Advertisement
E-Paper

বিধি আর বাম নয়! ডোমকল, ফলতা কি পুনর্জাগরণের বার্তা, না কি বিজেপির মোকাবিলায় ‘পুঁজিহারা’ সিপিএম?

বিধানসভা, লোকসভা, রাজ্যসভা—সবেতে শূন্যে পৌঁছে গিয়েছিল একদা বাংলা দাপানো বামেরা। বিশ্বে দক্ষিণপন্থার উত্থানের যুগে বাংলায় কী ভবিষ্যৎ তাদের?

স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২৮ মে ২০২৬ ১৯:৫৯
Are Domkal and Falta signaling a message of left resurgence?

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

আগে রাম, পরে বাম। শোনা যাচ্ছিল প্রায় এক দশক ধরে। হলও তাই। যে রামের ধাক্কায় বামেরা প্রায় অবলুপ্ত হতে যাচ্ছিল, সেই রামের আশীর্বাদেই তারা এখন মাথা তোলার সম্ভাবনা দেখছে। ফলতার পুনর্নির্বাচনে শেষ অবধি দ্বিতীয় হল সিপিএম। তবে কি দ্বিতীয় ইনিংস আরম্ভ হল?

ফলতায় সিপিএম প্রার্থী লক্ষাধিক ভোটে হেরেছেন ঠিকই, কিন্তু ১৯.৩ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন। কংগ্রেস বা তৃণমূলের থেকে অনেকটাই এগিয়ে। “তৃণমূলের খেলা শেষ,” বললেন সিপিএম প্রার্থী শম্ভুনাথ কুরমি। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে যে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে সিপিএমের প্রতীক উর রহমান পেয়েছিলেন মাত্র ২,৩১৫ ভোট, সেখানে এ বার তাঁদের ভোট পেরোল ৪০,০০০। শূন্যের গেরো ডোমকলেই কেটেছিল। তাই ফলতা তাঁদের আশায় ঘৃতাহুতি দিয়েছে।

রাজ্যের নতুন শাসক দলের সামনে কোনও বিপদ এখন স্পষ্টতই নেই। কিন্তু বিরোধী স্পেসে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে তৃণমূলের হঠাৎ পলায়নে। ঠিক যেমন ৭৬ বিধায়ক নিয়েও ২০১৬-য় রাস্তায় প্রতিরোধ গড়তে পারেনি ভোটে হেরে মনোবল হারানো বাম-কংগ্রেস, আর মাত্র তিন বিধায়ক নিয়েও রাস্তায় মূল বিরোধী হয়ে উঠেছিল বিজেপি, সে রকম একটা পরিস্থিতি তৈরির সম্ভাবনা আছে। বিভিন্ন স্থানে হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে মূলত বামেদেরই মাঠে নামতে দেখা গিয়েছে।

বিজেপির একটা সুবিধা ছিল। সঙ্গে ছিল কেন্দ্রীয় সরকার ও দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। যে ভরসায় রাজ্য নেতৃত্ব এগোচ্ছিলেন। ছিল অর্থবল। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের আশীর্বাদ। ‘দিওয়ার’ সিনেমায় শশী কপূর বলতে পেরেছিলেন, ‘মেরে পাস মা হ্যায়’। বামেদের কী আছে?

আদর্শ আর বিশ্বাসযোগ্যতা, মনে করেন দীপ্সিতা ধর। পিএইচডি-ধারী সিপিএম-তরুণী সাংবাদিকদের নজর কেড়েছেন। সাংবাদিকদের সহানুভূতিতে অবশ্য ভোটে জেতা যায় না। তিন বার নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। তিন বারই হেরেছেন।

তাঁদের আদর্শ বা বিশ্বাসযোগ্যতা কিন্তু গত ১০ বছরে কাজে আসেনি। দীপ্সিতার ব্যাখ্যা: দুই দলই প্রশাসন ও নানা রকম মিথ্যা প্রতিশ্রুতির সাহায্যে বেঁচেছে। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার অভ্যাস সিপিএমের নেই। তাই নির্বাচনে তাঁদের ভরাডুবি ঘটেছে। “তৃণমূলের কোনও আদর্শ ছিল না। আর আজ তাদের হাতে প্রশাসনও নেই, বিশ্বাসযোগ্যতাও নেই,” তিনি বলেন।

