Advertisement
E-Paper

শিক্ষকের সন্তান, রাজস্থানের ঝুনঝুনু থেকে গোয়েন্‌কার দলে, ধোনির ‘শিষ্য’ মুকুলের ব্যাটে ইডেনে হারল কলকাতা

২ কোটি ৬০ লক্ষ টাকায় মুকুলকে কিনেছিল লখনউ। সঞ্জীব গোয়েন্‌কা যে অর্থের অপচয় করেননি, তা দেখিয়ে দিলেন মুকুল। ধোনিকে আদর্শ মনে করেন মুকুল। প্রথম ছক্কা তিনি মারলেন হেলিকপ্টার শটেই।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২৬ ০০:২১
cricket

দলকে জিতিয়ে হাতজোড় করে প্রার্থনা মুকুল চৌধরির। ছবি: এক্স।

ক্রিকেট-ভক্ত দলীপ কুমার চৌধরি চাইতেন ছেলে মুকুল ক্রিকেটার হোক। কিন্তু রাজস্থানের ঝুনঝুনুর মতো জায়গা থেকে ক্রিকেটার হওয়ার লড়াই সহজ ছিল না। হাল ছাড়েননি পেশায় শিক্ষক দলীপ। লড়ে গিয়েছেন। সেই মুকুলই হয়ে উঠলেন আইপিএলের নতুন তারকা। ইডেনে তাঁর বিধ্বংসী ইনিংসে জেতা ম্যাচ হারল কলকাতা নাইট রাইডার্স। লখনউ সুপার জায়ান্টসকে জিতিয়ে মুকুল বুঝিয়ে দিলেন, বাবার স্বপ্ন ব্যর্থ হতে দেবেন না তিনি।

ইডেনে ম্যাচের আগে ছক্কা মারার প্রতিযোগিতা চলছিল। সেই সময় সবচেয়ে বড় ছক্কা মেরেছিলেন মুকুল। কিন্তু ম্যাচে একটা বড় সময় প্যাড পরে বসেছিলেন তিনি। ভাবছিলেন, তাঁকে হয়তো নামতে হবে না। কিন্তু নামতে হল। তত ক্ষণে এডেন মার্করাম, মিচেল মার্শ, ঋষভ পন্থ, নিকোলাস পুরান, আয়ুষ বাদেনিরা ফিরে গিয়েছেন। হার নিশ্চিত জেনে বসে রয়েছেন লখনউয়ের ক্রিকেটারেরা। ঠিক সেই সময়ই আবির্ভাব হল মুকুলের।

প্রথম আট বলে মাত্র ২ রান করেছিলেন তিনি। সেই ব্যাটারই পরের ২৫ বলে করলেন ৫২ রান। মারলেন দু’টি চার ও সাতটি বিশাল ছক্কা। অপর প্রান্তে আবেশ খান থাকায় সিঙ্গল নিতে পারছিলেন না। তিনি জানতেন, বড় শট ছাড়া উপায় নেই। নিজের উপর ভরসা রাখলেন। শেষ বলে বৈভব অরোরার বাউন্সার মিস্‌ করলেও সিঙ্গল নিয়ে দলকে জিতিয়ে দেন মুকুল। তার পরেই আকাশের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করেন। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানান এই মঞ্চ দেওয়ার জন্য। যে মঞ্চে আবির্ভাব হল আরও এক তারকার।

Advertisement
cricket

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

মুকুলকে সিকারের একটি ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করেছিলেন দলীপ। খেলার খরচ চালাতে শিক্ষকতা ছেড়ে হোটেলের ব্যবসায় ঢোকেন দলীপ। নিজের যতই পরিশ্রম হোক, সন্তানের খেলায় যাতে খামতি না থাকে, সেই লক্ষ্য ছিল তাঁর। শুরুতে মিডিয়াম পেস করতেন মুকুল। কিন্তু এক দিন অ্যাকাডেমিতে উইকেটরক্ষক না থাকায় দস্তানা তুলে নেন। সেখান থেকেই উইকেটরক্ষক হয়ে ওঠেন তিনি। সিকার থেকে জয়পুরে আরাবল্লী ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হন তিনি। কার্তিক শর্মা, অশোক শর্মার মতো আইপিএলের তরুণ ক্রিকেটারেরাও সেই অ্যাকাডেমি থেকেই এসেছেন।

