বরাবর যাদের গায়ে তকমা লেগে ছিল, এরা তো স্পিনার ও ব্যাটসম্যানের দেশ। তারাই কি না পাল্লা দিচ্ছে সর্বকালের সেরা পেস ব্যাটারির সঙ্গে। 

অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি। পরিসংখ্যানের দিক থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্বর্ণযুগের পেস আক্রমণকে টেক্কা দিয়ে ফেলেছেন বিরাট কোহালির ভারতীয় দলের পেস ত্রয়ী। কপিল দেবের ভারতের কাছে বিশ্বকাপ হারার ঠিক পরের বছরে তাঁদের ফর্মের সর্বোচ্চ শিখরে ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ত্রয়ী। ১৯৮৪ সালে তাঁরা বিশ্বের সব দলকে তছনছ করে দিয়েছিলেন। সে বছরে টেস্ট ম্যাচে মার্শাল, হোল্ডিং এবং গার্নারের বিশ্বত্রাস ত্রয়ী নিয়েছিলেন ১৩০ উইকেট। এত দিন পর্যন্ত সেটাই ছিল এক বছরে নেওয়া কোনও দেশের পেস বিভাগের সর্বোচ্চ শিকার। মেলবোর্নে শনিবার দিনের খেলা শেষে ভারতীয় পেস ত্রয়ীর এ বছরের শিকার সংখ্যা দাঁড়াল ১৩৪। 

ডেনিস লিলি কয়েক দিন আগেও আনন্দবাজারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এমআরএফ পেস ফাউন্ডেশনে কাজ করতে এসে সব চেয়ে কঠিন হয়ে গিয়েছিল মানসিক অবস্থানে পরিবর্তনে ঘটানো যে, স্পিনের দেশেও পেসার তৈরি করা সম্ভব হবে। লিলি যখন এসেছিলেন, একমাত্র উদাহরণ ছিলেন কপিল দেব। তা-ও কী? না, কোচিং ক্যাম্পে কিশোর কপিল পেস বোলার হতে চেয়ে চারটে রুটি খেতে চাওয়ায় কটাক্ষ শুনতে হয়েছিল— ভারতে আবার পেস বোলার হয় নাকি! 

আরও পড়ুন: প্রতি টেস্টে ২০ উইকেট নিতে পারে ভারত: দ্রাবিড়

যে দেশের হয়ে এক সময়ে নতুন বলে শুরু করতেন সুনীল গাওস্কর এবং একনাথ সোলকার, তারাই এখন টেক্কা দিচ্ছে ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা এবং রূপকথায় স্থান করে নেওয়া পেস আক্রমণের সঙ্গে। একটা সময় ছিল যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে থরহরিকম্প হত ভারতীয় ব্যাটিং। মার্শাল, হোল্ডিং, রবার্টস, গার্নারদের সামনে। একা রুখে দাঁড়াতেন সুনীল গাওস্কর এবং মোহিন্দর অমরনাথ, তাঁদের আগে কিছুটা দিলীপ সরদেশাই। এখন বুমরা, শামি, ইশান্তদের বোমাবর্ষণের সামনে কাঁপছে বিশ্বের বাকি সব দলের ব্যাটসম্যানেরা। উইকেট বাঁচাবেন না মাথা, তা নিয়ে আতঙ্কিত থাকতে দেখা যাচ্ছে তাঁদের। 

সফল: ভারতীয় পেসারদের উত্থানের পিছনে বোলিং কোচ অরুণ, কোচ শাস্ত্রী, ও অধিনায়ক কোহালি। ফাইল চিত্র

দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা। ইংল্যান্ডে গিয়ে ইংল্যান্ড। অস্ট্রেলিয়ায় এসে অস্ট্রেলিয়া। পেস বোলিংয়ের জন্য সুখ্যাতি থাকা প্রত্যেকটা দেশকে তাদের ডেরায় গিয়ে আতঙ্কিত করে ছাড়ছেন বুমরা, ইশান্ত, শামিরা। সর্বকালের সেরা পেস বোলার যাঁকে ধরা হয়, সেই লিলি বলছিলেন, ‘‘ভারতে শুধু পেসারই তৈরি হচ্ছে না, দারুণ গুণগত মানের পেসার হচ্ছে। এতটাই এগিয়ে গিয়েছে ওরা যে, চার পেসার খেলাবে ভাবলে চার জনই খেলাতে পারে। সেই অস্ত্রসম্ভার তৈরি আছে।’’  

হোল্ডিং, মার্শাল, গার্নারদের সব চেয়ে সফল বছরের মিলিত উইকেট সংখ্যাকেও ছাপিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। শুধু তাই নয়, চলতি বছরের উইকেট সংখ্যার হিসেবে দেখা যাচ্ছে, ভারতীয় পেস ত্রয়ীই বাকি সকলের চেয়ে এগিয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণকে এখন বিশ্বের সেরা ধরা হয়। উইকেট শিকারের দিক থেকে তাদের প্রত্যেকের চেয়ে এগিয়ে বুমরা, শামিরা (গ্রাফিকে দেখুন)। অস্ট্রেলীয় কিংবদন্তিরাও মুগ্ধ ভারতীয় পেস বোলিংয়ের এই উত্থানে। এ দিন রেডিয়োতে কমেন্ট্রি করার সময়ে ইয়ান চ্যাপেল প্রথম ক্যারিবিয়ান পেস ব্যাটারির রেকর্ড ছাপিয়ে যাওয়ার পরিসংখ্যানের কথা জানান। সঙ্গে সঙ্গে হইহই পড়ে যায়। ইয়ান স্মৃতিচারণ করতে শুরু করেন, ‘‘আমি টাইগার পটৌডির ভারতীয় দলের বিরুদ্ধে খেলেছি। টাইগার খুব ভাল ক্যাপ্টেন তো ছিলই, আমার খুব ভাল বন্ধুও ছিল। আমি মনে করি, টাইগারই প্রথম ভারত অধিনায়ক যার ম্যাচ জেতার একটা নির্দিষ্ট নকশা ছিল।’’ তার পরেই যোগ করছেন, ‘‘কিন্তু সেই সময়ে ভারতীয় বোলিং মানে ছিল ব্যাটসম্যানদের দিয়ে কয়েক ওভার বল করিয়ে পালিশ তুলে দেওয়া। তার পর বেদী, চন্দ্র, প্রসন্ন, বেঙ্কটের ভেল্কি শুরুর অপেক্ষা। সেই জায়গা থেকে আজকের এই পেস-বিপ্লব অবিশ্বাস্য। সব দেশে, সব পরিবেশে ওরা সফল হয়ে দেখিয়েছে।’’ 

এই সিরিজের অন্যতম সম্প্রচারকারী চ্যানেল ফক্স স্পোর্টসে একটু পরে শেন ওয়ার্নকে বলতে শোনা গেল, ‘‘আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, গত পঁচিশ বছরে ক্রিকেটারদের সব চেয়ে কঠিন পরীক্ষা নিয়েছে কোন দেশ, আমি বলব অস্ট্রেলিয়া। এখানকার পিচে গতি থাকে, বাউন্স থাকে। সারাক্ষণ চাপ রয়েছে মাথার উপরে। কিন্তু সে সবের সঙ্গে লড়াই করে পরিকল্পনা, মনোভাব এবং মাঠে নেমে সেগুলোকে বাস্তবায়িত করার দিক থেকে এই ভারতীয় দল বহু বছরের মধ্যে আমার দেখা সেরা।’’ এখানেই না থেমে ওয়ার্ন যোগ করেন, ‘‘ওদের বোলিং আক্রমণ এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা। এত ভাল বোলিং নিয়ে আর কখনও অস্ট্রেলিয়ায় খেলতে আসেনি ভারত।’’

যদিও রাতারাতি কোনও আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের ছোঁয়ায় ভারতীয় পেস বোলিং পাল্টে যায়নি। কৃতিত্ব দিতে হবে টিম ম্যানেজমেন্ট এবং অধিনায়ক কোহালিকে। যাঁরা পেস বোলারের কদরই শুধু করছেন না, তাঁদের সম্পদের মতো আগলে আগলে রাখেন। কোহালি এবং তাঁর স্ত্রী অনুষ্কা বিজনেস ক্লাসে না বসে পেসারদের সেই টিকিট ছেড়ে দেন। যাতে পা ছড়িয়ে সেখানে বসতে পারেন ইশান্ত, শামি, বুমরারা। যাতে পরের ম্যাচের জন্য উপযুক্ত বিশ্রাম নিয়ে তরতাজা থাকতে পারেন তাঁরা। 

ডিরেক্টর হয়ে রবি শাস্ত্রী বিদেশি বোলিং কোচ ছাঁটাই করে নিয়ে এসেছিলেন বি অরুণকে। অনেকে নানা সময়ে এর জন্য শাস্ত্রীকে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটের প্রাথমিক স্তরে বহু দিন ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে সম্পদ করে অরুণ নিঃশব্দে পাল্টে দিয়েছেন বোলিং আক্রমণকে। জাতীয় অ্যাকাডেমিতে বুমরা, ইশান্তদের অনেকের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। সন্তানের মতো তাঁদের পালন করে গিয়েছেন। ঢাকঢোল পিটিয়ে সামনে আসেন না। নেপথ্যে থেকে নিঃশব্দে কাজ করে যান। অরুণ প্রথমেই শাস্ত্রীকে বলে দিয়েছিলেন, যদি চার-পাঁচ জন ফাস্ট বোলারকে দিয়ে ধারাবাহিক ভাবে আগুন ঝরাতে হয়, সবার প্রথমে ফিটনেস এবং শারীরিক শক্তি বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। আরসিবি-তে কোহালির সঙ্গে কাজ করা ট্রেনার এবং স্ট্রেংথ কন্ডিশনিং কোচ শঙ্কর বাসুকে তাঁরা নিয়ে আসেন। বাসু আসার পরে প্রত্যেক পেসারের বলের গতি অনেক বেড়ে গিয়েছে। ধারাবাহিক ভাবে ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের উপরে গতিতে বল করে চলেছেন তাঁরা। স্ট্রেংথ কন্ডিশনিং ছাড়া যেটা সম্ভব ছিল না।  

বোলিং কোচ অরুণ এ দিন সাংবাদিক সম্মেলনে এসে বললেন, ‘‘এর আগেও ভারতের খুব ভাল জোরে বোলার হয়তো এসেছে। কপিল দেব বা জাহির খান। কিন্তু একই সঙ্গে চার-পাঁচ জন বিশ্ব মানের পেস বোলার আর দেখা যায়নি।’’ কপিল, জাহিররা মিডিয়াম পেসার ছিলেন। গতি নয়, তাঁদের অস্ত্র ছিল সুইং। যশপ্রীত বুমরার মতো প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের পাল্টা বাউন্সারে ঝাঁঝরা করে দিতে পারেননি কেউ। শাস্ত্রী-অরুণ-কোহালিদের মাস্টারস্ট্রোক বুমরাকে টেস্ট খেলানো। যাঁকে পণ্ডিতরা শুধু সাদা বলের বোলার বলে চিহ্নিত করে ফেলেছিলেন। সেই বুমরাকে নিয়েই এখন মন্ত্রমুগ্ধ লিলি থেকে ইয়ান বোথাম, থমসন থেকে শেন ওয়ার্ন— ক্রিকেটের কিংবদন্তিরা! 

তিরাশির বিশ্বকাপ ফাইনালে হারার পরে হোল্ডিং-মার্শালরা ভারতে এসে প্রতিশোধের আগুনে ঝলসে দিয়েছিলেন গাওস্কর, কপিলদের। তখন কে জানত পঁয়ত্রিশ বছরের মধ্যে চাকাটাই সম্পূর্ণ ঘুরে যাবে! কে ভেবেছিল ক্যারিবিয়ান পেস আক্রমণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে আর স্পিনের দেশ ভারতে লেখা হবে গতির নতুন রূপকথা!