এ ক্ষেত্রে সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের ব্যাখ্যা একটু অন্য ধরনের। তিনি মনে করেন, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে এক শ্রেণির অতি-বাম, সেন্ট্রিস্ট ও বুদ্ধিজীবীরা তৃণমূলকে বাম হিসেবে তুলে ধরেন এবং পরেও দীর্ঘদিন তৃণমূলকে এই বাম মুখোশটা পরে থাকতে সাহায্য করেন। সেই মুখোশ এখন খসে পড়েছে।

পনেরো বছর ক্ষমতায় নেই, কিন্তু শব্দ ও পরিভাষা ব্যবহারে তাঁদের দক্ষতা যায়নি। কেন, ঠিক কী ভাবে তৃণমূলের বাম-নীতি মুখোশ, আর সিপিএমের বাম-নীতি খাঁটি সোনা, এর কোনও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নেই। পয়েন্ট ধরে ধরে কোনও সিপিএম নেতা কোনও দিন ব্যাখ্যা করেছেন কি?

তবে, তৃণমূলকে যে আর ময়দানে বিশেষ পাওয়া যাবে না, এটা সিপিএম নেতারা ধরেই নিয়েছেন। তাই তাঁদের সব পুরনো নেটওয়ার্ক চালু করা ও বসে যাওয়া কর্মীদের মাঠে নামানোর উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এই কাজও সহজ নয়, কারণ পুরনো নেটওয়ার্কের একটা অংশ আদর্শগত ভাবেই বিজেপি সমর্থক হয়ে গিয়েছেন।

সিপিএম নেতাদের মতে, আপাতত, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে পিছিয়ে পড়া মানুষ আক্রান্ত হলে তাঁদের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে হবে। এক দিকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধিতা, আরেক দিকে সামাজিক ও আর্থিক ন্যায়ের প্রশ্নকে সামনে রেখে মানুষকে সংগঠিত করতে হবে। তা হলেই ফিরবে দলের হাল।

ইতিহাস ও বর্তমান, তাঁদের পক্ষে ও বিপক্ষে, দু’দিকেই আছে।

১৯৭৭-এ যখন সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট রাজ্যে ক্ষমতায় এল, তখন বিশ্বের বিরাট অঞ্চল জুড়ে কমিউনিস্ট শাসন। আজ সাধের সোভিয়েত ইউনিয়ন ছত্রখান, কোথাও কমিউনিজ়মের চিহ্নমাত্র নেই।

নব্বই-এর দশক পর্যন্ত বাংলার দেওয়াল ভরে থাকত, ‘মার্ক্সবাদ সর্বশক্তিমান, কারণ ইহা বিজ্ঞান’, ‘জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করুন’ ইত্যাদি বচনে। নতুন শতাব্দীর শুরু থেকেই, মানে রাজ্যে শাসনক্ষমতা হারানোর আগে থেকেই, এই সব পঙক্তি দেওয়াল থেকে উবে গিয়েছিল। মেঠো বক্তৃতাতেও কেউ আর বিপ্লবের ডাক দেন না।

খাতায়কলমে কমিউনিস্ট পার্টির শাসন চিন, ভিয়েতনাম, লাওস ও কিউবাতে। সবাই পুঁজি-পথে। ব্যক্তিগত মালিকানা, বিদেশি বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতামূলক বাজার—বিভিন্ন মাত্রায় গ্রহণ করেছে সবাই। টাটাকে বাংলায় গাড়ি কারখানা বানাতে দেওয়ার জন্য যারপরনাই চেষ্টা করেছিলেন বুদ্ধবাবু। কেরলে আদানিকে এনে বসিয়েছেন পিনরাই বিজয়ন। বিশ্বের অন্যত্রও, কমিউনিস্ট নামধারী বা নয়, এমন বামপন্থী দলগুলিও সরকারি মালিকানার সোভিয়েত মডেল ছেড়ে মূলত জনকল্যাণমুখী রাজনীতিই করছেন।

কিন্তু ভারতের নরেন্দ্র মোদী সরকার জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের রাজনীতি নিজের অস্ত্র করে নিয়েছে। ভাতা দিয়ে ভোট ব্যাঙ্ক বানানোর রাজনীতি বিজেপির কাছে এখন দুধভাত। রাজ্যের শুভেন্দু অধিকারী সরকার সে পথেই হাঁটবে, সেই ইঙ্গিত যথেষ্ট।