নিলামে ২ কোটি ৬০ লক্ষ টাকায় মুকুলকে কিনেছিল লখনউ সুপার জায়ান্টস। তার আগেই ঘরোয়া ক্রিকেটে জাত চিনিয়েছিলেন তিনি। রাজস্থানের অনূর্ধ্ব-২৩ স্তরে এক প্রতিযোগিতায় ১০২.৮৩ গড়ে ৬১৭ রান করেছিলেন তিনি। সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে পাঁচ ম্যাচে ১৯৮.৮৫ স্ট্রাইক রেটে ১৭৩ রান করেছিলেন। সঞ্জীব গোয়েন্‌কা যে অর্থের অপচয় করেননি, তা দেখিয়ে দিলেন মুকুল। মহেন্দ্র সিংহ ধোনিকে নিজের আদর্শ মনে করেন মুকুল। ইডেনে প্রথম ছক্কা তিনি মারলেন হেলিকপ্টার শটেই।

খেলা শেষে মাঠে নেমে মুকুলকে জড়িয়ে ধরলেন গোয়েন্‌কা। হারা ম্যাচ জিতিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানালেন ২১ বছরের ক্রিকেটারকে। সেখানে তখন ছিলেন ঋষভ পন্থও। দলের মালিক ও অধিনায়কের মুখের হাসি বুঝিয়ে দিচ্ছিল, মুকুল অন্তত এই মরসুমে আর একটি ম্যাচেও দলের বাইরে থাকবেন না।

cricket

মালিক সঞ্জীব গোয়েন্‌কা ও অধিনায়ক ঋষভ পন্থের সঙ্গে মুকুল চৌধরি। ছবি: এক্স।

খেলা শেষে ম্যাচের পুরস্কার নিতে গিয়ে বাবার কথাই বললেন মুকুল। জানিয়ে দিলেন, বাবার স্বপ্ন সত্যি করতে পেরে খুশি তিনি। মুকুল বলেন, “বিয়ের আগে থেকেই বাবার স্বপ্ন ছিল, ছেলে হলে ক্রিকেটার হবে। তাই আমাকে ছোট থেকেই অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করে দিয়েছিল। আমাদের আর্থিক অবস্থা ভাল না হলেও বাবা পরিশ্রম ছাড়েনি। বাবার স্বপ্নই সত্যি করছি।”

রাজস্থানের অ্যাকাডেমিতে খেলার পর দিল্লি, গুরুগ্রামে গিয়েও খেলেছেন মুকুল। অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। অনূর্ধ্ব-১৯ স্তরে উত্তরপ্রদেশের বিরুদ্ধে একাই একটি ম্যাচ জেতান তিনি। তখনই তাঁর বাবা তাঁকে বলেছিলেন, বড় ক্রিকেটার হওয়ার প্রতিভা তাঁর আছে। মুকুল বলেন, “ঈশ্বর আমাকে সুযোগ দিয়েছেন। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছি। চাপের মধ্যে খেলতে ভাল লাগে। আমার লক্ষ্যই ছিল শেষ পর্যন্ত খেলা। জানতাম, শেষ পর্যন্ত খেললে জিতিয়ে দেব।”

প্রথম দুই ম্যাচে ছক্কা মারতে পারেননি তিনি। তাই এই ম্যাচে ধোনির হেলিকপ্টার শটের কায়দায় প্রথম ছক্কা মেরে আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে নিয়েছিলেন তিনি। তার পর আর থামেননি। সামনের পায়ে, পিছনের পায়ে মাঠের চার দিকে একের পর এক ছক্কা মেরেছেন। ছোট থেকেই হাওয়ায় শট মারতে ভালবাসেন। সেই শটেই দলকে জিতিয়েছেন।

মুকুলের দলের অধিনায়ক ঋষভ পন্থও রুরকির ছেলে। সেখান থেকেও খুব বেশি ক্রিকেটার আসে না। তাই মুকুলকে নিয়ে কৌতূহল ছিল পন্থের। সেই কৌতূহল এই ইনিংসের পর মিটে গিয়েছে। খেলা শেষে পন্থ বলেন, “ওকে নেটে দেখেছি। কিন্তু মাঠে নেমে কী করতে পারে, সেটা দেখার ছিল। আমার বলার ভাষা নেই। ওর উপর বিশ্বাস ছিল। সেই বিশ্বাসের দাম ও দিয়েছে।”

মুকুলের সাহসের প্রশংসা করেছেন কেকেআরের অধিনায়ক অজিঙ্ক রাহানেও। তিনি বলেন, “ও একাই আমাদের হারিয়ে দিল। যে ভাবে ও শট খেলেছে, তার জন্য সাহস লাগে। ১৮তম ওভার পর্যন্তও আমরা জয়ের কাছে ছিলাম। মুকুল আমাদের হারিয়ে দিল।”

ইডেনে টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে দ্বিতীয় ওভারেই ফিন অ্যালেনের উইকেট হারায় কেকেআর। প্রিন্স যাদবের বলে বড় শট মারতে গিয়ে ৯ রানের মাথায় আউট হন তিনি। তবে তাঁর আউট ঘিরে বিতর্ক হয়েছে। যে সময় দিগ্বেশ রাঠী তাঁর ক্যাচ ধরেন, তখন তাঁর পা বাউন্ডারি ছুঁয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তৃতীয় আম্পায়ার খুব তাড়াতাড়ি আউটের সিদ্ধান্ত দেন। তবে খালি চোখে ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না। এই পরিস্থিতিতে আর একটু সময় নিতে পারতেন তিনি। অ্যালেন আউট হওয়ার পর রাহানে ও রঘুবংশী জুটি বাঁধেন। তাঁরা হাত খোলা শুরু করেন। পাওয়ার প্লে কাজে লাগিয়ে রান করতে থাকেন। আগের ম্যাচের পর এই ম্যাচেও ভাল বল করলেন শামি। তাঁর প্রথম দু’ওভারে মাত্র ১২ রান হয়। ফলে বাকিদের নিশানা করতে হয় কেকেআরের দুই ব্যাটারকে। অর্ধশতরানের জুটি হয় তাঁদের। একটা সময় দলের রান রেট প্রতি ওভারে ১০ করে চলছিল।

কেকেআরের জুটি ভাঙেন রাঠী। তাঁর বলে জোরে শট মারেন রাহানে। কিন্তু বল সরাসরি শামির কাছে যায়। সামনের দিকে ঝুঁকে ভাল ক্যাচ ধরেন রাহানে। ২৪ বলে ৪১ রান করে ফেরেন রাহানে। চার নম্বরে নেমে কেকেআরের ২৫ কোটির ক্রিকেটার ক্যামেরন গ্রিন হাত খুলতে পারছিলেন না। ফলে রান তোলার গতি কমে যায়। বাধ্য হয়ে সিদ্ধার্থের বলে ছক্কা মারতে গিয়ে আউট হন রঘুবংশী। ৩৩ বলে ৪৫ রান করেন তিনি। রাহানে ও রঘুবংশী আউট হওয়ার পর কেকেআরের রান তোলার গতি কমে যায়। রান পাননি রিঙ্কু সিংহ। ৪ রান করে আবেশ খানের বলে বোল্ড হন তিনি। গ্রিন ও রভম্যান পাওয়েল দু’জনেই রান করতে সমস্যায় পড়ছিলেন। এক সময় পাঁচ ওভারে মাত্র ১৫ রান হয়। একটিও চার-ছক্কা হয়নি। দেখে মনে হচ্ছিল, ১৫০ রানও হবে না। টেস্ট ম্যাচ খেলছিলেন দুই ব্যাটার। তাঁদের বিদ্রুপ করছিলেন ইডেনের দর্শকেরা।

cricket

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

শেষ দিকে কিছুটা হাত খোলেন দুই ব্যাটার। বিশেষ করে পাওয়েল কয়েকটি বড় শট মারেন। তখনও গ্রিনের বড় শট মারতে সমস্যা হচ্ছিল। অবশেষে শামির বলে একটি ছক্কা মারেন গ্রিন। তাঁকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল, হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন। এই দুই ব্যাটারের ব্যাটে ২০ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ১৮১ রান করে কেকেআর। গ্রিন ২৪ বলে ৩২ ও পাওয়েল ২৪ বলে ৩৯ রান করেন। অন্তত ৩০ রান কম হয় কেকেআরের।

১৮২ রান তাড়া করতে নেমে প্রথম দুই ওভারে ১৩ রান হলেও তৃতীয় ওভারে হাত খোলেন লখনউয়ের দুই ওপেনার এডেন মার্করাম ও মিচেল মার্শ। নবদীপ সাইনিকে নিশানা করেন তাঁরা। নবদীপের এক ওভারে ১৮ রান নেন তাঁরা। পঞ্চম ওভারে লখনউকে জোড়া ধাক্কা দেন বৈভব অরোরা। তিন বলের মধ্যে দুই ওপেনারকে আউট করেন তিনি। মার্করাম ২২ ও মার্শ ১৫ রান করেন। জোড়া ধাক্কার পর জুটি বাঁধেন পন্থ ও আয়ুষ বাদোনি। পন্থ ধীরে খেললেও বাদোনি হাত খুলছিলেন। বুদ্ধি করে খেলছিলেন তিনি। লখনউয়ের রান তোলার গতি খুব একটা কমেনি। ফলে উইকেট নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না কেকেআরের।

ঠিক সেই কাজটাই করলেন গ্রিন। আইপিএলে এর আগে বল করেননি তিনি। তাঁর বল না করা নিয়ে অনেক বিতর্কও হয়েছে। অবশেষে তাঁকে বল করার অনুমতি দিয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। আর বল করতে এসে দ্বিতীয় বলেই পন্থকে আউট করলেন গ্রিন। তাঁর বাউন্সার সামলাতে না পেরে ১০ রান করে আউট হলেন লখনউয়ের অধিনায়ক। শেষ ১০ ওভারে জিততে লখনউয়ের দরকার ছিল ৯৭ রান। কেকেআরের পেসারেরা বলের গতির হেরফের করছিলেন। ফলে বড় শট খেলা কঠিন হচ্ছিল। প্রয়োজনীয় রান রেট বাড়ছিল। কার্তিক ত্যাগীর মন্থর বাউন্সার বুঝতে না পেরে ১৩ রান করে আউট হন পুরান। এই বছর তাঁকে ফিনিশারের ভূমিকায় খেলাচ্ছে লখনউ। নতুন ভূমিকায় এখন সফল হতে পারেননি তিনি।

লখনউকে জেতানোর দায়িত্ব ছিল বাদোনি ও আব্দুল সামাদের উপর। আর কোনও বিদেশি বাকি ছিলেন না। ফলে খেলার রাশ কেকেআরের হাতে ছিল। লখনউয়ের উপর আরও চাপ বাড়ান অনুকূল রায়। তিনি বল করতে এসে ২ রানের মাথায় আউট করেন সামাদকে। ১০৪ রানে লখনউয়ের ৫ উইকেট পড়ে যায়। তবে বাদোনি যত ক্ষণ ছিলেন, তত ক্ষণ স্বস্তি পাচ্ছিল না কেকেআর। উইকেট পড়লেও তাঁর শট থামেনি। বুদ্ধি করে ফিল্ডিংয়ের ফাঁক খুঁজে চার মারছিলেন তিনি। ঝুঁকি নিচ্ছিলেন না। জিততে হলে বাদোনির উইকেট দরকার ছিল কেকেআরের। নবদীপের এক ওভারে ১৫ রান নেন তিনি। অনুকূলের বলে ছক্কা মেরে ৩৩ বলে অর্ধশতরান করেন বাদোনি। লখনউকে ভরসা জোগাচ্ছিলেন এই ডানহাতি ব্যাটার। যদিও পরের বলেই বাদোনিকে ফেরান অনুকূল। ৫৪ রান করেন বাদোনি।

শেষ পাঁচ ওভারে ৫৫ রান দরকার ছিল লখনউয়ের। হাতে ছিল ৪ উইকেট। ঠিক তখনই চমক দিলেন মুকুল। নিজের উপর ভরসা রাখলেন। গোটা ইডেন দেখল তাঁর গায়ের জোর। অবলীলায় ছক্কা মারার ক্ষমতা। যে আইপিএলে জসপ্রীত বুমরাহ, হার্দিক পাণ্ড্যের মতো তারকার জন্ম হয়েছে, সেই আইপিএলের হাত ধরেই এল আর এক নতুন প্রতিভা। মুকুল চৌধরি।

KKR LSG
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy