ফোন করলে ফোনটা বেজে বেজে থেমে যায়। দিনের বেশির ভাগ সময়েই এটাই হয়। ইদানীং পারতপক্ষে ফোন করি না। ছেলে বারণ করেছে ফোন করতে। তবু মন মানে না। তাই ছেলে বলেছে, মেসেজ করে রাখতে। ফাঁকা সময়ে ফোন করে নেবে। তা-ও বা কত ক্ষণ? মিনিটখানেক। সব সময়তেই তো ব্যস্ত।

ছেলে সব সময় বলে চিন্তা না করতে। কিন্তু চার দিকে যা চলছে তাতে, সব সময়েই একটা অজানা আশঙ্কা নিয়ে থাকি। কখন কী হয়!

মেডিক্যালে সুযোগ পাওয়ার পর, খানিকটা জেদ করেই বাড়ির কাছে মালদহ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করেছিলাম ছেলেকে। আসলে হস্টেলটা এড়াতে চেয়েছিলাম। দুটো কারণ ছিল। এক, ছেলে দূরে থাকলে চিন্তা বাড়বে। সেই সঙ্গে হস্টেল সম্পর্কে কিছু খারাপ ধারণা ছিল। তাই বাড়ি থেকে হাঁটা পথে মিনিট দশেকের দূরত্বে মালদহ মেডিক্যাল কলেজেই ভর্তি করি ছেলেকে।

তখনও জুনিয়র চিকিৎসকদের কর্মবিরতি চলছে। —ফাইল চিত্র।

আরও পড়ুন: ফের কাজে ডাক্তারেরা, সঙ্কট কাটিয়ে সকাল থেকেই স্বাভাবিক হল আউটডোর​

কিন্তু তাতেও চিন্তা দূর হয়েছে এমনটা নয়। ভালয় ভালয় সাড়ে চার বছরে কোর্স শেষ করে ওখানেই গত বছর ইন্টার্ন হিসাবে যোগ দেয় ছেলে। ছাত্র অবস্থায় যতটা আশঙ্কা ছিল মনের মধ্যে তা কয়েক গুণ বেড়ে যায় ওই সময়।

প্রতি দিনই খবরের কাগজ বা টিভিতে দেখি ডাক্তারের উপর হামলার ঘটনা। আমাদের এখানেই হরিরামপুরে একটি প্রাইমারি হেল্থ সেন্টারে এক চিকিৎসক হামলার জেরে টেবিলের নীচে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানেই তাঁর উপর চলছে এলোপাথাড়ি লাথি-ঘুসি। সেই ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছিল গোটা জেলা জুড়ে। আমিও দেখেছি। এগুলো দেখেশুনে চিন্তা বেড়ে যায়। হাসপাতালে কখন কী হয় সেই আশঙ্কা নিয়ে থাকি দিনভর। এখন ছেলে ওখানেই হাউস স্টাফ। সব সময়েই মনে হয় কখন মারধর খায়! ওদের হাসপাতালেও তো মাঝে মাঝেই ছোটখাটো গন্ডগোল হয়। হয়তো ওর সঙ্গেও হয়ে থাকবে। আমরা চিন্তা করব তাই বলে না। আমাদের ভয়টা আরও বাড়ে।

আরও পডু়ন: কাজ শুরু, শেষ নেই রোগীর ভোগান্তির

অথচ বিশ্বাস করুন, সাত দিন ধরে যে আমার ছেলে এবং সব জুনিয়র ডাক্তাররা সবাই মিলে ধর্মঘট করল, সেটা কিন্তু আমি এক তরফা ভাবে সমর্থন করতে পারিনি। এই নিয়ে আমার ছেলের সঙ্গে তর্কও হয়েছে। ডাক্তারের কাছে রোগী আগে না আন্দোলন আগে— তা নিয়ে আমার নিজেরই সংশয় আছে।

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ।

আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর ডাকা সর্বদল বৈঠকেও যাচ্ছেন না মমতা, জানিয়ে দিলেন চিঠি পাঠিয়ে​

কিন্তু সেই সঙ্গে আবার এটাও ভাবি, ডাক্তার হয়ে ওরা জীবনে কী পাচ্ছে? সবাই ভাবে, ডাক্তারি পাশ করতে পারলেই কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। টাকা প্রসঙ্গে পরে আসি। তার আগে বলি ওদের জীবনটা। ইন্টার্ন যখন ছিল, তখন ওদের রোজ ডিউটি থাকত। সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত সাড়ে সাতটায়। এক এক দিন এক এক ডিউটি। যেমন কোনও দিন সকালে বেরিয়ে ওয়ার্ডে রাউন্ড দেওয়া। তার পর ১০টা থেকে আউটডোর। মিটতে মিটতে বেলা সাড়ে তিনটে। চারটের সময় বাড়ি এল। খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়েই ফের হাসপাতালে। চাপ কম থাকলে ফিরতে সাড়ে ন’টা। কিন্তু বেশির ভাগ দিনই চাপ থাকে। পাশাপাশি অনেক সময়েই অন্য ছুটিতে যাওয়া অন্য ইন্টার্নদের ডিউটিও করে দিতে হয়। রাত গভীরে বাড়ি ফিরে খাওয়া দাওয়া সেরে আবার শুরু হয় পোস্ট গ্রাজুয়েটের এন্ট্রান্সের পড়াশোনা।

অনেক সময় ছেলেকে দেখে কষ্টই লাগে। সেই মেডিক্যালের এন্ট্রান্সের সময় থেকে শুরু হয়েছিল দিন রাত জেগে পড়া। তার পর সাড়ে চার বছরে ন’খানা সেমিস্টারের পরীক্ষা সঙ্গে চারটে বাৎসরিক পরীক্ষা। ওকে দেখে মনে হত, ২৪ ঘণ্টাও বড্ড কম। ছুটি নেই, বন্ধু নেই, আড্ডা নেই— এক অদ্ভুত জীবন। এখনও তাই। ছেলের কথায়, খালি এমবিবিএসের কোনও দাম নেই বাজারে। এমডি না করলে কেউ পাত্তাই দেবে না। হাউসস্টাফের ডিউটি করে বাকি সময়টা বাড়িতে ল্যাপটপের সামনে কানে হেডফোন গুঁজে অনলাইন কোচিং নিচ্ছে। কোনও বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা নেই। কেউ বাড়িতে আসতে চাইলে না বলে দেয়। একটা চরম অসামাজিক জীবন। অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিক জীবন।

অথচ ছেলের অন্য বন্ধুদের দেখুন। যারা ইঞ্জিনিয়ারিং করেছে বা ওকালতি করেছে। তারা তো আমার ছেলের তুলনায় অনেক জায়গাতেই ভাল আছে। দিনরাত গালি খাওয়া বা মার খাওয়ার ভয় নেই। নিজেদের মতো করে বাঁচার সময় আছে। পরিবারকে সময় দিচ্ছে। আর টাকা পয়সার কথা ছেড়েই দিলাম। সেটাও আমার ছেলের তুলনায় অনেক বেশি পায়।

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ।

আরও পড়ুন: রাতের কলকাতায় একদল যুবকের হাতে প্রাক্তন ‘মিস ইন্ডিয়া’র হেনস্থা​

এ সব দেখে মাঝে মাঝেই আমার ছেলে প্রচণ্ড হতাশায় ভোগে। ছেলে ইন্টার্নশিপ শুরু করার পর ওদের বৃত্তির টাকার পরিমাণ কিছুটা বেড়ে হল সাড়ে ২৩ হাজার টাকা। এখন হাউস স্টাফ হিসাবে পায় ৩৮ হাজার টাকা। ওর এক স্কুলের বন্ধু ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছে। ও উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার মাঝেই একটা চাকরি করছে। বছরে ১৩ লাখ টাকার প্যাকেজ। মেধার কথা যদি ধরেন, তা হলে তো ওই ছেলেটির থেকে আমার ছেলের মেধা, কাজের গুরুত্ব, ঝুঁকি কম নয়— বরং বেশি। এক জন সাধারণ গ্রাজুয়েটও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেলে ওদের থেকে বেশি টাকা বেতন পায়। ওদের ঠিকঠাক থিতু হতে তিরিশ পেরিয়ে যায়। অন্য পেশায় সেই বয়সে অনেকটা ধাপ এগিয়ে যাওয়া যায়।

কিন্তু তার পরেও আমি ছেলেকে হতাশা থেকে বের করার চেষ্টা করি। কয়েক দিন আগেই একটা ঘটনা ঘটেছে। ছেলে এক দিন হাসপাতাল থেকে কয়েকটা আম এবং আমসত্ত্ব নিয়ে এল। এসে বলল, এক জন রোগীর বাড়ির লোক দিয়ে গিয়েছেন। ছেলে প্রথমে তাঁদের চিনতে পারেনি। কিন্তু পরে ওঁরাই বলেন যে, কোনও এক জন রোগীর ছেলের কাছে কোনও ভাবে উপকৃত হয়েছিল। আমি ওই ঘটনাটাই ছেলেকে বলি— তোর অন্য বন্ধুরা অনেকেই তোর থেকে বেশি হয়তো টাকা পাচ্ছে, কিন্তু তাদের কেউ এ রকম আন্তরিক উপহার পায় না। এখানেই এক জন ডাক্তারবাবুর জীবনের সবচেয়ে বড় পাওনা।

(বিদ্যুৎ কুমার পাল মালদহের বাসিন্দা, অবসর প্রাপ্ত ব্যাঙ্ককর্মী। তাঁর ছেলে অরুণাংশু পাল মালদহ মেডিক্যাল কলেজের হাউসস্টাফ।)

অনুলিখন: সিজার মণ্ডল