বদলেছে আর্থসামাজিক বাস্তবতাও। যেখানে শিল্পই নেই, সেখানে ট্রেড ইউনিয়নই বা থাকবে কী করে? কমছে চাকরির নিরাপত্তা। কৃষিতে জমি দখলের লড়াই আজ অতীত। এ ভাবে হারিয়েছে প্রথাগত শ্রমিক-কৃষক জনভিত্তি। গিগ ইকোনমির (অস্থায়ী, অসংগঠিত শ্রমিক) যুগে শ্রমিকদের একজোট করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। তদুপরি, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে যৌথ পরিবারের যুগে অনেক পরিবারেই পাঁচ-ছয় সন্তানের মধ্যে এক জন পার্টির হোল টাইমার হয়ে গেলে অন্য সদস্যদের ওপর তার প্রভাব কম পড়ত। এখন পরিবার ছোট। পারস্পরিক নির্ভরশীলতা অনেক বেশি।

তৃণমূল ময়দান ছেড়ে দিলে না-হয় নানা জায়গায় দ্বিতীয় হওয়ার সম্মান জুটবে। কিন্তু বিজেপি-কে হারাবেন কোন অঙ্কে? যেখানে ফ্যাসিবাদ, সংবিধান, ভোট চুরি, এই সব বিষয়ই নির্বাচনে প্রভাব ফেলছে না, সেখানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, প্যালেস্টাইন, মার্ক্স, লেনিন, হো চি মিন-এর নাম নিয়ে কি সাফল্য আসতে পারে? বিজেপি তো লাগাতার বলছে, মার্ক্সবাদ বিদেশি এবং মৃত!

এক মত নন মহম্মদ সেলিম। “মেহনতি মানুষের অধিকারের লড়াই সারা বিশ্বের লড়াই। নব্বইয়ের দশক থেকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থার উত্থান ও বাড়বাড়ন্ত পেরিয়েও আমরা এখনও টিঁকে আছি আদর্শের জন্যই। এখন পরিস্থিতি অনুকূল হচ্ছে, দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই তীব্র হচ্ছে,” তিনি বলেন।

স্লোগানের ব্যবহার অব্যাহত। দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই তো হচ্ছে। কিন্তু দক্ষিণপন্থা কী? দক্ষিণপন্থায় ক্ষতি কী? আর বিজেপি-ই বা কেন দক্ষিণপন্থী? সেটা অবশ্য তাঁরা মানুষের কাছে বুঝিয়ে বলছেন না।

স্থান শূন্য থাকলেই স্রেফ বিরোধী হওয়ার সৌজন্যে সেই স্থানের ওপর অধিকার জন্মায় না। তামিলনাড়ুতে যেমন, হঠাৎ ভুঁই ফুঁড়ে তৈরি হওয়া একটি দল শাসক ও বিরোধী দু’পক্ষকেই ঘায়েল করে দিল। এখানেও, তৃণমূলের পিছু-হটা যে স্পেস তৈরি করছে, তা বামেদের নামে কেউ লিখে দিয়ে যায়নি।

জনগণের আস্থা অর্জন তবে কোন পথে? কী অস্ত্রে? “বিজেপির হাতে আক্রান্ত সব ধরনের মানুষের মধ্যে ঐক্য নির্মাণের মধ্যে দিয়ে,” বলেন দীপঙ্কর ভট্টাচার্য। কাজটা সহজ নয়, সেটা মানেন সিপিআই (এমএল-লিবারেশন)-এর সাধারণ সম্পাদক। “সংগঠিত করতে একটু সময় লাগতে পারে, তবে সবার আগে মানুষকে প্রতিবাদ করার ও মাঠে নামার সাহস দিতে হবে। এটাই এখন বাংলায় প্রাথমিক কাজ।”

সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে এঁরা সিপিএমের বিরুদ্ধে ছিলেন। কিন্তু গত বছর দুয়েক ধরে এই রাজ্যে তাঁরা অনেকটাই একসঙ্গে কাজ করছেন। পারস্পরিক পুরনো তিক্ততা যদিও এখনও বিদ্যমান। তবে আনন্দবাজার ডট কমের সঙ্গে আলাপচারিতায় সেলিম ও দীপঙ্কর উভয়ই বাম ঐক্যের ওপর বিশেষ জোর দেন।

অর্থনীতি বরাবরই মার্ক্সবাদীদের মূল আলোচ্য থেকেছে। কিন্তু বর্তমানে কমিউনিস্ট বা বাম দলগুলি তাঁদের আর্থিক নীতি অনেক পাল্টেছেন। বেসরকারি বিনিয়োগ, অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগ, সবই মেনে নিচ্ছেন। আবার ভাতা-বিরোধী বিজেপি এখন ভাতা-দরদী হয়ে উঠেছে, বেসরকারিকরণে লাগাম টানছে। ফলে, বাম-ডানের যে চিরাচরিত প্রভেদ, তা আর অত স্পষ্ট বোঝা যায় না।

তা হলে অসাম্প্রদায়িকতা ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ছাড়া বিজেপির সঙ্গে তাঁদের পার্থক্য কোথায়? যেখানে মানুষের সব চেয়ে বড় দাবি হয়ে উঠেছে কর্মসংস্থান, সেখানে মানুষ কেন বিজেপিকে ছেড়ে বামেদের উপর ভরসা করবেন? এর কোনও স্পষ্ট বোধগম্য উত্তর এখনও বামেদের থেকে আমরা পাইনি।

সেলিমের মতে, বিজেপির মতো ‘দক্ষিণপন্থী’রা কিছু নির্দিষ্ট মাপকাঠির ভিত্তিতে কিছু নির্বাচিত মানুষকে, মূলত সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র অংশটিকে, কিছু ভাতা দিয়ে ভুলিয়ে রেখে আসলে পরিকাঠামো বানায় শুধু বড়লোকদের জন্য। মোটামুটি ভাবে, সিপিএম চাইছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো খাতে সরকারি লগ্নি বাড়াতে।

সিপিএম চায়, বাজার বাড়ুক। বাজারে টাকা ঘুরতেই হবে। সেলিম বলেন, “বাজার না-বাড়লে অর্থনীতি বাঁচবে না, আর বাজার বাড়াতে গেলে গরিবের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে।”

কিন্তু বিজেপি-ও তো গরিবের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলে। তৃণমূলও সেটাই বলত ও করত। প্রশ্ন হল, তা হলে সিপিএম কি শুধু সেকুলার বিজেপি বা দুর্নীতিহীন তৃণমূল?

অর্থনৈতিক নীতিতে বামেরা কোথায় বিজেপি, কংগ্রেস বা তৃণমূলের থেকে কতটা আলাদা, সেটা স্পষ্ট করতে পারেনি সিপিএম, মনে করেন দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য। দিল্লির জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক। বাংলার রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন। “রাস্তার প্রতিবাদ, সংগঠন বাড়ানো, এ সব তো আছেই, কিন্তু তাঁদের বিকল্প অর্থনৈতিক প্রকল্প কী, সেটা সামনে আনাও তাঁদের আশু কর্তব্য হওয়া উচিত,” বলেন দ্বৈপায়ন।

বছর দশেক আগে, বিজেপির প্রাক্তন মন্ত্রী অরুণ শৌরি বলেছিলেন, কংগ্রেসের সঙ্গে গরু যোগ করলে বিজেপি হয়। অর্থাৎ, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি বাদ দিলে বিজেপি-কংগ্রেস পার্থক্য নেই। তা, কংগ্রেসের সঙ্গে সিপিএমেরই বা পার্থক্য কতটা? হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি করেন না, শুধু এইটুকু পার্থক্য দিয়ে তাঁরা বিজেপি-কে ঘায়েল করতে পারবেন?

দীপঙ্করের মতে অবশ্য সাম্প্রদায়িকতা কোনও বায়বীয় বিষয় নয়, এর গভীর অর্থনৈতিক ভিত্তি আছে। “মুসলমানদের গরুর মাংস খাওয়া আটকাতে গিয়ে ওঁরা তো হিন্দু গো-পালকদেরও বিপদে ফেলে দিয়েছেন। বাংলার সমাজে হিন্দু-মুসলমান অর্থনৈতিক ভাবে খুবই জড়িত। যখনই এই অর্থনীতিতে ঘা আসবে—এবং সেটা আসবেই—সাম্প্রদায়িকতা আদর্শগত থেকে অর্থনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠবে।”

অনেক পুরনো অভ্যেস তাঁরা ছাড়েননি। যেমন, আন্তর্জাতিকতা। বা, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে গালিগালাজ। দীপ্সিতা মনে করেন, ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ দেখাচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি কী ভাবে রান্নাঘর নিয়ন্ত্রণ করে। তাঁর কথায়, “মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তো আজ ঘরোয়া রাজনীতিতে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।” রাশিয়া বা চিনের সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে অবশ্য তাঁদের দল মৌনী।

তবে তিনি মেনে নেন, রাশিয়ার প্রতি নস্টালজিয়া বা জার্মানির গল্প যে ভাবে এ দেশের বাম সংস্কৃতিতে এসেছে, ততটা হয়তো ভারতের নিজস্ব প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব বা আন্দোলন—কবীর, চৈতন্য থেকে লালন বা হরিচাঁদ-গুরুচাঁদরা আসেননি। দীপ্সিতা বলেন, “স্থানীয় সমাজ সংস্কারকদের নিয়ে কাজ করার নির্দেশ গত পার্টি কংগ্রেস থেকেই দলের সর্বস্তরে দেওয়া হয়েছিল। সেই কাজে অবশ্যই গতি বাড়াতে হবে।”

সে কাজে অবশ্য বিজেপি অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে—হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ থেকে কোচবিহারের পঞ্চানন বর্মা বা মালদহের জিতু সাঁওতাল, এঁদের সবাইকে নিয়ে বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবার ইতিমধ্যেই অনেক কাজ করে ফেলেছে।

বামেদের কাছে সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত এই যে, দলের ‘ব্র্যান্ড ডিস্টিংশন’ বা স্বকীয়তা চলে গিয়েছে। তাঁদের স্বকীয়তা ছিল ব্যবস্থাকে বদলে দেওয়ার অঙ্গীকারে। তা আজ কোথায়? বিকল্প অর্থনৈতিক মডেল কই? নগদ অর্থ সহায়তা, বিনামূল্যে চাল, সাইকেল থেকে মোবাইল বা ট্যাব বিতরণ বা স্বাস্থ্যবিমার মতো জনকল্যাণমূলক পরিষেবা যাঁদের হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তাঁরাই দিচ্ছেন। এটি বর্তমানে মূলত ক্ষমতারই ফলাফল; কোনও মতাদর্শের বিষয় নয়।

তৃণমূলের মূল জনভিত্তি ছিল মুসলিম জনগণ আর ভাতাপ্রাপক বা বেনেফিশিয়ারি, বিশেষত মহিলারা। দ্বিতীয়টি কোনও দলের নিজস্ব নয়, মূলত সরকারি দলের ভিত্তি হয়। ফলে, বিজেপি যদি এই ভাতা-রাজনীতি তৃণমূলের থেকে ভাল চালাতে পারে, এই সমর্থন তাদের দিকে ঘুরে যাওয়ার সম্ভাবনা।

বাকি থাকলেন মুসলিমরা, যাঁদের বিজেপি-কে ভোট দেওয়ার বিশেষ উপায় নেই। তাঁরা অনেকেই বিগত তিন বড় নির্বাচনে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছিলেন স্রেফ নিরাপত্তার কারণে, তৃণমূল সরকারে ছিল বলে। ডোমকল হোক বা ফলতা, এখনও পর্যন্ত বামেদের খাতায় বাড়তি এসেছে মূলত মুসলিমদের ভোটই। কিন্তু সংখ্যাগুরু মানুষ যদি বিজেপির রাজনীতিতে সাড়া দেন, বামেদের সংখ্যালঘু-নিরাপত্তা কেন্দ্রিক রাজনীতি ভোটের ময়দানে কি ফসল দিতে পারে?

তা ছাড়া, মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুরে মুসলিমদের ভোট অনেকটাই কংগ্রেসের দিকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ওখানে মুসলিমদের মধ্যে স্পষ্টতই বামেদের তুলনায় কংগ্রেসের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। কলকাতার আশেপাশে মুসলিমদের মধ্যে ভিত্তি বাড়াচ্ছে নওশাদ সিদ্দিকীর ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট।

সুতরাং, হিন্দু ভোট উদ্ধার করতে না-পারলে সিপিএমের সত্যিই কোনও পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা থাকছে কি?

প্রশ্নগুলো কঠিন। উত্তর এখনও অজানা।

CPM West Bengal Politics
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy