সারা রাত ধরে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন দমকল কর্মীরা। কেউ কেউ নিজের জীবন বিপন্ন করে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন আগুনের মুখে। তাতেও ক্ষতি এড়ানো যায়নি। ভয়াল আগুন প্যারিসের নোত্র দাম ক্যাথিড্রালকে যে ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তাতে এখন সব চেয়ে বড় প্রশ্ন, কত দিনে পুরোপুরি সারিয়ে তোলা যাবে সাড়ে আটশো বছরেরও পুরনো এই স্থাপত্যকে? 

বুধবার নোত্র দামের রেকটর প্যাট্রিক শোভে জানিয়েছেন, আপাতত তাঁরা ক্যাথিড্রাল বন্ধ করে দিচ্ছেন আগামী পাঁচ থেকে ছ’বছরের জন্য। শোভে বলেছেন, ‘‘ক্যাথিড্রালের একটা অংশ আগুনের জেরে খুবই দুর্বল হয়ে গিয়েছে।’’ তবে তিনি ঠিক কোন অংশের কথা বলছেন, তা বিশদে জানাননি। পাশাপাশি গির্জার মোট ৬৭ জন কর্মী ভবিষ্যতে কী করবেন, তা-ও এখন অনিশ্চিত বলে জানিয়েছেন শোভে। আপাতত স্থপতিদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতার ডাক দেওয়া হচ্ছে, নোত্র দামের ধাতব মিনার কে কী ভাবে ফের গড়ে তুলতে পারেন, তা বুঝতে। এই গির্জার কোনও বিমাও নেই, জানিয়েছেন নিউ ইয়র্কে ফরাসি দূতাবাসের মুখপাত্র। ১৯০৫ সালের আগে যত ধর্মীয় স্থাপত্য গড়ে উঠেছে, সবই রাষ্ট্রের অধীনে, তাই নোত্র দাম ফ্রান্সের ‘রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি’।

গত কাল ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরঁ বলেছেন, পাঁচ বছরের মধ্যে ক্যাথিড্রাল ফিরবে তার আগেকার চেহারায়। ২০২৫-এ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকস আয়োজিত হওয়ার কথা প্যারিসে। মাকরঁর কথায়, ‘‘আমরা নোত্র দাম ক্যাথিড্রালকে আরও সুন্দর করে তুলব।’’ 

ফরাসি প্রশাসন সূত্রে খবর, আর ১৫-৩০ মিনিট লাগত ক্যাথিড্রাল পুরোপুরি ধসে পড়তে। গথিক বেল টাওয়ার দু’টিতে লেলিহান শিখা যাতে পৌঁছতে না পারে, তার 

জন্য জান লড়িয়ে দিয়েছেন দমলকর্মীরা। প্যারিসের দমকলবাহিনী জ্বলন্ত গির্জার ভিতরেই জলের একটা দেওয়াল তৈরি করে ফেলেছিলেন। দুই টাওয়ার আর আগুনের মধ্যে ওটাই ছিল রক্ষাকবচ।  

ব্রিটেনের বিশেষজ্ঞ জন ডেভিড বলছেন, নোত্র দামের ফের সংস্কার শুরু করতে গেলে প্রথমেই যেটা দরকার সেটা হচ্ছে, অগ্নিদগ্ধ স্ক্যাফোল্ডিং (অর্থাৎ ভারা বাঁধা) সরিয়ে ফেলা। কারণ ওটা ভয়ঙ্কর উত্তাপ সহ্য করেছে। এর পরেই ক্যাথিড্রালকে মুড়ে ফেলতে হবে সুরক্ষার আবরণে, হাওয়া আর বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে হবে প্রাচীন এই কাঠামোকে। সরাতে হবে পড়ে থাকা সব কাঠের টুকরো  অন্য ধ্বংসাবশেষ। ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগের কেট জাইলস কিন্তু বলছেন, ‘‘পড়ে থাকা সব টুকরো থেকে বাছতে হবে কী কী এখনও অক্ষত। আর ক্যাথিড্রালের নতুন নকশার জন্য অনেক নষ্ট হয়ে যাওয়া সামগ্রী থেকেও নমুনা সংগ্রহ করতে হবে।’’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যাথিড্রাল পুরোপুরি পরিষ্কার করার পরেই বিস্তারিত সমীক্ষায় বোঝা যাবে ক্ষতির পরিমাপ। নোত্র দামের ছাদ তৈরিতে ব্যবহার হয়েছিল ৫২ একর জমির গাছ। তাই তাকে বলা হত ‘অরণ্য’। এই অরণ্যে আধুনিক ‘স্প্রিংকলার’ এবং ‘ফায়ার ওয়াল’-এর অস্তিত্বই ছিল না। বৈদ্যুতিন কোনও ব্যবস্থা সেখানে করানোর ব্যাপারে বরাবরই আপত্তি উঠেছে, কাঠের কাঠামোয় ঝুঁকির কথা ভেবে। 

এখনও সেই ঝুঁকিই বড় মাথাব্যথা। কারণ সংস্কারের কাজ শুরু করতে গেলেই যদি ফের কোনও অংশ ভেঙে পড়তে শুরু করে, সেটা হবে বড় চিন্তার কারণ। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যযুগীয় শিল্পকলার অধ্যাপক পল বিনস্কি বলছেন, ‘‘ক্যাথিড্রালের উপরের পাথরের কাজ, অর্ধচন্দ্রাকৃতি আকৃতি, উপর দিককার জানলা— সবই ‘সেদ্ধ’ হয়ে গিয়েছে। উত্তাপে পাথর দুর্বল এবং নষ্টও হয়েছে। পাথরেরও ভাল মতো খুঁটিয়ে দেখতে হবে। কাঠের ছাদ ধসে যাওয়ার পরে পাথরের সিলিংই সবটা অভিঘাত সহ্য করেছে।’’ 

কাচের জানলা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ সারা ব্রাউন জানাচ্ছেন, নোত্র দামের প্রতিটি জানলা প্রচণ্ড তাপমাত্রা সহ্য করেছে, তার পরেই আবার জলের তোড়। সবটাই এত দ্রুত হয়েছে যে তাপমাত্রার বিরাট তফাতে কাচের গায়ে সূক্ষ্ম ফাটল ধরার কথা। যা ঠিক করা খুবই কঠিন বিষয়।’’