‘‘A great teacher is like a candle— it consumes itself to light the way for others.’’

আমাদের শিক্ষানবিশী চলতেই থাকে। জীবনভর। আমরা প্রতিদিন শিখি। যাপন ও জীবনের রোজনামচা আমাদের প্রায় প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় কত কিছু যে শিখতে বা শিখে নিতে বাধ্য করে। আমরা ঠেকে শিখি। ঠকে শিখি। ভুল করি বিস্তর। আবারও ঠিক করে ফেলি। পরবর্তী অভিজ্ঞতালব্ধ জীবনে ছাত্রাবস্থায় শেখা অনেক ভাল জিনিস কাজে লাগে। অনেক কিছু কিন্তু আবার লাগেও না। আমাদের ছাত্রাবস্থায় সেই শেখাটা কিন্তু ঠিক ছিল—কিন্তু নানা প্রতিকুলতা ও চাপের কাছে হয়তো সে আদর্শের কাছে নতিস্বীকার করতে হয়েছে। দেওয়ালে কখনও পিঠ ঠেকে গেলে এও মনে হয়েছে, ধ্যুস জীবনে কিছুই শেখা হল না আজও।
আগামী ৫ সেপ্টেম্বর, শনিবার ‘শিক্ষক দিবস’। শিক্ষকদিবস নিয়ে আগামী প্রতিবেদনের মকসো করতে করতে ভাবি, সে ভাবে বলতে গেলে নার্সারি বা স্কুলে ভর্তি জীবনের আগে পর্যন্ত তো আমরা বাড়িতেই অ আ ক খ বা ইংরাজি বর্ণমালা, ১ থেকে ১০০, ছড়া, রং চেনা, পশুপাখিদের ছবি দেখে চিনতে শেখা, রামায়ণের গল্প আরও কত কি বাড়িতেই শিখে যাই বাবা মায়ের কাছ থেকেই। হামাগুড়ি বয়স থেকেই হাঁটতে শেখা, কথা বলতে শেখা সবই তাদের কাছেই। এক্কেবারে কচি বয়স থেকে আমাদের শিক্ষার হাতেখড়ি তাদের হাত ধরেই। আমাদের বাবা ও মা-ই আমাদের প্রথম ও পরম গুরু। জীবনযাপনের অন্যতম শিক্ষক।
পরবর্তীতেও প্রিয় শিক্ষক তাঁরাই। তাঁদের স্নেহে, প্রশ্রয়ে, শিক্ষায়, সহমর্মিতায়, মরমী সমালোচনায়, চরিত্র গঠনের দৃঢ় শিক্ষায় আমরা ঋদ্ধ হতে থাকি ক্রমশ। আমাদের প্রতিটি আচরণের বহির্প্রকাশ ঠিক কী হবে, শিশুবয়স থেকেই উচিত-অনুচিতের বোধ আমরা শিখতে থাকি তাদের কাছেই। আমাদের নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ, আমাদের দায়বদ্ধতা বিশ্বাস, অন্যকে মাণ্যতা দেওয়া, গুরুজনকে সম্মান জানানো, নিজেদের পারিবারিক রীতিকে মর্যাদা দেওয়া, রক্ষণশীলতাকে টিকিয়ে রাখা এই সমস্ত কিছুই শিখি বাড়ির গুরুজন অভিভাবকদের থেকেই। আমাদের আদর্শ আমাদের চরিত্রগঠন সব কিছুর প্রাপ্তি তাঁদের থেকেই। শিক্ষকদিবসের প্রাক্কালে বাবা-মা-কেই অন্যতম প্রারম্ভিক শিক্ষক তথা গুরু হিসেবে স্মরণ করে প্রণতি জানাতেই পারি—

 

‘‘গুরু সাক্ষাৎ পরম ব্রহ্ম

তস্মে শ্রী গুরুবে নমঃ’’

 

ফিরে আসি শিক্ষকদিবস প্রসঙ্গে। আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ‘শিক্ষকদিবস’। ডঃ সর্বপল্লিরাধাকৃষ্ণণের জন্মজয়ন্তী। দেশের অগণিত শিক্ষকদের আদর্শগত মহান কর্মকাণ্ডের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে এবং তাঁদের পেশাগত অবদানকে স্মরণে-বরণে শ্রদ্ধায় পালন করার জন্য সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই মহান শিক্ষক পালন করার রীতি রয়েছে। নির্দৃষ্ট দিনটি বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে পালন করা হয়ে থাকে। যেমন বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই ৫ অক্টোবর, ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। UNICEF থেকেও, ৫ অক্টোবর দিনটিই ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবসের’ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বের সর্বমোট ১৯টি দেশে অক্টোবর মাসের ৫ তারিখ ‘টিচার্স ডে’ পালিত হয়। দেশগুলি হল—কানাডা, জার্মানি, বুলগেরিয়া, আর্জেবাইজান, ইস্তোনিয়া, লিথোনিয়া, ম্যাকেডোনিয়া, মলদ্বীপ, নেদারল্যান্ড, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, কুয়েত, কাতার, রাশিয়া, রোমানিয়া, সার্বিয়া, ইংল্যান্ড, মাউরেটিয়াস, মলদোভা। আবার বিশ্বের অন্য ১১টি দেশে ২৮ ফেব্রুয়ারি দিনটিতে বিশ্ব শিক্ষক দিবস চালু। দেশগুলি হল মরক্কো, আলজেরিয়া, টিউনেশিয়া, লিবিয়া, ইজিপ্ট, জর্ডন, সৌদিআরব, ইয়েমেন, বাহরেইন, ইউ এ ই, ওমান। ১৯৯৪ সালের ৫ অক্টোবর থেকে ইউনেস্কো দ্বারা ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ দিনটি সূচিত হয়। এটি সারা দেশ-বিদেশে ‘শিক্ষক’ পেশাজীবীদের জন্য সেরা সম্মান। পরবর্তী প্রজন্মও যাতে কার্যকরী ও যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে এই দিনটি পালন করে সেটাও উদ্দেশ্যা। এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল মনে করে, জাতীয় স্তরে সমগ্র বিশ্বেই একটি বিশেষ দিনকে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি—যেটি সমাজ-সংস্কার-শিক্ষায় শিক্ষকদের উপযুক্ত মাণ্যতা দান করার যোগ্য দিন।

আমাদের দেশে ভারতের ভূতপূর্ব রাষ্ট্রপতি ডঃ সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণণ এর জন্মদিন ৫ সেপ্টেম্বর বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে ‘শিক্ষক দিবস’ হিসাবে পালিত হয়। ‘ভারতরত্ন’ উপাধি বিভূষিত প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ। মহান দার্শনিক, আদর্শবান বিচারক ছিলেন ডঃ রাধাকৃষ্ণণ। শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি এবং দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি। তিনি ছিলেন বাগ্মী, অধ্যাপক, রাজনীতিবিদ এবং অদ্বৈত বেদান্ত বাদ রচয়িতা দার্শনিক।

শোনা যায়, তাঁর কিছু প্রিয় ছাত্র ও অধ্যাপক বন্ধুবান্ধব, তাঁর জন্মদিন পালন করতে আগ্রহান্বিত হলে—রাধাকৃষ্ণণ তাঁদের বলেছিলেন, ‘‘আমার জন্মদিন পৃথক ভাবে পালন না করে আমি গর্বিত হব, দিনটি যদি দেশের সমস্ত শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে পালন করা হয়।’’

পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন, ‘‘He has served his nation in many capacities. but above all he is a great teacher from whom all of us have learnt much and will continue to learn.’’

সমাজে শিক্ষকদের সম্মান ও অবদানের জন্য ১৯৬২ সাল থেকে সেপ্টেম্বর মাসের পঞ্চম দিনটি নির্দৃষ্ট করে, স্কুল-কলেজে নানান অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করা হয়। প্রধানত ছাত্রছাত্রীরা তাদের প্রিয় শিক্ষক-শিক্ষিকাকে উপহার দেয়। শিক্ষকরাও তাদের আশীর্বাদ স্বরূপ মিষ্টিমুখ করান। বস্তুত একজন ছাত্রছাত্রীর জীবনে যোগ্য শিক্ষকের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ শিক্ষকই পারেন তার ছাত্রকে নিশ্চিত রূপে আদর্শগত ভাবে রূপান্তর করতে। একজন যথার্থ শিক্ষকই পারেন তাঁর ছাত্রের মধ্যে যথাযথ মনন বুদ্ধি চিন্তাকে বাস্তব রূপে প্রতিফলিত করতে। এবং আগামী জীবনযাত্রায় প্রতিটি উপযুক্ত জীবিকা ও সৎ নাগরিক তথা মানুষ গড়ার কারিগর তাঁরাই।

ব্যক্তিগত কথন বলি, মেয়েবেলা যে স্কুলে কেটেছে—ইদানীং ফেসবুকের দৌলতে স্কুলের সমকালীন বান্ধবীদের মুখে জেনেছি সে সেখানকার শিক্ষিকাদের মধ্যে অনেকেই এখন আর ইহজগতে নেই। সেই প্রতিটি শিক্ষিকার কথা যখন কখনও কোনও বিশেষ কথাপ্রসঙ্গে মনে পড়ে যায়, গলার কাছে দলা পাকানো কষ্টটা এসে ধাক্কা মারে। কী কঠোর অনুশাসনে স্কুলজীবন কেটেছিল। স্কুলের পরিচালন সমিতি ও প্রধান শিক্ষিকার কড়া নিয়মনীতি মেনে চলতে হত। সব জায়গা। সব স্কুলেই যেমন হয় আর কী। স্কুলের লোহার প্রধান ফটক যেন জেলখানার গারদ আর আমরা স্কুলভর্তি কিশোরী সেই স্কুল নামক জেলখানার ছয় ঘণ্টার কয়েদি। ঘড়ির কাঁটা দশটার ঘরে পৌঁছানোর খানিক আগেই স্কুলের প্রার্থনাকক্ষে পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সমস্ত স্কুল ইউনিফর্ম পড়া ছাত্রীরা ও প্রধানশিক্ষিকা-সহ প্রতিটি সহ-শিক্ষিকার উপস্থিতিতে সমবেত কণ্ঠে প্রার্থনা ও দেশবিদেশের মনীষীদের বাণী পাঠ। আমরা আমাদের শিক্ষিকাদের চোখ রাঙানিতে তটস্থ থাকতাম। ক্লাসে পড়ানোর ধরন এক একজন শিক্ষিকার নিজস্বতা থাকত। আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়া শুনতাম। পড়া বুঝে নিতাম। ক্লাস টেস্ট ও টিউটোরিয়াল ক্লাসগুলিতে তটস্থ থাকতাম শিক্ষিকাদের চোখ রাঙানির কাছে। প্রধানশিক্ষিকা সহ-শিক্ষিকারা প্রত্যেকেই ছিলেন বাড়ির প্রকৃত অভিভাবকের মতো। অত্যন্ত স্নেহশীলা অথচ প্রয়োজনে ভীষণ কঠোর ব্যক্তিত্ব। সরস্বতী পুজোর দিন আমাদের স্কুলছাত্রীদের এক্কেবারে পাত পেতে খিছুড়ি ভোগ পরিবেশন করতেন শিক্ষিকারা। বেশ আনন্দময় পরিমণ্ডল যাকে বলে। আমরাও এলিট স্কুলের সমস্ত রকম নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলতাম। পরীক্ষার খাতায় হাতের লেখা ভাল করা থেকে বাংলা ব্যাকরণ ও ইংরাজি গ্রামারের ভিত গড়ে দেওয়া, ইতিহাস ভুগোল বা জ্যামিতি প্রায় ছবির মতো বুঝিয়ে দেওয়া, অঙ্কের জটিল তত্ত্বগুলিকে ক্লাসের ব্ল্যাক বোর্ডে লিখে ভেঙে ভেঙে বুঝিয়ে দেওয়া। রসায়ন ও পদার্থ বিজ্ঞানকে ভালবাসতে শেখানো। সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ ও আমাদের মধ্যে সাহিত্যের বীজ বুনে দেওয়া—আমাদের স্কুলের শিক্ষিকারাও ছিলেন ছাত্রীদের জন্য নিবেদিত প্রাণ। বিদ্যালয়ে ফি বছর পাঁচ ছয়বার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। এ ছাড়া প্রজাতন্ত্র দিবস ও স্বাধীনতা দিবসের নানান কুচকাওয়াজের অনুষ্ঠান প্যারেড এ সব তো হতই শিক্ষিকাদের উদ্দেশ্যে আমরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতাম। আর সেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচ গান নাটকে, আমাদের শিক্ষিকারাই নিজের হাতে যত্ন করে আমাদের সাজিয়ে দিতেন। আমাদের কারও পুরুষ চরিত্র অভিনয় বা নাচ থাকলে, ধুতি পরিয়ে, নাকের নীচে কাজল পেনসিল দিয়ে গোঁফ এঁকে, চুল আঁচরিয়ে সাজিয়ে দিতেন। অর্থাৎ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গ্রীনরুমের দায়িত্বটা শিক্ষিকারাই সামলে দিতেন। সে সময়টায় সুন্দর বন্ধুর মতো মিশে যেতেন আমাদের সঙ্গে। অন্যসময় কী ভয়ঙ্কর ভয়টাই না পেতাম ওঁনাদের। ক্লাসে একটু অন্যমনস্ক হয়েছি, ওঁনাদের শ্যেন দৃষ্টির নজর এড়াতো না। ক্লাসে হোমওয়ার্ক অসমাপ্ত থাকলে বা অযথা বানান ভুল, টিউটোরিয়ালে কিছু কম নম্বর—এ সব কারণে মৃদু ধমকধামক। অথচ ভালবাসতেন সন্তানের মতো। পরে ভেবে দেখেছি, আপাত রাগী রাগী ইমেজটা ছিল ওঁনাদের মুখোশ মাত্র। অন্তরে সুনিবিড় স্নেহ-ছায়া। আমরাও স্কুলভর্তি সমস্ত শিক্ষিকা ও ছাত্রীরা একটা স্বচ্ছ নিটোল পরিবার হয়ে যেতাম। মনে পড়ে গেল স্কুল জীবনে অন্তিম দিনটির কথা। মঞ্চে প্রধান শিক্ষিকা আমাদের সবার উদ্দেশ্যে বিদায়ী ভাষণ দিচ্ছেন। তার আগেই এক ক্লাস নীচের স্টুডেন্টরা গেয়েছে, ‘‘জয়যাত্রায় যাও গো ওঠো ওঠো জয়রথে তব, জয়যাত্রায় যাও গো।’’ আমাদের প্রত্যেকের হাতে অভিজ্ঞানপত্র ও ফুলের তোড়া ও বিবেকানন্দের বই। সবই প্রধানশিক্ষিকা আমাদের হাতে একে একে তুলে দিয়েছেন। প্রধানশিক্ষিকার বিদায়ী ভাষণ এ দিকে আমাদের হাপুস নয়নে কান্না। সে কান্না আর থামতে চায় না। ও দিকে প্রধানশিক্ষিকা-সহ অন্যান্য প্রতিটি শিক্ষিকার চোখের কোনায় জল।

  বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমাদের নিজস্ব গণ্ডিটাও তো ক্রমশ পরিধি ব্যপ্ত হতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টির প্রায় প্রতিটি স্যর ম্যামদের প্রগাঢ় ব্যক্তিত্বের প্রগাঢ় ব্যক্তিত্বের কাছে তখন বাধ্য কুশীলব। তবে এখন যা অভ্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থা ও কলেজ ছাত্রছাত্রীদের বচসা, তাণ্ডব মারদাঙ্গার পরিবেশ প্রতিদিন প্রায় কাগজে পড়ি বা টেলিভিশনের লাইভ টেলিকাস্ট বা ব্রেকিং নিউজে আখচার দেখি। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রে এখন নৈরাজ্য রক্তক্ষয় ভয়াবহ আকারে দেখছি কখনও। দূষিত হয়ে যাচ্ছে স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটির পরিবেশ। যারপরনাই অবাক হতে হয় দুই যুযুধান দলের সংঘর্ষ ও তাণ্ডবলীলা দেখে দেখে। অধ্যাপকদের বিরুদ্ধে বিষম বিরোধিতা দেখি। নির্বিঘ্নে পঠনপাঠনের সুস্থ পরিবেশ কলুষিত। ‘ছাত্রানং অধ্যয়ন্দং তপঃ’ এই প্রবাদটি আজ যেন অতীত। আবার কলেজে ছাত্র নিরাপত্তাহীনতা অসন্তোষ এ সবও লেজর হয়ে জুড়ে আছে। আমরা অধ্যাপক অধ্যাপকদের যে সমীহ ও সম্মানের নজরে দেখতাম—সে আজ কোথায়?

প্রসঙ্গত আবারও ব্যক্তিকথনে ফিরে যাই, কিশোরীবেলায় গানের দিদিমণি, ছবি আঁকার স্যার, আমরা প্রতিটি গৃহশিক্ষক, অধ্যাপক—এ জীবনের সবার কাছেই কত যে ঋণ থেকে গেল। আরও পরে, আমি নিজেই যখন আমার স্নাতকোত্তর অভিজ্ঞতায় উঁচু ক্লাসের বেশ কিছু ছাত্রছাত্রীকে দর্শনশাস্ত্র পড়াতাম কিছুকাল ও পাড়ার বাচ্চাদের আঁকা শেখানোর টিউশানি করেছি—মানে আমি নিজেও যখন কমবয়েসীদের কাছে ‘শিক্ষিকা’ বা ‘মিস’ পদবাচ্য—‘শিক্ষকদিবসের’ এই বিশেষ দিনটিতে খুদে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে দেদার উপহার পেয়েছি। কেউ বা একক ভাবে, পকেটমানি থেকে বা বাবা-মা-র কাছে আমার জন্য আব্দার করে গিফট কিনে এনেছে। আবার উঁচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের সমবায় ভাবে চাঁদা তুলে শিক্ষকদিবসে আমার জন্য উপহার এনেছে। তাদের সে উপহার দেওয়ার জন্য সম্মান ছিল, নির্ভরতা ছিল, ভালবাসা ছিল, ছেলেমানুষী ছিল আর ছিল টিচারের সঙ্গে মিষ্টি একটা সম্পর্ক। কত কী যে অমুক তমুক উপহার দিতে খুদেরা, বই পেন ফুল এ সব তো ছিলই। এ ছাড়াও ক্যাডবেরি ডেয়ারি মিল্ক, ডিজাইনারডিজাইনার বালা, ফ্যাশনেবল কানের দুল, শো পিস, শৌখিন কফি মগ, হাতে বানানো ওয়াল হ্যাঙ্গিং, ছোট্ট সফট টয়েজ বা শৌখিন চাবির রিং, ডায়েরি ইত্যাদি। এমন কী নিজেদের পকেটমানি এক সঙ্গে জুড়ে রবীন্দ্রগানের সিডি বা পারফিউমও। এত দিন পর শিক্ষকদিবস নিয়ে লিখতে বসে আবেগতাড়িত হয়ে পড়ি।

যতদূর চোখ যায় এ গল্প থেকে সে গল্প। আমরা বার বার পেছন ফিরি। শিক্ষকদিবস নিয়ে লিখতে বসে ধুলো ঝাড়পোঁচ করে পেছনে ফিরে তাকানো। কখনও পুরনো স্মৃতিকাতরতা উথলে উঠে। ফেলে আসা স্কুলজীবনের জন্য মন কেমন। আবারও এই লেখার হাত ধরেই ফিরে দেখা। স্কুলের শিক্ষিকাদের নতুন করে দেখা। ডাউন মেমরি লেন ধরে হাঁটতে হাঁটতে একাকী দেখা হয় নিদের সঙ্গে। হারিয়ে যাই। আনন্দ-বেদনার মনকেমন কষ্টটা টের পাই।

কিশোরীবেলায় ছায়া ও বিষাদের ঘ্রাণ মাখা মনকেমনের বারান্দায় খানিক হেলান দিয়ে বসি। মন খারাপের বাতাস বইলেই চোখ ছলছল। পুরতনী গান যেন সুর ভাঙে মনে। কিছুই যেন বিম্বিত হয় না এ চোখে।

জাপানের একটা প্রচলিত প্রবাদ হল—‘‘Better than a thousand days of dilligent study is one day with a great teacher’’.

এ কথা বহুলাংশে সত্যি যে শিক্ষকতা এমনই এক পেশা যাকে একসময় বলা হত সব পেশার চেয়ে অন্যতম। তবে দিনকাল বদলেছে। অতীতের গুরুকুলে শিক্ষা, ব্রহ্মচর্য পালন এ সব বহু পুরাতন অতীত। সেই সুচারু শিক্ষাব্যবস্থার প্রচণ্ড অবনতি হতে দেখেছি কত মান পড়ে যাচ্ছে। সমালোচনাপ্রবণ দুর্মুখরা এও বলে থাকেন, শিক্ষকরা বছরে পাঁচ মাস প্রায় সবেতন ছুটি ভোগ করেন। বেতনও প্রচুর। প্রাইভেট টিউশনেও দ্বিগুণ আয়। এখন নাকি অতিরিক্ত সরকারি খবরদারির ফলে শিক্ষকরা তাঁদের পেশাকে আর পাঁচটা চাকরির মতোই পেশাগত দৃষ্টিতে দেখেন।

সে যাই হোক। শিক্ষকদিবস আমাদের কাছে আজও একটা মহান দিবস হিসেবেই সূচিত হয়। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল সেই কারণেই কবেই বলে গেছিলেন—‘‘যাঁরা শিশুদের শিক্ষাদানে ব্রতী তাঁরা অবিভাবকদের থেকেও অধিক সম্মাননীয়। পিতামাতা আমাদের জীবনদান করেন ঠিকই। শিক্ষকরা সেই জীবনকে সুন্দর ভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।