স্বাধীনতা সংগ্রামী সুশীল ধাড়া গড়ে তুলেছিলেন ‘মাতৃ ভবন’। এক সময় এলাকার প্রসূতিরা চিকিৎসা পরিষেবা পেতেন এখানে। সেই সঙ্গে বিনামূল্যে চিকিৎসার সুয়োগ পেতেন এলাকার মানুষ। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মৃতি বিজড়িত সেই ‘মাতৃ ভবন’-এর ভোল বদলে তাকে বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠল পরিচালন কমিটির বিরুদ্ধে।
 
স্বাধীনতা দিবসের আগে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মৃতি বিজড়িত ভবনের এমন পরিণতি নিয়ে প্রতিবাদে মুখর হয়েছে এলাকার মানুষ। অভিযোগ উঠেছে সরাসরি শাসক দলের বিরুদ্ধে। গোটা ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় সহ একাধিক দফতরে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন মাতৃ ভবন তৈরির জন্য জমিদাতা ও গ্রামের বাসিন্দারা।
 
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৯৫৬ সালে মহিষাদল ব্লকের বাগদা গ্রামে চার বিঘা জমিতে গড়ে ওঠেছিল ‘মাতৃ ভবন’। স্বাধীনতা সংগ্রামী সুশীল ধাড়ার অক্লান্ত চেষ্টায় গড়ে উঠেছিল এই ভবন। উদ্দেশ্য ছিল প্রসূতিদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসকেরা নিয়মিত এখানে এসে রোগী দেখতেন। বিনামূল্যে চিকিৎসার সুযোগ পেয়ে ভিড় করতেন বাগদা, সরবেড়িয়া, তাজপুর, মলুবসান, রাজারামপুর, কাউকুণ্ডু, কাশিমনগর, কাঞ্চনপুর প্রভৃতি গ্রামের মানুষ।
 
স্থানীয় প্রবীণদের দাবি, সুশীলবাবুর জীবদ্দশায় ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছিল ‘মাতৃ ভবন। এক সময় ভবনকে ঘিরে অসামাজিক কাজের অভিযোগও ওঠে। সম্প্রতি দেখা যায় ভবনের ভোল পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা তথা একদা সুশীল ধাড়ার সহযোদ্ধা চিত্তরঞ্জন সামন্ত বলেন, ‘‘এটা দুর্ভাগ্যের যে সুশীলদার স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসায়িক কাজে লাগানো হচ্ছে। প্রতিষ্ঠান পরিচালন কমিটির তরফে ওখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরির জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছিলাম। কিন্তু তা হয়নি।’’
 
স্থানীয় সূত্রে খবর, ভবনটি স্থানীয় এক ব্যবসায়ীকে বছরে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে পাঁচ বছরের জন্য লিজ দিয়েছে বর্তমান পরিচালন কমিটি। ওই ব্যবসায়ী ইতিমধ্যেই গোটা ভবনের খোলনলচে বদলে ফেলেছেন। গ্রাম কমিটির সম্পাদক প্রফুল্ল বেরার দাবি, হাসপাতাল সহ মাতৃ ভবনের ভিতরে প্রায় কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে। এ ভাবে ব্যবসায়িক স্বার্থে তা ব্যবহার বেআইনি। পরিচালন কমিটির একাংশের দাবি, প্রতিষ্ঠান তৈরির সময় যে সংবিধান তৈরি হয়েছিল সেখানে এভাবে ভবনের চেহারা বদলে দেওয়া কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে না বলে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সেই বিধি মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ।
 
বর্তমান পরিচালন কমিটির সম্পাদক পদে রয়েছেন জেলা পরিষদ সদস্য শ্রাবণী মল্লিকের স্বামী তথা স্থানীয় তৃণমূল নেতা তাপস মল্লিক। তাঁর মদতেই স্বাধীনতা সংগ্রামীর স্মৃতি বিজড়িত মাতৃ ভবন নিয়ে ব্যবসা চালানোর তোড়জোড় চলছে বলে বিজেপির অভিযোগ। জেলা বিজেপি সভাপতি (তমলুক) নবারুণ নায়েক বলেন, ‘‘শাসক দলের ওই নেতা কাটমানি নিয়েছেন ওই ব্যবসায়ীর কাছে। তাই স্বাধীনতা সংগ্রামীর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসায়িক স্বার্থে হস্তান্তর করতে বাধেনি।’’ যদিও অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তাপসের দাবি, অতীতে পরিচালন কমিটি প্রচুর দেনা করে গিয়েছে। তাই ঋণ পরিশোধ করার জন্য পরিচালন কমিটিতে আলোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত হয়েছে।’’ তাঁর দাবি, এই প্রতিষ্ঠানে যাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা যায়, তার জন্য চেষ্টা চলছে। যদিও বিষয়টি তাদের অজানা বলে দাবি করেছে মহিষাদল ব্লক প্রশাসন। মহিষাদলের বিডিও জয়ন্ত কুমার দে বলেন, ‘‘কী হয়েছে, খোঁজ নিয়ে দেখছি।’’