত। আমিই গুছিয়ে উঠতে পারছিলাম না। কিন্তু মা-বাবারও বয়স হচ্ছে। তাঁরা চাইছিলেন, তাঁরা থাকতে থাকতেই আমি এই কাজটা সেরে ফেলি। তাই আর দেরি করলাম না।’’ বলে চলেন অ্যাঞ্জেলা। কখনও চোখের কোণটা চিকচিক করে ওঠে বাষ্পে। কখনও আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঠোঁট দু’টোকে শক্ত করে চেপে ধরেন। আর শিশুর চাহনিতে প্রশ্ন করেন, ‘‘লিলি সিংহকে আমি খুঁজে পাব?’’

জে এন রায় হাসপাতালের রেকর্ড বলছে, ১৯৭৭ সালের ২১ নভেম্বর কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন লিলি সিংহ নামে এক মহিলা। সেই শিশুকে মাদার হাউজের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।

আর অ্যাঞ্জেলা বড় হয়ে নিজের জন্ম এবং পরিচয় সংক্রান্ত যে নথি হাতে পান, তা থেকেই তিনি জানতে পারেন যে, তাঁর জন্মদাত্রীর নাম লিলি সিংহ এবং তাঁর জন্মস্থান কলকাতার জে এন রায় হাসপাতাল।

কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত সম্পর্কে টুকটুক করে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন অ্যাঞ্জেলা। ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় লিলি সিংহ বা জে এন রায় হাসপাতালকে খুঁজছিলেন হন্যে হয়ে। হাসপাতালটি নিজেদের ওয়েবসাইট এবং ফেসবুক পেজ লঞ্চ করতেই হাতে চাঁদ পান বাঙালি মায়ের ফরাসি মেয়ে। ফেসবুক পেজটার মাধ্যমেই তিনি যোগাযোগ করেন হাসপাতালের বর্তমান কর্তা সজল ঘোষের সঙ্গে। সজলের কথায়, ‘‘প্রথমে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পেয়ে অ্যাকসেপ্ট করতে চাইনি। ভেবেছিলাম জালিয়াতির খপ্পরে পড়তে পারনি। কিন্তু অ্যাঞ্জেলা এক নাগাড়ে যোগাযোগের চেষ্টা চালাতে থাকেন। মাস ছয়েক এই রকম চলার পরে আমি ফেসবুকেই কথা বলি। উনি ফেসবুকেই যাবতীয় নথিপত্র দেখান। তার পরে আমরা হাসপাতালের রেকর্ডও পরীক্ষা করি। দেখি ওঁর কথা মিলে যাচ্ছে। তখন আমি ওঁকে কলকাতায় আসতে বলি। সব রকম সাহায্য করব বলে জানাই।’’

যেমন কথা, তেমন কাজ। নিজের ম্যানেজারকে সঙ্গে নিয়ে প্যারিস থেকে দিল্লির উড়ান ধরেন অ্যাঞ্জেলা। দিল্লি থেকে কলকাতা। উড়ানেই আলাপ হয় বাঙালি যুবক স্নেহদীপ কায়েতের সঙ্গে। প্যারিসে স্নাতকোত্তর পড়ে প্যারিসেই এখন চাকরি করছেন স্নেহদীপ। ফরাসিতে চোস্ত। বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে বাটানগরের বাড়িতে ফিরছিলেন। উড়ানে অ্যাঞ্জেলার কাহিনি শুনে আপাতত তাঁর দোভাষী হয়ে ওঠার দায়িত্বটা নিজে থেকেই কাঁধে তুলে নেন স্নেহদীপ। তার পরে রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিটের হাসপাতালে বসে অ্যাঞ্জেলার কথাগুলো সংবাদমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেছেন তিনিই। সেতু হয়ে উঠেছেন অ্যাঞ্জেলার বাঙালি জন্ম আর ফরাসি জন্মের মাঝে।

১৯ নভেম্বর কলকাতার মাটি ছুঁয়েছেন অ্যাঞ্জেলা কেলড। থাকবেন ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সপ্তাহ তিনেকের এই সফরে বেরিয়ে পড়ার আগে ফ্রান্সে বড়সড় ফ্যামিলি মিটিং ডেকেছিলেন তাঁর মা-বাবা। অ্যাঞ্জেলাকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য। ভাই নিকোলা-ও ভারতীয়। পুদুচেরি থেকে তাঁকে দত্তক নিয়েছিলেন ফরাসি দম্পতি। কিন্তু ভারত সম্পর্কে নিকোলা আগ্রহী নন। যাঁরা তাঁকে ত্যাগ করেছিলেন, তাঁদের বিষয়ে ভাবতেই চান না নিকোলা। কিন্তু জাতিস্মরকে যেমন আকুল হাতছানি দেয় জন্মান্তর, কলকাতা বোধ হয় সে ভাবেই ডাকছিল অ্যাঞ্জেলাকে। গোটা পরিবার পাশে দাঁড়িয়ে আরও সহজ করে দিয়েছে অ্যাঞ্জেলার পথটা।

বাবা, মা এবং ভাই নিকোলার সঙ্গে অ্যাঞ্জেলা

এক গোলার্ধ থেকে আর এক গোলার্ধে এসে তো পড়েছেন। কিন্তু এ বার কী ভাবে খুঁজে পাবেন লিলি সিংহকে? কোথায় তাঁর বাড়ি? কলকাতাতেই? নাকি শহরতলির কোথায়? তখন যেখানে বাড়ি ছিল, এখনও কি সেখানেই রয়েছে? নাকি অ্যাঞ্জেলাকে জন্ম দেওয়ার অতীতকে অনেক পিছনে ঠেলে দিয়ে অন্য কোনও পরিবার বা সংসারের কর্ত্রী হয়ে গিয়েছেন লিলি সিংহ এখন? হাজার সম্ভাবনা। সবটাই অজানা। কোনও প্রশ্নের উত্তর নেই। শুধু বুক ভরা আশা রয়েছে। খবরটা পড়ে হয়তো লিলি সিংহর হৃদয় সাড়া দেবে। ১৯৭৭ সালের ২১ নভেম্বর— এই তারিখটা দেখেই হয়তো ৪২ বছর আগে পরিত্যক্ত অপত্যকে লিলি সিংহ চিনে নেবেন। আশা অ্যাঞ্জেলার। আশঙ্কাও। যদি খবরটাই চোখে না পড়ে? অথবা যদি চোখে পড়ার পরেও সে জন্মদাত্রী সাড়া না দেন? যে কারণে পরিত্যাগ করেছিলেন, সেই কারণেই যদি আজও সাড়া দিতে বেধে যায়?

তবু হাল ছাড়তে নারাজ অ্যাঞ্জেলা। আকুল হয়ে বলছেন, ‘‘খবরটা একটু ছড়িয়ে দিন। আমি শুধু একবার তাঁকে দেখতে চাই। তিনি যদি গোপনে সাড়া দিতে চান, গোপনেই হবে। কেউ জানবেন না, কিন্তু আমি আমার জন্মদাত্রীকে একবার দেখতে চাই।’’

কী ভাবে হবে গোপনে? ‘‘যদি আমি তাঁর খোঁজ পাই, যদি তিনি নিজের খোঁজ দেন, তা হলে আগে ফোনে কথা বলে নেব। আমার পরিচয় প্রকাশ্যে স্বীকার করে নিতে তাঁর কোনও আপত্তি রয়েছে কি না, জেনে নেব। আপত্তি থাকলে অনুরোধ করব, একবার অন্তত লুকিয়ে হলেও দেখা করুন।’’ গলা বন্ধ হয়ে আসে।

তবে পথ বন্ধ বলে মনে করছেন না অ্যাঞ্জেলা। আপাতত শুধু মায়ের খোঁজ। আর খিদে পেলে বাঙালি রেস্তরাঁগুলোয় ঢুঁ মারার ইচ্ছা। ৯ ডিসেম্বরের মধ্যে যদি খুঁজে না পান মাকে, তা হলে খালি হাতেই ফিরতে হবে ফ্রান্সে। কিন্তু অ্যাঞ্জেলা বলছেন, এ সফরই শেষ সফর নয়। সজল ঘোষ যে ‘দাদা’র মতো হয়ে উঠেছেন ইতিমধ্যেই, কলকাতায় এসে যে বৃহত্তর পরিবার পেয়ে গিয়েছেন একটা, সে কথা সাগ্রহে জানাচ্ছেন অ্যাঞ্জেলা। হাসপাতালের কোনও কর্মী ‘সজলদা’ বলে সম্বোধন করলে অ্যাঞ্জেলা বলে দিচ্ছেন, ‘দা’ মানে যে ‘দাদা’, তা তিনি জানেন। আর বলছেন, ‘‘এই বৃহত্তর পরিবারের টানেই বার বার আসতে পারি।’’

টান যে নাড়িতেই।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন