Advertisement
৩১ জানুয়ারি ২০২৩
COVID-19 Epidemic

করোনা: ভয়ের পাশাপাশি আমাদের আয়নার সামনে দাঁড়ানোরও সময়

এত দিন মুখের উপরে মুখোশকে আমরা জেনে এসেছি নেতিবাচক অর্থে, আর আজ সেই মুখোশই সব থেকে ইতিবাচক দিক আমাদের জীবনে।

অলঙ্করণ:শৌভিক দেবনাথ

অলঙ্করণ:শৌভিক দেবনাথ

উজ্জ্বল সিনহা
শেষ আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২০ ১৬:১০
Share: Save:

পৃথিবী বদলে গেছে...

Advertisement

এই লেখার প্রতিটি শব্দ লিখছি যখন, ক্রমাগত বদল ঘটে চলেছে সংখ্যার। সে সংখ্যা পৃথিবী জুড়ে আক্রান্ত এবং মৃতের। করোনাভাইরাসের করাল গ্রাসে তোলপাড় গোটা দুনিয়া। একটা সময় পর্যন্ত ভারত কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে থাকলেও, এখন এখানে আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা প্রতি দিন বেড়ে চলেছে। টিভির পর্দায় তাকালেই অনেকটা লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের সময় ভেবে ভুল হয়। রাজ্যের নাম এবং তার পাশে সংখ্যা বসানো! যেমনটা আমরা লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল সম্প্রচারের সময়ে দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সংখ্যাটা আসনের নয়, বরং আক্রান্ত এবং মৃত মানুষের।

আমার তো বটেই এবং তার পরবর্তী প্রজন্মের মানুষও তাঁদের জীবদ্দশায় এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি কখনও। আমরা মন্বন্তর দেখিনি কিংবা প্রত্যক্ষ করিনি স্বাধীনতা যুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ এবং উদ্বাস্তু মানুষদের হাহাকার। তুলনামূলক ভাবে আমরা একটি স্থিতিশীল সময়ের সন্তান হিসাবে কাটিয়েছি, অন্তত আমাদের এখনও পর্যন্ত জীবন। এই করোনাভাইরাস ঘিরে যে বাস্তবতার সম্মুখীন আজ আমরা, তা আক্ষরিক অর্থেই আমাদের কাছে এক ভয়ানক অদ্ভুত সময়। যে আমরা চিরকাল শিখে এসেছি, প্রকৃত মানুষ হতে হলে অন্য মানুষের কাছে যেতে হয়, তাঁর পাশে দাঁড়াতে হয়, আজ সেই ধারণাটাই আমূল বদলে গিয়েছে। মানুষের থেকে দূরে থাকাই আজ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শ্রেষ্ঠ উপায়। এত দিন মুখের উপরে মুখোশকে আমরা জেনে এসেছি নেতিবাচক অর্থে, আর আজ সেই মুখোশই সব থেকে ইতিবাচক দিক আমাদের জীবনে। বিদেশফেরত মানুষেরা এত দিন যে অতিরিক্ত সম্ভ্রম আদায় করে এসেছিলেন আমাদের কাছে, আজ সেই বিদেশফেরতরাই আমাদের ভ্রূকুটির মুখোমুখি বেশি করে। ‘লকডাউন’, ‘সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং’ ইত্যাদি আপাত অচেনা শব্দবন্ধগুলোই এখন সব থেকে চর্চিত আমাদের আজকের রোজকার অভিধানে। সত্যিকার অর্থেই আমাদের চেনা পৃথিবী আজ বদলে গিয়েছে পুরোপুরি। যা দেখি সব নতুন লাগে।

Advertisement

আমি কোন পথে যে চলি...

এই পৃথিবী কলেরা মহামারি দেখেছে। প্লেগ দেখেছে। স্প্যানিশ ফ্লু দেখেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মৃত্যু মিছিল থেমে গিয়ে নতুন শুরু দেখেছে এই পৃথিবী। একই রকম ভাবে এই করোনাভাইরাসে বিপর্যন্ত, দিশাহারা সময় অতিক্রম করে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরব আবার আমরা। অর্থনৈতিক বিপর্যয় হয়তো কয়েক বছর বাদে কাটিয়ে উঠবে গোটা পৃথিবী। এই দুঃসময় হয়ত আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম তাদের ইতিহাস পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে জানবে এক দিন। কিন্তু আমরা যারা আজ এই দুঃসময় প্রত্যক্ষ করলাম, তাদের জীবনে, যাপনে, মননে, চিন্তনে কি এই অভিজ্ঞতা কোনও প্রভাব রেখে যাবে?

আরও পড়ুন: পড়ে থাকবে ক্ষতবিক্ষত সমাজ

বিপর্যয় পরবর্তী সময়ে আমাদের দুটো পথ খোলা আছে। প্রথমত, যেখানে আমাদের জীবন থমকে গিয়েছিল, সেখান থেকে একই ভাবে পরবর্তী সময়ে এগিয়ে চলা। এ ক্ষেত্রে করোনা নেহাতই একটি ঘটনা, যা অতিক্রম করে আমরা ফিরে যাব আমাদের অতীত জীবনে। অথবা দ্বিতীয়ত, এই দুঃসময় থেকে আমরা খুঁজে পেতে পারি এক নতুন বোধ, এক নতুন উপলব্ধি। আর তার আলোকে আমরা কিছুটা বদলে নিতে পারি আমাদের ভবিষ্যৎযাপন। প্রথম যে পথের কথা বলছি, তা আমার কাছে নিতান্তই বোকামো বলে মনে হয়। কারণ, সময় আমাদের কাছে শিক্ষক হিসেবে হাজির হলেও, আমরা তার কাছ থেকে কিছুই শিখে উঠতে পারিনি সে ক্ষেত্রে। আমার কাছে মনে হয়, আমাদের অস্তিত্ব এক আশ্চর্য ঘটনা যা দাঁড়িয়ে আছে কিছু সূক্ষ্ম ভারসাম্যের উপরে। আমাদের ঘিরে থাকা জীবজগৎ, বাস্তুতন্ত্র, প্রকৃতি, আবহাওয়া— এই সব কিছুর ভারসাম্যই টিকিয়ে রাখছে আমাদের অস্তিত্ব। এই করোনা বিপর্যয় আমাদের অস্তিত্বকে নতুন করে ভাবার ও বোঝার সুযোগ করে দিয়েছে।

আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে...

এই লকডাউনের সময় ভোরবেলা ঘুম ভাঙলে কিছু কি বদল অনুভব করছেন আপনি? রাতে ছাদে গিয়ে নতুন কিছু কি চোখে পড়ছে আপনার? ভাল করে ভেবে দেখুন। এত পাখির ডাক কি শুনতেন আপনি আগে? আকাশ ভরা এত তারা চোখে পড়তো কি আগে আপনার? আমরা আজ গৃহবন্দি বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে প্রকৃতি। দূষণ কমেছে বলে আমাদের ঘিরে থাকা জীবজগৎ, প্রকৃতি আজ নতুন প্রাণ খুঁজে পেয়েছে। খবরে দেখেছি, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে আমাদের গৃহবন্দি থাকার সুযোগে আনন্দে মেতেছে অন্য প্রাণীরা। আমরা আমাদের রোজকার জীবনে এত দিন শুধু নিজের অস্তিত্ব এবং উন্নয়ন নিয়েই মশগুল থেকেছি। মনে রাখিনি আমাদের ধারণ করা প্রকৃতির কথা, আমাদের ঘিরে থাকা বাকি জীবজগতের কথা। এই করোনা বিপর্যয় আমাদের অনুভব করার সুযোগ করে দিয়েছে— অন্য জীবদের বেঁচে থাকার, নিজের মতো করে আনন্দে থাকার অধিকারের কথা। এই পৃথিবী শুধু আমাদের নয়, একই সঙ্গে তাদেরও, এই উপলব্ধিটুকু এই বিপর্যয়ের মধ্যে থেকে আমাদের শিক্ষা। এই বর্তমান পরিস্থিতি আসলে সমগ্র মানব সমাজকে আয়নার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সেই আয়নায় তাকিয়ে নিজেদের সংশোধন করার এটাই আদর্শ সময়। তাই করোনা পরবর্তী সময়ে আমাদের ঘিরে থাকা বাকি জীবজগতের অস্তিত্ব নিয়েও আমরা আন্তরিক হব, এই আমার প্রত্যাশা।

বেঁচে থাকার গান...

করোনার হাত থেকে বাঁচতে আমাদের মগজে ঢুকে গিয়েছে একটি বীজমন্ত্র— ঘন ঘন হাত ধুয়ে নেওয়া। বাইরে থেকে এসে বাড়িতে ঢুকেই আমাদের প্রথম কাজ হয়ে উঠেছে নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা। কিন্তু প্রাত্যহিক জীবনে আমরা ভুলে যাই, আসলে এই অভ্যাসগুলো স্বাস্থ্যবিধির প্রাথমিক শর্ত। করোনা পরবর্তী সময়ে যদি আমরা আমাদের এ ক’দিনের গড়ে তোলা অভ্যাস ভবিষ্যতেও চালু রাখতে পারি, তা হলে আমাদের সুস্থতা অনেকটাই নিশ্চিত করতে পারি আমরা। করোনাকে ঘিরে এই পরিস্থিতি তাই আমাদের নতুন করে শিখিয়ে দিয়েছে, আগামীতে আমাদের ভাল ও সুস্থ থাকার নিশ্চয়তা, সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকার গান।

সবাই তো সুখী হতে চায়...

এই লকডাউনে ঘরে বন্দি হয়ে আমরা নতুন করে আবিষ্কার করেছি ঘরের অনেক কিছুই। এই সময়ে আমরা অনেকেই খুঁজে পেয়েছি ঘরে থাকা এমন অনেক জিনিস, যা আমরা কিনেছিলাম কিন্তু ব্যবহার করিনি কোনও দিন। সেই জিনিসগুলো আমাদের কাজে লাগেনি আজ পর্যন্ত। এই ঘটনা আমাদের নতুন করে চিনিয়ে দিয়ে গিয়েছে আমাদের মানসিকতার একটি অদ্ভুত দিক। আসলে বহু ক্ষেত্রেই আমাদের ব্যয় আমাদের প্রয়োজনের উপরে নির্ভর করেনি। বরং আমাদের মনের গভীরে থাকা পণ্যরতির কারণেই আমরা ক্রেতা হয়েছি অনেক ক্ষেত্রে। করোনাকে ঘিরে এই অদ্ভুত পরিস্থিতিতে আমরা যদি আজ আত্মসমীক্ষা করতে পারি, তা হলে আগামী সময়ে আমরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ক্রয়ের মানসিকতা তৈরি করতে পারব। আমরা সকলেই জীবনে ভাল থাকতে চাই, সুখী হতে চাই। ভাল থাকা এবং সুখে থাকা আমাদের মনের উপরে নির্ভর করে। পণ্যরতিতে ডুবে না গিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী আমরা যদি আমাদের খরচকে সীমিত করতে পারি, তা হলে তা আমাদের মিতব্যয়ী করবে এবং ভবিষ্যতে সঙ্কট মুহূর্তের জন্য সঞ্চয়কে আরও সমৃদ্ধ করবে। এই দুঃসময়ে এটাও কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ কোনও শিক্ষা নয়।

আরও পড়ুন: গুমোট ঘরবন্দির মধ্যে হালকা হাওয়ার ঝলক, কিন্তু সংশয় রইল কিছু

আমি গাই ঘরে ফেরার গান...

আমরা সকলেই এক অদ্ভুত সময়ের ফসল। এই সময় এক দিকে দেখেছে মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার এক বিরাট বিপ্লব, আর অন্য দিকে দেখেছে ক্রমশ একা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে আমরা ক্রমশ একক পরিবারে এসে দাঁড়িয়েছি। এক ক্লিকেই আমরা আজ পৌঁছে যেতে পারছি অন্যের দরজায়। কিন্তু আমরা ভুলে যেতে বসেছি প্রিয় মানুষের মুখোমুখি বসে সময় কাটানোর মুহূর্ত। প্রতিষ্ঠা এবং উন্নতির ইঁদুরদৌড় আমাদের ক্রমাগত দূরে সরিয়ে দিয়েছে আমাদের পরিবার থেকেই। এই লকডাউনের আগে শেষ কবে পরিবারের সঙ্গে এত দীর্ঘ নির্ভেজাল, আন্তরিক সময় কাটিয়েছি তা আমাদের স্মৃতিতেও নেই হয়তো। আমরা খেয়ালই করিনি আমাদের সন্তান কী ভাবে বড় হয়ে উঠছে প্রতি দিন একটু একটু করে। আমরা জানতেও পারিনি আমাদের শিশুটি ঠিক কী ভাবে ঘুমের দেশে এগোয় রোজ। এত দিন আমরা পরিসর পাইনি আমাদের দাম্পত্যের ছোট ছোট মান-অভিমানগুলোকে এতো গভীর ভাবে দেখার, বোঝার। আমরা খেয়াল রাখিনি বৃদ্ধ বাবা-মা ঠিক কখন কখন ওষুধ খান। এই লকডাউন আমাদের কাছে নিয়ে এসেছে সেই সুযোগ, যেখানে পরিবারের ছোটখাটো জিনিসগুলোকে কাছ থেকে দেখার। নিজের জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন সম্পর্কগুলি নিয়েও আয়নার সামনে দাঁড়ানোর সময় এটা। ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নিজেরা অন্তত এই ক’দিন পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে থেকেছি অঙ্গাঙ্গী ভাবে। আমার মনে হয় এই লকডাউন আমাদের পারিবারিক বন্ধনকে নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে আমাদের কাছে। আর এখান থেকে পাওয়া নতুন বোধ, নতুন উপলব্ধি যদি পরবর্তীতে আমাদের আরও একটু বেশি করে পরিবারমুখী করে তোলে তা হলে মানুষ হিসাবে আমাদের উত্তরণ ঘটবে আরও কিছুটা।

নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে...

পিতৃতান্ত্রিক এই সমাজব্যবস্থায় এখনও বহু ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ ঘরে ও বাইরে, এই বাইনারিতে বিভাজিত। ‘আপনি কী কাজ করেন?’— এই সরল প্রশ্নের উত্তরে আমরা বরাবর আমাদের চাকরিক্ষেত্রকে বুঝে এসেছি। যে কাজের বিনিময়ে মাইনে পাওয়া যায়, সেটুকুই সমাজে ‘কাজ’ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ঘরে থাকা স্ত্রী-কে সমাজ কর্মহীন বলেই জেনে এসেছে। পাশাপাশি কাপড় কাচা, বাসন মাজা, রান্না করা এই কাজগুলো সমাজে ‘নারীর কাজ’ বলেই বহু ক্ষেত্রে স্বীকৃত। পুরুষ এই সব কিছু পরিষেবা হাতের কাছে পেয়ে এসেছে এবং কখনও এই পরিষেবার আড়ালে থাকা খাটনিকে বুঝতে চেষ্টা করেনি। আমি আমার নিজের জীবনে প্রতি দিনই ঘরোয়া কাজে হাত লাগাই। তাই এই সামাজিক স্টিরিওটাইপকে সে ভাবে সম্যক বুঝতে পারিনি হয়তো। কিন্তু এই লকডাউনে হোয়াটস্‌অ্যাপ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার বহু পুরুষ বন্ধর ঘরের কাজে সাহায্য করা নিয়ে হাহাকার দেখে মনে হচ্ছে আরও একটি শিক্ষা দিয়ে গেল এই লকডাউন। এত দিনের ঘরের কাজ এবং তার খাটনি বহু পুরুষের কাছে অদৃশ্য থেকে স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়েছে। যে পরিষেবাগুলি না চাইতেই হাতের কাছে সে পেয়ে এসেছে, সেই পরিষেবার মূল্য এবং তার সঙ্গে জুড়ে থাকা পরিশ্রম অবশেষে স্বীকৃতি পেল বহু পুরুষের কাছে। বাইরের কাজই শুধু কাজ নয়, ঘরের কাজও যে আসলে কাজ, এই শিক্ষাটুকু আমাদের দিয়ে গেল বর্তমান করোনা পরিস্থিতি।

আরও পড়ুন: করোনাকে হারাতে সংকল্প হোক দৃঢ়, চেষ্টা হোক সামগ্রিক

মানুষ মানুষের জন্য...

আমরা সাধারণ ভাবে এমন অনেক কিছুই পাই, যা আসলে প্রাপ্তি, তা অনুভব করি না। আমরা ভাবি এটাই স্বাভাবিক এবং সাধারণ ঘটনা। ব্যক্তি স্বাধীনতা, নিজের ইচ্ছে মতো স্বাধীন চলাফেরা, কাঙ্ক্ষিত বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা এই সবই আমাদের রোজকার জীবনে খুব স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে ছিল এত দিন। আমরা নিশ্চিত থেকেছি যে, এগুলি আমাদের জীবনে চির কালই থাকবে। এই লকডাউন সময়কাল আমাদের থেকে কেড়ে নিয়েছে এই সকল সাধারণ ঘটনাগুলি। আমরা বন্দি হয়েছি আমাদের ঘরে। আমার মনে হয়, এই গৃহবন্দি সময় আমাদের সেই সব মানুষদের অভিজ্ঞতাকে চেনাতে পেরেছে, যাঁরা সামাজিক-রাজনৈতিক কারণে স্বাভাবিক ও সাধারণ (অন্তত আমাদের কাছে যেটা স্বাভাবিক) ঘটনাগুলো থেকে দিনের পর দিন বঞ্চিত হয়েছে। তাঁদের কথা আমরা খবরের কাগজে পড়েছি, টিভিতে দেখেছি। কিন্তু কখনও তাঁদের মতো করে তাঁদেরকে বোঝার চেষ্টা করিনি আমরা। সেই অবকাশটুকুও পাইনি। এই লকডাউনে বাধ্যতামূলক ঘরে বন্দি হওয়া দিনগুলি আমাদের সেই মানুষগুলোর অভিজ্ঞতার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। একটু সহানুভূতি মানুষ অন্য মানুষের থেকে পাচ্ছে আজ। এটাও কিন্তু কম বড় পাওনা নয় মানবজাতির কাছে।

নব আনন্দে জাগো...

বর্তমান এই করোনা পরিস্থিতি, এই সঙ্কটকাল এক জন মানুষ হিসেবে আমাদের যেমন নতুন কিছু বোধের সুযোগ করে দিয়েছে, পাশাপাশি পেশাগত ক্ষেত্রেও আমরা কিছু শিক্ষা পেয়েছি। একটি বিজ্ঞাপন সংস্থার কর্ণধার হিসেবে এই অদ্ভুত সময় আমাকেও কিছু নতুন উপলব্ধি দিয়েছে। এই সময়ে আমরা বাধ্য হয়েছি, ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ মডেল অনুসরণ করতে। এর আগে এই মডেল হয়তো এ ভাবে কখনও অনুসরণ করতে বাধ্য হইনি আমরা। কিন্তু এই মডেলে সফল ভাবে কাজ সম্পাদন করার মধ্যে দিয়ে আমরা একটা আত্মবিশ্বাস পেয়েছি যে, কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ সময়েও আমরা এই মডেলে কাজ করতে পারি। এই বিশ্বাসটা এর আগে আমাদের কাছে অলীক বলেই মনে হয়েছে। কিন্তু আজ আমি বিশ্বাস করি যে, এর মাধ্যমে আমাদের অফিস পরিসর ছোট করেও কাজ করতে পারি। বর্তমান পরিস্থিতির ফলে আমরা নতুন নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তিকে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছি এবং পরবর্তীতে এমন যে কোনও সঙ্কটে সুষ্ঠু ভাবে কাজ করার পরীক্ষামূলক সাফল্যও অর্জন করেছি। দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, জুনিয়র স্তরে অনেক মহিলা কর্মী এই ক্ষেত্রে কাজ করলেও পরবর্তীতে তাঁরা আর তা চালিয়ে নিয়ে যেতে পারেন না। পিতৃতান্ত্রিক এই সমাজে আজও বহু ক্ষেত্রে বিবাহ-পরবর্তী নারীর অবস্থান ঘরের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়ে। এর ফলে বহু সম্ভাবনাময় মহিলা কর্মীরা বাধ্য হন কাজ ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে থেকে যেতে। কিন্তু ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ মডেল অনুসরণ করলে সেই মহিলা কর্মীদের আর কাজ হারাতে হবে না। আমাদের সংস্থাও তাতে লাভবান হবে এবং একই সঙ্গে আমি মনে করি নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও সদর্থক পদক্ষেপ করতে পারব আমরা। করোনা দুঃসময়ে এই নতুন পাওয়া শিক্ষাও আসলে ইতিবাচক ঘটনাই বটে।

আমরা করব জয় নিশ্চয়...

ক্রমশ বেড়ে চলা আক্রান্তের সংখ্যা, চার দিকে মৃত্যু মিছিল, মুখ থুবড়ে পড়া অর্থনীতি— এই সব কিছু মিলিয়ে আমরা এক ভয়ঙ্কর সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। প্রতিনিয়ত আমাদের গ্রাস করছে অনিশ্চয়তা এবং হেরে যাওয়ার আশঙ্কা। কিন্তু বিশ্বাস করি, এই ভয়াবহ সময় কাটিয়ে দ্রুত ফের চেনা ছন্দে ফিরবে পৃথিবী। কিন্তু তখন কি আমরা শুধুই হতাশা এবং বিষণ্ণতাকে আঁকড়ে ফের সেই আগের আমরা হয়েই পথে নামব? তা হলে কিন্তু তখনও আমরা হেরে যাওয়া মানুষ হয়েই থাকব। বরং এই ভয়াবহ দুঃসময়কে আমরা নতুন ভাবে বাঁচতে শেখার সময় হিসাবে ভাবি। আমরা বরং ভাবি, এই সঙ্কটকাল আমাদের সামনে আয়না ধরেছে এবং সেই আয়নায় আত্মসমীক্ষার সুযোগ পেয়েছি আমরা। এই সময়কে ঘিরে আমাদের পাওয়া বোধ এবং উপলব্ধিকে আমরা যদি আমাদের পরবর্তী জীবনে কাজে লাগাতে পারি, তা হলে মানুষ হিসাবেই উত্তরণ ঘটবে আমাদের। এই সময় তাই হেরে যাওয়ার সময় নয়, বরং আমাদের আগামী বহু লড়াই জিতে যাওয়ার প্রয়োজনীয় উপায় খুঁজে নেওয়ার সময়। সময় আজ আমাদের কাছে শিক্ষক হিসেবে হাজির হয়েছে, আর আমরা যদি তার থেকে শিখে নিতে পারি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার কৌশল, তা হলে এই সময় পেরিয়ে গেলে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াব জয়ী মানুষ হিসাবে।

(লেখক একটি বিজ্ঞাপন সংস্থার কর্ণধার)

(ছবি: পিটিআই, এপি, এএফপি)

(অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার সাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিয়ো আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন, feedback@abpdigital.in ঠিকানায়। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।)

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.